কোরবানির পশুর চামড়া সীমান্ত এলাকা দিয়ে প্রতিবেশী দেশ ভারতে পাচারের পাশাপাশি বন্দর দিয়েও মিথ্যা ঘোষণায় পাচারের আশঙ্কা করা হচ্ছে। পাচার রোধে বেনাপোল, সোনামসজিদ, আখাউড়া ও হিলি স্থলবন্দরে নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের চামড়া পাচার সম্পর্কিত তৈরি প্রতিবেদনে এ আশঙ্কা করা হয়েছে। এনবিআর চেয়ারম্যানের কাছে এ প্রতিবেদন গত সোমবার জমা দেওয়া হয়েছে। এনবিআর চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে পাচার রোধে গঠিত টাস্কফোর্স কমিটি এই প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে সীমান্ত এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোসহ বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
টাস্কফোর্স কমিটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে, অনেক সময় লোকবলের অভাবে পরিবহনে কী ধরনের পণ্য বন্দর দিয়ে আনা-নেওয়া হয় তা যাচাই করা সম্ভব হয় না। আর এই সুযোগে অসাধু ব্যবসায়ীরা মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে কৌশলে এক জাতীয় পণ্য আনার কথা বলে অন্য ধরনের পণ্য দেশে আনেন বা দেশ থেকে বের করে নিয়ে যান। পাচার রোধে তাই লোকবল বাড়াতে হবে। বন্দরে নজরদারি বাড়াতে শুল্ক কর্মকর্তাদের পাশাপাশি গোয়েন্দাদের নজরদারি বাড়ানো হবে। এ জন্য নিয়মিত গোয়েন্দাদের পাশাপাশি অতিরিক্ত গোয়েন্দারাও কাজ করবে। বাংলাদেশ থেকে ভারতে যাওয়ার সময়ে ট্রাকে কী পণ্য নেওয়া হচ্ছে, সঙ্গে থাকা কাগজপত্রের সঙ্গে তা মিলিয়ে দেখতে হবে।
শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ ফকরুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অসাধু ব্যবসায়ীরা এ বিষয়ে প্রস্তুতি নিয়েছেন বলে গোয়েন্দা রিপোর্ট আছে। পাচার রোধে সর্বাত্মক প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। শুধু বন্দরে নয় অনেক আড়তেও শুল্ক গোয়েন্দারা নজরদারি করবে। কোনোভাবেই যেন পাচার হয়ে না যায়, সে জন্য এ চেষ্টা। পাচার রোধে এনবিআর চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে গঠিত টাস্কফোর্স কমিটি থেকে ইউনিয়ন পর্যায়ের টাস্কফোর্স কমিটিরও সহায়তা নেওয়া হবে। আমাদের পাওয়া তথ্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে সরবরাহ করা হবে। আবার প্রয়োজনে তাদের তথ্যও আমরা নেব। সরকারের সব পর্যায় থেকে সমন্বিতভাবে চামড়া পাচার রোধে কাজ করা হবে। দেশি চামড়াশিল্প রক্ষা করাই আমাদের মূল উদ্দেশ্য।’
শুল্ক গোয়েন্দাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্যানারির মালিকদের অভিযোগ সামনে রেখে সীমান্ত এলাকার কাছাকাছি বিভিন্ন আড়তে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, দেশের অনেক আড়তের মালিকের সঙ্গে ভারতের অনেক ট্যানারির মালিকদের প্রতিনিধি এরই মধ্যে অগ্রিম অর্থ দিয়ে কাঁচা চামড়া কিনতে চুক্তি সেরে রেখেছে। মধ্যস্বত্বভোগী এসব চামড়া ব্যবসায়ী যে দামে কাঁচা চামড়া কিনে থাকেন, ভারতের ট্যানারির মালিকদের কাছে তার চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করেন। এভাবে মোটা অঙ্কের অর্থ পকেটে ভরেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পশু কোরবানির পর পাড়া-মহল্লা বা বিভিন্ন এলাকা থেকে সাধারণ ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি মৌসুমি চামড়া সংগ্রহকারীরাও কাঁচা চামড়া কিনে থাকেন। এসব কাঁচা চামড়া লবণ মাখিয়ে রেখে স্থানীয় আড়তদারদের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। স্থানীয় আড়তদাররা বেশি দামে রাজধানীর আড়তদার বা ট্যানারির মাালিকদের কাছে সরাসরি বিক্রি করেন। এখানে স্থানীয় আড়তদারদের কাছ থেকে চামড়া পাচারকারীরা চামড়া সংগ্রহ করতে যোগাযোগ করেছেন। পাচারকারীরা সীমান্ত এলাকার কাছাকাছি অনেক গুদাম ভাড়া করেছেন। অনেকে আবার অনেক বড় বাড়ির মালিকের সঙ্গে চুক্তি করেছেন। এ বিষয়ে গোয়েন্দা রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে শুল্ক গোয়েন্দারা অনুসন্ধানে নেমেছে।
এদিকে ব্যবসায়ীরা পাচার রোধে ঈদুল আজহার দিনসহ সাত দিন কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়া পরিবহন করতে না দেওয়ার অনুরোধ করে বাণিজ্য, শিল্প ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছেন। শুল্ক গোয়েন্দাদের প্রতিবেদনেও এই সাত দিন কাঁচা চামড়া পাচার রোধে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় পশুর কাঁচা চামড়া পরিবহন না করার পক্ষে বলা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর গরু হত্যায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। আর এতে ভারতের ট্যানারিগুলোতে কাঁচা চামড়ার সংকট দেখা দিতে থাকে। এর আগে সাময়িক সময়ের জন্য বাংলাদেশ থেকে কাঁচা চামড়া রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হলেও এখন আর এই সুযোগ নেই। বাংলাদেশের ট্যানারিগুলোর কাঁচা চামড়া সংগ্রহের সবচেয়ে বড় মৌসুম ঈদুল আজহা। এ সময়ে বাংলাদেশ থেকে ভারতে চামড়া পাচারের আশঙ্কা করা হয়েছে। ভারতে পাচার হয়ে গেলে বাংলাদেশের ট্যানারির মালিকরা কাঁচামালের সংকটে পড়বেন। আর এতে দেশে চামড়াশিল্পে বড় ধরনের সংকট তৈরি হবে।
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কোরবানির ঈদে চামড়া পাচার হয়ে গেলে দেশের চামড়াশিল্প ক্ষতির মুখে পড়বে। এই সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে না। তাই চামড়া পাচার রোধে নজরদারি বাড়ানো উচিত।’
