বরিশালে শিল্পের প্রসার গ্যাসের অভাব খুলনায়

আপডেট : ২৫ জুন ২০২৩, ০২:০৭ এএম

স্বপ্নের পদ্ম সেতু নিয়ে নদী এবং সাগর ঘেরা দক্ষিণ জনপদে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখেছিলেন এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষ। ২০২২ সালের ২৫ জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেতুর উদ্বোধন করেছিলেন। আজ পদ্মা সেতু উদ্বোধনের এক বছর পূর্তি। চালুর এক বছরের মধ্যেই গোটা দক্ষিণ জনপদের ছয় জেলার যোগাযোগে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তনের ছোঁয়া। সেতুকে ঘিরেই ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পকারখানা গড়ে উঠতে শুরু করেছে এ অঞ্চলে। ইতিমধ্যে বরিশাল বিসিকি শিল্পনগরীতে অনেক নতুন কারখানা উৎপাদনে গেছে। এছাড়াও পর্যটন খাতের আয় বেড়েই চলছে। যোগাযোগ সহজ ও দ্রুততর হওয়ায় সাধারণ মানুষ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আয়ও বেড়েছে। তবে এক বছরে কাক্সিক্ষত সুফল পাননি খুলনার ব্যবসায়ীরা। গ্যাস না আসায় গড়ে উঠছে না নতুন নতুন শিল্প-কলকারখানা। ফলে যোগাযোগ ও পণ্য পরিবহন সুবিধা বাড়লেও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ছে না।

ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পকারখানা গড়ে উঠতে শুরু করেছে : বরিশাল বিসিক শিল্প নগরীর প্রমোশন কর্মকর্তা মো. গোলাম রসুল (রাসেল) দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পদ্মা সেতু চালুর পর নতুন করে ১০টি ফ্যাক্টরি চালু হয়েছে। এর মধ্যে ৬টি উৎপাদনরত বাকি ৪টি আন্ডার কনস্ট্রাকশন। এছাড়াও নতুন করে চারটি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দুই রুগ্ণ শিল্প চালু করা হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে অনেক উদ্যোক্তা আমাদের সাড়া দিচ্ছেন। আগামী মাসেও আরও পাঁচ জনকে প্লট বরাদ্দ দেওয়া হবে।’ তবে প্রাথমিকভাবে একটি গার্মেন্টস কারখানার কার্যক্রম শুরু হয়েছিল কিন্তু গ্যাস না থাকায় তারা উৎপাদনে যেতে পারছেন না।

বরিশাল থেকে ঢাকার যাত্রাবাড়ীর দূরত্ব প্রায় ১৮৭ কিলোমিটার। এই সড়ক পাড়ি দিতে এখন সময় লাগে ছয় থেকে আট ঘণ্টা। কোনো কোনো সময় তারও বেশি সময় ব্যয় হতো বরিশাল থেকে ঢাকা পৌঁছাতে। শুধু মাত্র ফেরিতে উঠতেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষায় থাকতে হতো। এছাড়াও পণ্যবাহী যানবাহনগুলোকেও ফেরিঘাটে বসে থাকতে হতো ২-৩ দিন। কিন্তু পদ্মা সেতু নির্মাণ হওয়ার ফলে পুরো চিত্র পাল্টে গেছে। এখন দক্ষিণ জনপদের সব জেলা-উপজেলায় সরাসরি বড় বড় পরিবহনগুলো যাত্রী সেবা দিয়ে যাচ্ছে। কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করছেন পরিবহন মালিকরাও। অঞ্চলটির বিভিন্ন রুটে বেড়েছে দূরপাল্লার গণপরিবহন। এখন বরিশাল নতুল্লাবাদ থেকে ঢাকায় সাড়ে তিন ঘণ্টায় যাওয়া যায়। যেখানে আগে লাগত ৭ ঘণ্টার বেশি। তবে ভাঙ্গা থেকে কুয়াকাটা সড়ক প্রশস্ত না হওয়ায় এবং এই লাইনে প্রচুর গাড়ির চাপ থাকায় ভোগান্তি হচ্ছে।

এদিকে পদ্মা সেতু বহুমুখী সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে সাগরকন্যা কুয়াকাটার। ঢাকা থেকে মাত্র পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টার চেয়েও কম সময়ে কুয়াকাটায় যাত্রী সেবা দিয়ে যাচ্ছে পরিবহনগুলো। যেখানে আগে সময় লেগে যেত ১২/১৩ ঘণ্টা। এখন বিরতি ছাড়াই রাজধানী থেকে সমুদ্রের তীরে নামেন পর্যটকরা। যার ফলে এখন কুয়াকাটা পর্যটকবান্ধব হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি এই অঞ্চলে নতুন আবাসিক হোটেল-মোটেল, রেস্তোরাঁ গড়ে উঠেছে।

কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. মোতালেব শরীফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পদ্মা সেতু চালুর পর কুয়াকাটায় এখন দ্বিগুণের বেশি যাত্রীদের চাপ বেড়েছে। প্রতিদিন প্রায় ২৫০টি পরিবহন আসা-যাওয়া করে ঢাকা টু কুয়াকাটা। এই সেতুর কারণে ঢাকা থেকে কোনো রকমের ভোগান্তি ছাড়াই কেউ কুয়াকাটায় আসতে চাইলে তিনি মাত্র ৫ থেকে ৬ ঘণ্টায় কুয়াকাটায় আসতে পারেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘গত এক বছরে কুয়াকাটায় বড় আবাসিক হোটেলের থেকে ছোট ছোট অনেক নতুন হোটেলে উঠেছে। যার সংখ্যা এখন প্রায় ২০০ ছুঁই ছুঁই। এর আগে মাত্র ৩০ থেকে ৩৫টি আবাসিক হোটেল ছিল।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কৃষি ও মৎস্য খাতেও আসছে ব্যাপক পরিবর্তন। বরিশালে উৎপাদিত কাঁচা পণ্য, মাছ, ঐতিহ্যবাহী ভিরুলীর পেয়ারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এখন দ্রুত এবং খুব সহজেই পৌঁছে যায়।

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান ও সহকারী অধ্যাপক রিফাত ফেরদৌস দেশ রূপান্তরকে বলেন, বরিশাল ও খুলনা বিভাগের যোগাযোগ ও ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন এসেছে। এই অঞ্চলের মানুষ চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা বা ব্যক্তিগত কাজে যখন ঢাকায় মুভ করত এক থেকে দুদিনের পরিকল্পনা হাতে নিয়ে মুভ করতে হতো; সেখানে একজন মানুষের দুদিনের খরচ বহন করতে হতো। কিন্তু আমরা এখন এক বেলাতেই কাজ সেরে ফিরতে পারছি। এখন দেখা যাচ্ছে- বরিশালের মানুষজন ভোরবেলা বের হয়ে দুপুরের মধ্যে ঢাকার কাজ সেরে আবার সন্ধ্যার মধ্যে বাসায় ফিরে আসেন। তাহলে এখানে কিন্তু পদ্মা সেতুর জন্য মানুষের ব্যক্তিজীবনে একপ্রকার সাশ্রয় চলে আসছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ব্যবসার ক্ষেত্রে আমরা দেখি, ফেরিতে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে; যেমন কাঁচামাল, মাছ, পেয়ারা বা এই অঞ্চল থেকে যে ধরনের ফলমূল উৎপাদন হতো অধিকাংশই থেকে যেত। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যেত খুবই অল্পমূল্যে এবং অনেক সময় কৃষকরা দামাদামি করতে পারতেন না। তাদের পণ্য অল্প দামেই বিক্রি করতেন। এই দিকগুলোতে কিন্তু পরিবর্তন এসেছে। শরিয়তপুর, মাদারীপুর, খুলনার চিংড়ি এখন ন্যায্যমূল্যে বিক্রি করতে পারছেন এবং গ্রাহক পর্যায়ে সহজে সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য পৌঁছে যাচ্ছে।

দক্ষিণে শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনে বড় বাধা গ্যাস-অপ্রশস্ত রাস্তা : খুলনার সঙ্গে রাজধানীসহ সারা দেশের নিরবচ্ছিন্ন সড়ক যোগাযোগে কমেছে যাতায়াতের সময় ও পথের দূরত্ব। তবে সেতু চালুর এক বছর পার হলেও কাক্সিক্ষত সুফল পাচ্ছেন না খুলনার ব্যবসায়ীরা। গ্যাস না আসায় গড়ে উঠছে না নতুন নতুন শিল্প-কলকারখানা। ফলে কর্মসংস্থানের সংখ্যাও বাড়ছে না। যোগাযোগের উন্নয়ন হলেও এখনো পিছিয়ে রয়েছে শিল্পাঞ্চল খ্যাত খুলনা। ব্যবসায়ীরা বলছেন খুলনার অর্থনৈতিক উন্নয়নে দরকার গ্যাস।

খুলনা চেম্বার অব কমার্সের পরিচালক মো. মহিদুল ইসলাম টুটুল বলেন, পদ্মা সেতুর ফলে রাজধানীর সঙ্গে আমাদের সেতুবন্ধন হয়েছে। নাগরিক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে গ্যাস না থাকায় শিল্পবিপ্লব হয়নি। গ্যাস না থাকলে উৎপাদিত পণ্যের উৎপাদন খরচ প্রায় ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। ফলে উদ্যোক্তাদের প্রতিযোগিতার মার্কেটে টিকে থাকা কঠিন।

খুলনা চেম্বার অব কমার্সের সহ-সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বিশ্বাস বুলু বলেন, কাঁচামাল (মাছ-সবজি) ব্যবসায়ীরা লাভবান হচ্ছেন, এখন আর পণ্য ঢাকায় নিতে পচন ধরে না। কৃষকরা লাভবান হচ্ছেন। মোংলার দিকে ছোট শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে। এছাড়া সর্বত্র বেড়েছে ছোট-বড় দোকান ও বাণিজ্যিক অবকাঠামো। তবে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান গ্যাস ছাড়া চালালে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হবে। বাণিজ্যিকভাবে হলেও গ্যাসের ব্যবস্থা করা গেলে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে।

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)-এর সাবেক সভাপতি খুলনা-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুস সালাম মুর্শেদী বলেন, বহু শিল্পোদ্যোক্তা ইতিমধ্যে জমি কিনে রেখেছেন। তবে শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের জন্য গ্যাস সংযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গ্যাস সংযোগ হলে ময়মনসিংহ এলাকার মতো খুলনা- মোংলায় পোশাক ও বস্ত্র খাতসহ অন্যান্য শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে। মোংলা বন্দরের ব্যবহারও বহুলাংশে বেড়ে যাবে। আগামী ১০ বছরে জিডিপিতে যে গ্রোথ লাভ করবে তাতে দক্ষিণাঞ্চল বড় ভূমিকা রাখবে। আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি, গ্যাস কখন আসবে। গ্যাস এলেই শিল্পবিপ্লব শুরু হবে। ফের খুলনা হয়ে উঠবে দ্বিতীয় বৃহত্তর শিল্পনগরী। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে গ্যাস সংযোগের ব্যবস্থা করার বিশেষ অনুরোধ করছি।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) খুলনার সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট কুদরত ই খুদা বলেন, পদ্মা সেতু ঘিরে খুলনার মানুষের অনেক প্রত্যাশা ছিল। শিল্প-কলকারখানা গড়ে উঠবে। খুলনা কর্মসংস্থানের শহর হিসেবে গড়ে উঠবে। তবে খুলনার মানুষের আকাক্সক্ষা এখনো পূরণ হয়নি। জুট মিল, নিউজপ্রিন্ট মিল, হার্ডবোর্ড মিল বন্ধ হওয়ায় খুলনা এখন মৃত্যুপুরী। ফলে কর্মসংস্থানের অভাবে খুলনা শহরের লোকসংখ্যা কমে যাচ্ছে। খুলনার মানুষের দাবিÑ এসব মিল চালুর পাশাপাশি নতুন নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠুক। তিনি আরও বলেন, পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ করা এখন খুলনার মানুষের প্রাণের দাবি। অপ্রশস্ত সংযোগ সড়কও কলকারখানা গড়ে তোলার অন্তরায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাস্তাঘাট যতটুকু প্রশস্ত দরকার সেটা এখনো হয়ে ওঠেনি। সংযোগ সড়কগুলো ৬-লেন করা জরুরি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত