ঢাকার প্রবেশদ্বার যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান ফ্লাইওভারের গা-ঘেঁষে অবস্থিত মারকাযুত তাহফিজ ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসা। মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল হাফেজ নেছার আহমাদ আন-নাছিরী। এ মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা দেশ-বিদেশের কোরআন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে সফলতার স্বাক্ষর রাখছে। কোরআন প্রতিযোগিতায় হাফেজদের সাফল্য ও বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার আয়োজনসহ নানা প্রসঙ্গে তিনি কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এহসান সিরাজ
দেশ রূপান্তর : কোরআন মাজিদের সঙ্গে কত বছরের সম্পর্ক আপনার?
হাফেজ নেছার আহমাদ আন-নাছিরী : একেবারে শৈশবে যখন কোরআন তেলাওয়াত শুনতাম ভালো লাগত। এরপরে বাবা-মা যখন মাদ্রাসায় দিলেন তখন কোরআন মাজিদকে ভালোবেসে বুকে ধারণ করে নিলাম, নীরবে-নিভৃতে শুধু কোরআন তেলাওয়াতই করতাম, সে হিসেবে বলা চলে, একেবারে শৈশব থেকেই কোরআন মাজিদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক।
দেশ রূপান্তর : শিক্ষকতা পেশায় কেন আসলেন?
হাফেজ নেছার আহমাদ আন-নাছিরী : হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ওই ব্যক্তি, যে নিজে কোরআন শিক্ষা করে এবং অন্যকে শিক্ষা দেয়।’ আর অন্যকে কোরআন মাজিদ শেখানোর সর্বোত্তম জায়গা হলো- মাদ্রাসা। উত্তম জায়গায় উত্তম কাজের জন্য শিক্ষকতায় আসা। কোরআনের বাণীকে ছড়িয়ে দিতে কিছুটা ভূমিকা রাখার চেষ্টা করা।
দেশ রূপান্তর : দেশে তো অনেক হেফজ মাদ্রাসা আছে, তাহলে নিজে আবার কেন মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করলেন?
হাফেজ নেছার আহমাদ আন-নাছিরী : শিক্ষকতার শুরুতে আমি প্রথমে অন্য একটি প্রতিষ্ঠানে ছিলাম দীর্ঘদিন। এরপর আল্লাহপাক রাব্বুল আলামিন আমাকে সৃজনশীল যে প্রতিভা দান করেছেন, সেটাকে কাজে লাগাতেই স্বতন্ত্র মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার চিন্তা করি। যে প্রতিষ্ঠান হবে অন্য প্রতিষ্ঠান থেকে আলাদা ও ভিন্ন। আলহামদুলিল্লাহ, আমাদের মাদ্রাসা থেকে প্রতি বছর শতাধিক শিক্ষার্থী কোরআন মাজিদের হাফেজ হচ্ছে। তাদের অনেকেই বিদেশের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক হিফজুল কোরআন ও কেরাত প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে সফলতার স্বাক্ষর রাখছে। বাংলাদেশে জাতীয়ভাবে আয়োজিত এবং বিভিন্ন বেসরকারি টেলিভিশনের প্রতিযোগিতাতেও আমাদের ছাত্রদের সফলতার হার ঈর্ষণীয়। যেমন চলতি ২০২৩ সালে বিভিন্ন দেশে অনুষ্ঠিত কয়েকটি প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে এ পর্যন্ত চারটি পুরস্কার অর্জন করেছে মারকাযুত তাহফিজের শিক্ষার্থীরা। ঈদের পরে আরও কয়েকটি প্রতিযোগিতা রয়েছে, যেখানে আমাদের শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবে।
দেশ রূপান্তর : আপনার প্রতিষ্ঠানের উল্লেখযোগ্য সফলতা কী?
হাফেজ নেছার আহমাদ আন-নাছিরী : আলহামদুলিল্লাহ, সৌদি আরব, দুবাই, জর্দান এবং কাতার ছাড়াও বিশ্বের অর্ধশতাধিক দেশ থেকে আমাদের মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা একাধিকবার প্রথম, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় স্থান অর্জনসহ শতাধিক পুরস্কার এনেছে। জাতীয়ভাবে এনটিভি, বাংলাভিশনসহ বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে আমার ছেলেরা সর্বোচ্চ সফলতা অর্জন করেছে।
দেশ রূপান্তর : শিক্ষার বাইরে আপনার কার্যক্রম কী?
হাফেজ নেছার আহমাদ আন-নাছিরী : মানুষের সেবা করাই হচ্ছে একজন প্রকৃত মুমিনের কাজ, তাই আমি সর্বদা চেষ্টা করি নিজেকে সামাজিক সব ভালো কাজের সঙ্গে যুক্ত রাখতে। হোক সেটা প্রকাশ্যে বা গোপনে। আমার একটি ফাউন্ডেশন আছে। এর উদ্যোগে বয়স্ক হাফেজদের নির্দিষ্ট সময়ের পর একটা ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা করে থাকি। অসহায় আলেম-উলামাদের চিকিৎসা সহায়তা দিই। তাছাড়া বিভিন্ন দুর্যোগে সাধ্যমতো মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি।
দেশ রূপান্তর : মাদ্রাসার বাইরের সাধারণ শিক্ষার্থী বা পড়ুয়াদের জন্য আপনার কোনো পরিকল্পনা আছে কি?
হাফেজ নেছার আহমাদ আন-নাছিরী : আমার প্রতিষ্ঠানগুলোতে অনেক ছাত্রছাত্রী এমন রয়েছে যারা মূলত স্কুলে পড়ে এবং নির্দিষ্ট একটা সময়ে এসে মাদ্রাসায় সময় দেয় এবং কোরআন শেখে। আমি চেষ্টা করছি, স্বতন্ত্র একটি ‘কুরআনিক বিশ্ববিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠার। আল্লাহর রহমতে কাজ অনেকটা এগিয়েছে, গত বছর ভবন নির্মাণের কাজ ধর্ম প্রতিমন্ত্রী ফরিদুল হক খান দুলাল এমপি উদ্বোধন করে এসেছেন।
একটি দীর্ঘ পরিকল্পনা নিয়ে সামনে আগানোর চেষ্টা করছি। সবার দোয়া চাই, আল্লাহতায়ালা যেন স্কুল-কলেজপড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রীদেরসহ সবাইকে নিয়ে একটি কোরআনিক বিশ্ব গড়ার তওফিক দান করেন।
দেশ রূপান্তর : মেয়েদের নিয়ে আলাদা কোনো পরিকল্পনা আছে?
হাফেজ নেছার আহমাদ আন-নাছিরী : অবশ্যই, সুশিক্ষিত মা তৈরির শুধু পরিকল্পনাই নয়, আল্লাহপাকের অশেষ রহমতে মারকাযুত তাহফিজ মহিলা মাদ্রাসা স্বতন্ত্র ভবনে সুন্দরভাবে পরিচালিত হয়ে আসছে দীর্ঘদিন যাবৎ। যেখান থেকে আন্তর্জাতিক মানের অসংখ্য হাফেজ তৈরি হচ্ছে এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে পুরস্কার নিয়ে আসছে।
দেশ রূপান্তর : আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ, ছাত্রদের হিফজ নিয়েই ব্যস্ত থাকেন, এ জন্য অন্যান্য পড়াশোনার ব্যাপারে ছাত্রদের তেমন আগ্রহ থাকে না?
হাফেজ নেছার আহমাদ আন-নাছিরী : দেখুন, না জানার কারণে হয়তো কেউ কেউ এমনটা মনে করতে পারেন। বাস্তবতা হলো, হিফজ বিভাগের পাশাপাশি আমাদের মাদ্রাসায় কিতাব বিভাগও চালু আছে। যারা বিদেশে প্রথম, দ্বিতীয় বা তৃতীয় হচ্ছে তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরাই আমাদের কিতাব বিভাগে পড়াশানা করছেন। এবার কওমি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ স্তর দাওরায়ে হাদিস (মাস্টার্স) পরীক্ষায় মারকাযুত তাহফিজের ছাত্র মাদানিনগর মাদ্রাসা থেকে পরীক্ষা দিয়ে সারা বাংলাদেশে প্রথম স্থান অধিকার করেছে। সমস্যা হলো, ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ভালো দিকগুলো প্রচারণায় কম আসে, মানুষ না জেনেই বিভিন্ন রকম মন্তব্য করে। এমন অযাচিত সমালোচনা ভালো কাজের প্রতিবন্ধক, সমালোচনার আগে একটু জেনে, খোঁজ-খবর নিয়ে নিলে ভালো হয়।
দেশ রূপান্তর : একজন প্রতিযোগীকে বিভিন্ন দেশে বারবার পাঠানোকে আপনি কীভাবে দেখেন?
হাফেজ নেছার আহমাদ আন-নাছিরী : একজন প্রতিযোগী আলাদা আলাদা দেশের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে পারে। ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ এটাই চায়। কিন্তু আমার দৃষ্টিভঙ্গি হলো, একজন সর্বোচ্চ বিদেশে দুইবার যেতে পারে। এর বেশি না যাওয়া। নতুনদের জন্য পথ তৈরি করে আরও প্রতিভা বের করে আনা। আমার শিক্ষকদের বলে দিয়েছি, একবার যে ছাত্র আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছে তাকে যেন কিতাব বিভাগে ভর্তি করে দেয়।
দেশ রূপান্তর : বাংলাদেশি হাফেজরা আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্তির সিরিয়ালে কততম?
হাফেজ নেছার আহমাদ আন-নাছিরী : আরব দেশগুলোর চেয়ে বাংলাদেশি হাফেজদের পুরস্কারের হার বেশি। সবচেয়ে বেশি লিবিয়ার। গত বছর দুবাই আন্তর্জাতিক হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতায় হাফেজদের পুরস্কার জেতার জরিপ দেখানো হয়েছে। সেখানে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল দ্বিতীয়। আসলে সব দেশেই হাফেজদের সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া হয়। আমাদের দেশের হাফেজরা সেটা পায় না। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে বাংলাদেশ হতো বিশ্বের এক নম্বর পুরস্কারজয়ী দেশ। বাংলাদেশের হাফেজদের আল্লাহ সেই মেধা দিয়েছেন এবং তারাও বিভিন্ন দেশে তা প্রমাণ করে দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছে। বিশ্বে লাল সবুজের পতাকাকে সমুন্নত করেছে।
দেশ রূপান্তর : বাংলাদেশে কেন আন্তর্জাতিক কোরআন প্রতিযোগিতার আয়োজন হচ্ছে না?
হাফেজ নেছার আহমাদ আন-নাছিরী : আসলে এ প্রশ্নের মুখোমুখি আমি নিজেও বহুবার হয়েছি। বিশেষ করে বিভিন্ন দেশের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় যাওয়ার পর অনেকেই জানতে চান, বাংলাদেশে প্রতিযোগিতার তারিখ কবে? বছরের কোন সময় প্রতিযোগিতা হয় ইত্যাদি ইত্যাদি! কিছু বলতে পারি না, লজ্জা হয়। যদি বলি বাংলাদেশে তো আন্তর্জাতিকভাবে কোনো কোরআন প্রতিযোগিতার আয়োজন হয় না, তাহলে দেশের বদনাম হবে।
সাবেক ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ মুহাম্মদ আবদুল্লাহ এবং তৎকালীন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ডিজি সামিম মুহাম্মদ আফজালকে বহুবার এ বিষয়ে বলেছি। কিন্তু অজানা কারণে সেটি আর হয়ে ওঠেনি।
অবশেষে গত বছর থেকে আমার প্রতিষ্ঠান মারকাযুত তাহফিজ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে মক্কার পবিত্র হারামের আঙিনায় বাংলাদেশের বিশিষ্ট হাফেজ-আলেমদের উপস্থিতিতে ‘মারকাযুত তাহফিজ আন্তর্জাতিক হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতা বাংলাদেশ-২০২২’-এর শুভ সূচনা করি। পরবর্তী সময়ে মিসরের প্রখ্যাত কারি আবদুল বাসিত (রহ.)-এর ছেলে শায়েখ ইয়াসির আবদুল বাসেত ও শায়েখ মাহমুদ সিদ্দিক আল মিনশাওয়ী বিচারক হিসেবে বাংলাদেশ এসে প্রতিযোগিতার কার্যক্রম দেখে মুগ্ধতা প্রকাশ করেন। পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে অতিথি হয়ে এসেছিলেন ধর্ম প্রতিমন্ত্রী ফরিদুল হক খান দুলাল এমপি।
দেশ রূপান্তর : এবারও কি আন্তর্জাতিক হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতার আয়োজন করবেন?
হাফেজ নেছার আহমাদ আন-নাছিরী : ইনশাআল্লাহ, আল্লাহতায়ালা যাদের হাতে ক্ষমতা এবং সামর্থ্য দিয়েছেন তারা যদি এগিয়ে আসেন, তাহলে সহজেই এটি করা সম্ভব হবে। দেশের মুখও উজ্জ্বল হবে- ইনশাআল্লাহ। আশা করি দেশের কোরআন প্রেমিক সামর্থ্যবান কেউ না কেউ বাংলাদেশে আন্তর্জাতিকভাবে কোরআন প্রতিযোগিতার আয়োজনে এগিয়ে আসবেন।
