সদ্যসমাপ্ত বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ প্রার্থিতায় পরিবর্তন এনে এবার মনোনয়ন দেয় বর্তমান মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহর আপন চাচা আবুল খায়ের আবদুল্লাহ খোকন সেরনিয়াবাতকে। আর এর পর থেকেই গত কয়েক বছরে বরিশাল আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে কোণঠাসা হয়ে পড়া বহু নেতাকর্মী সক্রিয় হয়ে ওঠেন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে। একই সঙ্গে পাল্টে যেতে শুরু করে রাজনৈতিক ক্ষমতার মেরুকরণের চিত্র। খায়ের আবদুল্লাহ মনোনয়ন পাওয়ার পরই সাদিকপন্থিরা অনেকটা কোণঠাসা হয়ে পড়েন। নগরের বিভিন্ন খাতে সাদিক আবদুল্লাহর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া হতে থাকে। যার পালে জোর লেগেছে খায়ের আবদুল্লাহ ১২ জুনের ভোটে মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর। সব মিলিয়ে খায়ের আবদুল্লাহকে ঘিরে বরিশাল আওয়ামী লীগে নতুন শক্তির উত্থান ঘটতে শুরু করেছে।
মেয়র পদে ক্ষমতার পালাবদলে এরই মধ্যে নগরের পরিবহন খাতে সাদিক আবদুল্লাহর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া হয়ে গেছে। শুধু তা-ই নয়, নবনির্বাচিত মেয়র খায়ের আবদুল্লাহর অনুসারী দাবি করে সাদিক আবদুল্লাহ ও তার অনুসারীদের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন বাজার-ঘাটসহ পাবলিক টয়লেটেরও দখল নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব ঘটনায় একদম চুপচাপ থাকতে দেখা যাচ্ছে মেয়র সাদিক অনুসারীদের।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খোকন সেরনিয়াবাত মনোনয়ন পাওয়ার পরেই তার হয়ে নির্বাচনী মাঠে সক্রিয় হয়ে ওঠে এত দিন কোণঠাসা হয়ে থাকা সাদিক আবদুল্লাহর অনুসারীরা। তারা প্রত্যেকেই নিজেদের খোকন সেরনিয়াবাতের অনুসারী বলে দাবি করেন। তাদের বেশিরভাগই আবার পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী কর্নেল (অব.) জাহিদ ফারুক শামীমের অনুসারী হিসেবে পরিচিত। দীর্ঘদিন সাদিক ও তার অনুসারীদের কারণে বরিশাল নগরীতে কোণঠাসা হয়ে থাকার পর খোকন সেরনিয়াবাত নৌকার মনোনয়ন পাওয়ার পরপরই তারা চাঙা হয়ে ওঠে। আর একের পর এক সাদিক আবদুল্লাহর অনুসারীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা নগরীর রুপাতলী হাউজিং বাজার, নথুল্লাবাদ বাজার, রূপাতলী বাস টার্মিনাল ও টার্মিনালের পাবলিক টয়লেট দখলে নেওয়া হয়।
এত দিন বরিশাল নগরীর রূপাতলী হাউজিং বাজারের ইজারা সংগ্রহ করতেন মেয়র সাদিক অনুসারী ২৫ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সম্পাদক মীর শহীদুল ইসলাম রনি। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘হাউজিং বাজার বরিশাল সিটি করপোরেশন আমার নামে ইজারা দিয়েছে। কিন্তু ১২ জুনের পর সুলতানের লোক মান্নানের নেতৃত্বে বাজারে টাকা তুলছে।’
রূপাতলী বাস টার্মিনাল দখলেরও অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে স্থানীয় বর্তমান কাউন্সিলর জাকির হোসেন বলেন, ‘শুনেছি বাস টার্মিনাল, বাজার, পাবলিক টয়লেট দখল করেছেন সুলতান নামের এক ব্যক্তি। টার্মিনালের কাউন্টারে তাদের লোকজন বসিয়েছে। প্রতিমন্ত্রীর প্রভাব খাটিয়ে ১২ জুনের পর রূপাতলীতে এসব ঘটনা ঘটে আসছে।’
তবে অভিযোগ ভিত্তিহীন দাবি করে নগরীর ২৫ নম্বর ওয়ার্ডের নবনির্বাচিত কাউন্সিলর সুলতান আহমেদ বলেন, ‘যারা এ ধরনের অভিযোগ করছেন, তারা গত পাঁচ বছর চাঁদাবাজি করেছেন। বাসস্ট্যান্ড থেকে বিতাড়িত শ্রমিকেরা এখন টার্মিনালে এসে বসেছেন। আর হাউজিং বাজার মিল্টন এবং আমি করেছি। আর দখল করে ছিল রনি।’
রূপাতলী বাস টার্মিনালের পাবলিক টয়লেটটি আসলাম নামে এক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে পরিচালনার দায়িত্ব দেয় বরিশাল সিটি করপোরেশন। কিন্তু সেটিও দখল হয়েছে বলে জানান মো. আসলাম। তিনি বলেন, ‘আমি প্রতিবন্ধী হওয়ায় সিটি করপোরেশন আমাকে পাবলিক টয়লেট থেকে টাকা তোলার দায়িত্ব দিয়েছিল। কিন্তু সিটি নির্বাচনের রাতেই মো. ফিরোজ, কালু গাজীসহ শ্রমিক নেতা সুলতানের লোকজন এটি দখল করে নিয়েছে।’
অভিযোগ অস্বীকার করে সিটি করপোরেশনের ২৫ নম্বর ওয়ার্ডের সুপারভাইজার মো. ফিরোজ বলেন, ‘ভোটের পর রাতে শ্রমিকেরা পাবলিক টয়লেটটি ওপেন করে দিয়েছে।’
এ ছাড়া নগরীর নতুল্লাবাদ কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালসংলগ্ন বাজার দখলের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ওই বাজার সাদিক অনুসারী মহানগর আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক নীরব হোসেন টুটুলের অনুসারীদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে নথুল্লাবাদ বাজারটি বাংলা ১৪৩০ সনের জন্য ২ লাখ ৩০ হাজার টাকায় ইজারা পান মাহিমা এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী নিরব হোসেন টুটুল। কিন্তু ১৬ জুন সন্ধ্যায় নথুল্লাবাদ ও চৌমাথা বাজারের ইজারাদারের কর্মচারীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে টোল আদায় করে অন্য লোকজন।
যার বিরুদ্ধে বাজার দখলের অভিযোগ তিনি হলেন প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক শামীমের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ২০ নম্বর ওয়ার্ডের নবনির্বাচিত কাউন্সিলর জিয়াউর রহমান বিপ্লব। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘নথুল্লাবাদ বাজারটি সিটি করপোরেশনের তালিকাভুক্ত নয়। মেয়র সাদিক আবদুল্লাহ অবৈধভাবে ওই বাজার টুটুলকে ইজারা দিয়েছেন। টুটুল বাজারের আশপাশের টং দোকান থেকেও চাঁদা আদায় করতেন। আমার সুনাম ক্ষুণœ করতে ইজারাদারের লোকজন কুৎসা রটাচ্ছেন।’
এদিকে নগরীর বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার অনেকেই বলছেন, খোকন সেরনিয়াবাত কেবল নতুন মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। এখনো তিনি তার চেয়ারে বসতে পারেননি। তার নাম ভাঙিয়ে হয়তো একটি মহল তাকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করছে।
এ বিষয়ে গত মঙ্গলবার বরিশাল নগরীর একটি কনভেনশন হলে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক শামীম বলেন, ‘আমি অন্যায়ভাবে টিআর, কাবিখা থেকে কোনো ফায়দা লুটিনি। আমার নামে কেউ যদি দখলবাজি, চাঁদাবাজি করে থাকে আপনারা আমাকে বলবেন। মাছঘাট, বাসস্ট্যান্ড, বাজারঘাট দখলের সঙ্গে আমার বা নতুন মেয়রের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। টেন্ডার-প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এগুলো সবকিছু হবে।’
অন্যদিকে দলের কর্মীদের এমন কর্মকাণ্ডে খোকন সেরনিয়াবাত নিজেই বিব্রত বলে জানিয়েছেন তার নির্বাচন পরিচালনা কমিটিতে থাকা কয়েকজন সদস্য। দখলদার কিংবা তাদের ইন্ধনদাতা কেউ সরাসরি খোকনের অনুসারী নন বলেও দাবি করেন তারা।
এ প্রসঙ্গে মহানগর আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি ও খোকন সেরনিয়াবাতের প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট অ্যাডভোকেট আফজালুল করিম বলেন, ‘কারা ওই সব প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে, আমরা জানি না; তবে একটি মহল খোকন সেরনিয়াবাতের অনুসারী বলে অপপ্রচার চালাচ্ছে।’
আর দখলের রাজনীতি বরদাশত করা হবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন খোকন সেরনিয়াবাত। তিনি বলেন, ‘সবাইকে সতর্ক হতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কোনোমতেই দলে বিশৃঙ্খলাকারীদের জায়গা হবে না।’
