এ বছর ডেঙ্গুর ধরন ‘ডেন-২’ ও ‘ডেন-৪’-তে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। এর মধ্যে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে ‘ডেন-২’-তে। এ ধরনের ডেঙ্গুর প্রকোপ প্রথম দেখা দেয় সাত-আট বছর আগে। মাঝখানের বছরগুলোতে অল্পসংখ্যক হলেও এ ধরনের ডেঙ্গুর প্রকোপ ছিল। সে হিসেবে এবার দেখা দেওয়া ‘ডেন-৪’ ডেঙ্গু বাংলাদেশে নতুনই বলা চলে। কারণ গত বছর এ ধরনটি প্রথম সীমিত আকারে দেখা দেয়। এ ছাড়া এ বছর ডেঙ্গুর আরেকটি ধরন ‘ডেন-৩’ও পাওয়া যাচ্ছে। গত বছর এ ধরনের প্রকোপ ছিল সবচেয়ে বেশি।
সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি থাকা ১০০ রোগীর নমুনা পরীক্ষা করে ডেঙ্গুর ধরনের এ তথ্য পেয়েছে। আইডিসিআরের রোগতত্ত্ববিদরা দেশ রূপান্তরকে জানান, চার ধরনের ডেঙ্গু রয়েছেÑ ডেন-১, ডেন-২, ডেন-৩ ও ডেন-৪। কেউ যেকোনো একটি ধরনে আক্রান্ত হলে তার শরীরে ওই ধরনের ডেঙ্গুর প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে তিনি আর সেই ধরন দ্বারা আক্রান্ত হন না। তবে অন্য ধরনে আক্রান্ত হতে পারেন। এভাবে চার ধরন দ্বারা মোট চারবার আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তবে প্রথমবার আক্রান্ত হওয়া ব্যক্তি যদি দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হন এবং সেটি যদি ডেঙ্গুর নতুন ধরন হয়, যা আগে কখনো সেভাবে দেখা যায়নি, তাহলে রোগের তীব্রতা ও জটিলতা দুটোই বাড়ে।
আইইডিসিআর থেকে জানানো হয়েছে, গত বছর ২০২২ সালে নমুনা বিশ্লেষণে ৯০ শতাংশই ডেন-৩ ছিল। ১০ শতাংশ ছিল ডেন-৪। এবার প্রাথমিকভাবে ১০০ রোগীর নমুনা বিশ্লেষণ করে ডেন-২, ডেন-৩ ও ডেন-৪ বেশি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ডেন-৪ পাওয়া গেছে গত বছরের চেয়ে বেশি।
এ ব্যাপারে আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, এবার রোগী ও মৃত্যুর যে সংখ্যা, তাতে মনে হচ্ছে মানুষ ডেন-২ ও ডেন-৪ দ্বারা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। এবার যারা দ্বিতীয়বারের মতো আক্রান্ত হচ্ছে, তাদের হেমোরেজিক বা রক্তক্ষরণ হচ্ছে। প্রথমবার আক্রান্ত হলে হেমোরেজিক হয় না।
এমন অবস্থায় গত ২৪ ঘণ্টায় (গত শনিবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল রবিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) দেশে ডেঙ্গুতে আরও তিনজন মারা গেছে। এ সময় দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৩৯৯ জন। এ নিয়ে এখন পর্যন্ত এ বছর দেশে মোট ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়াল ৭ হাজার ২৩৮ ও মারা গেছে ৪৫ জন।
এবার ডেন-৪ দেখা যাচ্ছে : এ বছরের ডেঙ্গুর ধরন প্রসঙ্গে ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, যে প্রাথমিক ডেটা পাওয়া গেছে, তাতে ডেন-২ এটা এ বছর বেশি দেখা যাচ্ছে। এ ধরনটি সাত-আট বছর আগে ছিল। এখন নতুন ধরন এলেই বিপদ। কারণ আগের বছর যে ধরনে মানুষ আক্রান্ত হয়েছে, তারা যদি এ বছর দ্বিতীয়বারের মতো নতুন ধরন দিয়ে আক্রান্ত হয়, সেটা জটিল হবে।
‘তবে আরেকটা বিষয় হচ্ছে, গত বছর ডেন-৪ কম দেখা গিয়েছিল। এটা এবার দেখা যাচ্ছে। ডেন-৪ আমাদের দেশে নতুন, আগে ছিল না। গত বছরই বেশি দেখা গেছে। যারা গত বছর অন্য ধরন, যেমনÑ ডেন-১ ও ডেন-৩ দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে, তারা যদি এবার ডেন-৪ দিয়ে আক্রান্ত হয়, তাদের অবস্থা জটিল হবে’Ñ বলেন এ রোগতত্ত্ববিদ।
এ ব্যাপারে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার দেশ রূপান্তরকে বলেন, যখন অনেক বছর ধরে একটি দেশে ডেঙ্গু থাকে, তখন দেখা যায় একাধিক ব্যক্তির ডেঙ্গু হয়। একই ব্যক্তির যখন একাধিকবার ডেঙ্গু হয়, তখন তার জন্য ঝুঁকি বেড়ে যায়। সেজন্য আমাদের মৃত্যু বেড়ে যাচ্ছে।
আগস্ট-সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাড়বে : এ বছর আগস্ট-সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে থাকবে বলে জানান ডা. মুশতাক হোসেন ও অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার। তারা দুজনই জানান, বলতে গেলে এখনো ডেঙ্গুর মৌসুম শুরুই হয়নি। বর্ষাকাল তো মাত্র শুরু হচ্ছে। চলবে আগস্ট-সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। সে সময় পর্যন্ত ভয় আছে। অর্থাৎ আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে সর্বোচ্চ রোগী হবে। সে সময় পর্যন্ত রোগী বাড়তেই থাকবে ও প্রতিদিন বাড়বে।
মোট রোগীর ৭২% এ মাসেই : এ বছর মোট ভর্তি রোগীর ৭২ শতাংশই ভর্তি হয়েছে এ মাসের গত ২৫ দিনে। এরপর সর্বোচ্চ ১ হাজার ৩৬ রোগী ভর্তি হয়েছে গত মে মাসে, যা মোট ভর্তি রোগীর ১৪ শতাংশ। এরপর জানুয়ারিতে ৫৬৬, ফেব্রুয়ারিতে ১৬৬, এপ্রিলে ১৪৩ ও মার্চে ১১১ জন ভর্তি হয়েছে। অন্যদিকে চলতি মাসের গত ২৫ দিনে মারা গেছে ৩২ জন, যা মোট মৃত্যুর ৭১ শতাংশ। বাকিদের মধ্যে ছয়জন মারা গেছে জানুয়ারিতে, তিনজন ফেব্রুয়ারিতে ও দুজন করে এপ্রিল ও মে মাসে। মার্চে কোনো মৃত্যু ছিল না।
ঢাকায় ৭৭% রোগী : এ বছর এখন পর্যন্ত ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৫ হাজার ৬১৯ জন রোগী, যা দেশে মোট ভর্তি রোগীর ৭৭ শতাংশ। বাকি ১ হাজার ৬১৯ জন রোগী ভর্তি হয়েছে ঢাকার বাইরের বিভিন্ন হাসপাতালে।
পরিচ্ছন্নতা অভিযানের পরামর্শ : ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে জোরালো পরিচ্ছন্নতা অভিযান দরকার বলে মনে করেন ডা. মুশতাক হোসেন। তিনি বলেন, ষাটের দশকে যেভাবে পরিচ্ছন্নতা অভিযান হয়েছে, সেভাবে পরিচ্ছন্নতা অভিযান করা দরকার। পরিচ্ছন্নতা অভিযান না করলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না।
এ রোগতত্ত্ববিদ বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে এখন সর্বাত্মক চেষ্টা দরকার। সর্বাত্মক চেষ্টাটা অস্থায়ী হলে হবে না, টানা পাঁচ বছর চালাতে হবে। একদিকে মশা নিয়ন্ত্রণ,পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা; অন্যদিকে মানুষ যেন শনাক্ত হলে দ্রুত চিকিৎসার অধীনে যায়Ñ এমন উদ্যোগ দরকার। দেরিতে শনাক্ত বা শনাক্ত হওয়ার পর চিকিৎসা পেতে দেরি হলে জটিলতা হয়। ডেঙ্গু টেস্টকে করোনা টেস্টের মতো সহজলভ্য করা দরকার।
ডা. মুশতাক আরও বলেন, আবহাওয়া দিন দিন গরম হয়ে যাচ্ছে। ফলে শীতকালেও এডিস মশা দেখতে পাচ্ছি। সাধারণত শীতকালে যে তাপমাত্রা, তাতে ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয় না। কিন্তু এখন শীতকালেও আবহাওয়া গরম হওয়া, এডিস মশা জন্ম নিচ্ছে।
