ঘুষ নেওয়ার সময় হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয়েছে সংস্থার মহাপরিচালকের (মানিলন্ডারিং) একান্ত সহকারী (পিএ) গৌতম ভট্টাচার্যসহ চারজনকে। এক ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অর্থ পাচারের ভুয়া অভিযোগের নোটিস পাঠিয়ে পরে তাকে রক্ষার কথা বলে ঘুষ নিচ্ছিল তারা।
এ সময় তাদের কাছ থেকে মিষ্টির চারটি প্যাকেট, নগদ দেড় লাখ টাকা, চারটি মোবাইল ফোন, দুদকের মনোগ্রামসহ খাকি রঙের একটি খাম ও প্যাডে লেখা একটি নোটিস উদ্ধার করা হয়।
গত শুক্রবার রাজধানীর মতিঝিলের হিরাঝিল হোটেল থেকে এই চারজনকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। গ্রেপ্তারকৃত অন্যরা হলেন চাকরিচ্যুত পুলিশ কনস্টেবল মো. এসকেন আলী খান (৫৭), হাবিবুর রহমান (৪২) ও পরিতোষ মন্ডল (৬৩)।
ডিবি জানিয়েছে, দুদক মহাপরিচালক গৌতম ভট্টাচার্যের বাড়ি মৌলভীবাজার। এসকেন আলীর বাড়ি গোপালগঞ্জ। অন্য দুজনও গোপালগঞ্জের বাসিন্দা এবং পেশাদার দালাল ও প্রতারক। চক্রটি যারা অল্প সময়ে ধনী হয়েছে তাদের টার্গেট করে। সারা দেশেই এদের সদস্য ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে।
গতকাল শনিবার দুপুরে রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান ডিএমপির ডিবি প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ। তিনি বলেন, সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসায়ী আশিকুজ্জামান আমদানির ব্যবসাও করেন। বায়তুল মোকাররম মসজিদের কার্পেটের দোকানে কার্পেট ও জায়নামাজ সরবরাহ করেন তিনি। গত ১৯ জুন তার স্ত্রী সন্তান প্রসবের জন্য হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। ২০ জুন সকালে আশিকুজ্জামানের উত্তরার বাসায় দুদকের মনোগ্রাম সংবলিত খাকি রঙের খামে একটি নোটিস নিয়ে একজন কথিত কর্মকর্তা হাজির হন। সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসার আড়ালে স্বর্ণ চোরাচালান এবং মানি লন্ডারিং সংক্রান্ত বিভিন্ন অভিযোগ তোলেন তার বিরুদ্ধে। স্ত্রীর হাসপাতালে অবস্থান এবং দুদকের এই ভয়ানক অভিযোগ শুনে ঘাবড়ে যান তিনি। তখন দুদকের সেই কথিত কর্মকর্তা আশিকুজ্জামানকে সহানুভূতি দেখানোর ভান করে তাকে তখনই মোবাইল ফোন বন্ধ করে আত্মগোপনে যাওয়ার পরামর্শ দেন। এও বলেন যে, ডিবি, সিআইডি, বাংলাদেশ ব্যাংক, দুদক ও জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) তাকে খুঁজছে। ইতিমধ্যে দুদক তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির একটি অভিযোগ আমলে নিয়েছে।
ডিবি প্রধান বলেন, নোটিস বহনকারী ব্যক্তিটি হোয়াটসঅ্যাপে দুদকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে এক ব্যক্তির সঙ্গে আশিকুজ্জামানকে কথা বলিয়ে দেন। কথিত ওই কর্মকর্তা মোবাইলে কথা না বলে বিস্তারিত জানার জন্য তাকে দুদক অফিসে আসতে বলেন। কথিত নোটিসে বিভিন্ন অভিযোগের পাশাপাশি উল্লেখ করা হয়, ‘শূন্য থেকে আশিকুজ্জামান আজ কোটি কোটি টাকার মালিক। তাকে দুদকের জিম্মায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সব প্রমাণ পাওয়া যাবে। এ অবস্থায় প্রচলিত আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন।’ এতে কারণ দর্শানোসহ ব্যক্তিগত শুনানির জন্য আগামী ১০ জুলাই তাকে তলবের কথা বলা হয়।
হারুন অর রশীদ বলেন, ঘাবড়ে যাওয়া আশিকুজ্জামানকে হোয়াটসঅ্যাপ থেকে দফায় দফায় ফোন দিয়ে ভয় দেখানো হয় যে, তার সম্পত্তি ক্রোক হবে, তার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হবে, তার মানসম্মান যাবে। এক পর্যায়ে আশিকুজ্জামানকে মতিঝিলের হিরাঝিল হোটেলের দ্বিতীয় তলায় এসে সমঝোতার প্রস্তাব দেওয়া হয়। সমঝোতার জন্য প্রথমে দুই কোটি টাকা দিতে বলা হয়। পরে তা কমিয়ে এক কোটি টাকা করা হয়। বিনিময়ে সমস্ত অভিযোগ থেকে অব্যাহতির নিশ্চয়তা দেওয়া হয়। এই এক কোটি টাকার মধ্যে গত শুক্রবার জুমার আগে ২০ লাখ টাকা দিতে বলা হয়। বাকি টাকা রবিবার ব্যাংক চলাকালে দিতে বলা হয়।
ডিবি প্রধান বলেন, ভুক্তভোগী ডিবির লালবাগ বিভাগকে জানালে তারা দুদকের সঙ্গে যোগাযোগ করে। ঘটনার দিন সংস্থার উপপরিচালক নজরুল ইসলাম ও ডিবির একটি দল হোটেল হিরাঝিলের আশপাশে অবস্থান নেয়। আগে থেকে বলে রাখা কথামতো আশিকুজ্জামান চারটি মিষ্টির প্যাকেটে তার স্বাক্ষরিত দেড় লাখ টাকা নিয়ে হিরাঝিলে যান। তার কাছ থেকে মিষ্টির প্যাকেটে থাকা টাকা গ্রহণ করার সময় ডিবি সদস্যরা দুদকের ডিজির পিএ গৌতমসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করেন।
গৌতমের বিষয়ে ডিবি প্রধান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দুদকের বিভিন্ন মহাপরিচালকের পিএ হিসেবে কাজ করে আসছেন গৌতম। তিনি কখনো দুদকের ডিজি (তদন্ত), ডিজি (অ্যাডমিন), ডিজি (প্রসিকিউশন), ডিজির (মানি লন্ডারিং) পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট (পিএ) হিসেবে কর্মরত। সেই সূত্রে দুর্নীতির অভিযোগ বিষয়ে কীভাবে নোটিস পাঠাতে হয়, কীভাবে তাদের কাছ থেকে আত্মপক্ষ সমর্থনমূলক বক্তব্য নেওয়া হয় এবং অভিযোগ গঠন করা হয় এসব জানতেন। এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তিনি সহযোগীদের দিয়ে ব্যবসায়ী, শিল্পপতি এবং চাকরিজীবীদের টার্গেট করতেন। তাদের ব্যক্তিগত নানা তথ্য সংগ্রহ করে দুদকের চিঠির খাম ও প্যাড ব্যবহার করে অভিযোগের নোটিস পাঠাতেন। পরে নানা ভয়ভীতি দেখিয়ে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার কথা বলে টাকা আদায় করতেন। তাদের সঙ্গে দুদক কার্যালয়ের দায়িত্বশীল আরও কেউ জড়িত আছে কি না তা খতিয়ে দেখার জন্য আসামিদের জিজ্ঞাসা করা হবে বলে জানান ডিবির এই কর্মকর্তা।
