রাজধানীর হাটে হাটে বসেছে জাল টাকা শনাক্তকরণের ব্যাংকিং বুথ। এছাড়া ঢাকা ও চট্টগ্রামে মোট ১০টি হাটে চলছে স্মার্ট পেমেন্ট কর্মসূচি, যার মাধ্যমে নগদ টাকা ছাড়াই কোরবানির পশু কেনাবেচা করছেন ক্রেতা ও বিক্রেতারা। এতে কমে এসেছে নগদ টাকা বহন ও ছিনতাইয়ের ঝুঁকি।
প্রতি বছর কুরবানির ঈদকেন্দ্রিক পশু কেনাবেচায় বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয়। এর বেশিরভাগই সম্পন্ন হয় নগদ টাকায়। কিন্তু স্মার্ট বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্যে ঢাকা ও চট্টগ্রামের পশুরহাটগুলোতে ক্যাশলেস লেনদেন চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে পশু কেনাবেচায় মোবাইল অথবা অনলাইন ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা পরিশোধ করতে পারবেন যে কেউ। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য ইতিমধ্যেই ঢাকা উত্তর এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন কাজ শুরু করেছে।
ব্র্যাক ব্যাংকের প্রতিনিধিরা জানান, এ বছর ঢাকা ও চট্টগ্রাম মিলে মোট দশটি হাটে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ স্মার্ট হাট’ কর্মসূচি চলছে। উত্তরা দিয়াবাড়ি স্মার্ট হাট কার্যক্রম প্রতিনিধিত্ব করছে ব্র্যাক ব্যাংক। গতকাল বিকেল পর্যন্ত ব্র্যাক ব্যাংকের মাধ্যমে ৫৬টি লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে, যেখানে টাকার লেনদেন হয়েছে ৯৩ লাখ। এটিএম বুথ এবং পস সিস্টেমের মাধ্যমে টাকা উত্তোলন করছেন পশুর ক্রেতারা। অন্যদিকে পশু বিক্রির টাকা এজেন্ট ব্যাংকের মাধ্যমে জমা দিতে পারছেন বেপারীরা। এতে করে দুই পক্ষই উপকৃত হচ্ছে বলে দাবি ব্যাংকারদের। কারণ কোনো পক্ষকেই মোটা অঙ্কের এই টাকা বহন করতে হচ্ছে না। নগদ টাকা ছাড়াই কেনাবেচা সম্পন্ন হচ্ছে কোরবানির পশু।
দেশের লেনদেন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ঘটলেও স্বল্পমেয়াদি পশুর হাটের বিপুল পরিমাণ লেনদেনের অধিকাংশই নগদ অর্থে সংঘটিত হয়। ফলে একদিকে নগদ অর্থের ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয় এবং ব্যাংক, এটিএমসমূহে অর্থ জোগান দেওয়ার জন্য অতিরিক্ত নোট ছাপানো ও সরবরাহের প্রয়োজন হয়। অন্যদিকে, নগদ অর্থের এই ব্যাপক লেনদেনের ফলে বিভিন্ন ধরনের অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা যেমনÑ জাল টাকার বিস্তার, চুরি-ছিনতাই ইত্যাদি নানা ধরনের অপরাধ বৃদ্ধি পায়। ফলে এই সময়ে পশু ক্রেতা-বিক্রেতার অর্থের নিরাপত্তা বিধান, অপরাধী শনাক্তকরণ এবং জাল টাকা শনাক্তকরণে সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়।
এসব সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে ২০২২ সালে কোরবানির ঈদকেন্দ্রিক ঢাকায় অবস্থিত ৬টি পশুর হাটে লেনদেন ডিজিটাল মাধ্যমে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে পাইলট কার্যক্রম পরিচালনার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। সেই পাইলট কার্যক্রমে প্রায় ৩৩ কোটি টাকার লেনদেন ডিজিটাল পদ্ধতিতে সম্পাদিত হয়। সফলভাবে এই পাইলট কার্যক্রম পরিচালনার পরিপ্রেক্ষিতে ‘ক্যাশলেস বাংলাদেশ’ প্রকল্পের আওতায় ২০২৩ সালের কোরবানির পশুর হাটেও একই কার্যক্রম চলমান রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
কোরবানির হাটে লেনদেনের বিষয়ে জানতে চাইলে ব্র্যাকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম আর এফ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, বেশ কয়েকটি হাটে ব্র্যাক ব্যাংকের বুথ রয়েছে। কোরবানির পশু ক্রয়ের ক্ষেত্রে ব্র্যাকের বুথে টাকা লেনদেন হচ্ছে। গতকাল পর্যন্ত পঞ্চাশের অধিক লেনদেন হয়েছে। এটা আরও বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
আর বিকাশের কমিউনিকেশন ডিপার্টমেন্টের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করা শর্তে বলেন, বিকাশে লেনদেনের ক্ষেত্রে ৩০ হাজার টাকা লিমিট রয়েছে। কিন্তু কোনো মার্চেন্ট অ্যাকাউন্টে সর্বোচ্চ ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত পেমেন্ট করা যায়। যে কারণে কোরবানির হাটে বিকাশের মাধ্যমে লেনদেন হচ্ছে।
২০২২ সালের মতো চলতি বছরও কোরবানির ঈদকেন্দ্রিক কার্যক্রমে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সার্বিক সহায়তায় তৃণমূল পর্যায়ে পশু বিক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয় এবং আলোচ্য কার্যক্রমের বিষয়ে ডিজিটাল মাধ্যমে আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে প্রান্তিক পর্যায়ের পশু খামারিদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা হয়। এ লক্ষ্যে ঢাকার বাইরে ২৬টি জেলায় (রাজবাড়ী, শেরপুর, বগুড়া, জয়পুরহাট, নওগাঁ, নাটোর, পাবনা, রাজশাহী, সিরাজগঞ্জ, দিনাজপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, পঞ্চগড়, রংপুর, ঠাকুরগাঁও, বাগেরহাট, চুয়াডাঙ্গা, যশোর, ঝিনাইদহ, খুলনা, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, নড়াইল এবং সাতক্ষীরা) ১০টি ব্যাংক (এবি, ব্যাংক এশিয়া, ব্র্যাক, ইস্টার্ন, আইএফআইসি, ইসলামী, মিউচুয়াল ট্রাস্ট, পূবালী, দি সিটি, ও ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক) এবং ৩টি এমএফএস প্রোভাইডার (বিকাশ, নগদ এবং ইউপে) কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
স্মার্ট কোরবানির হাট কার্যক্রমের পরিকল্পনায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৮টি হাট এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ২টি হাটে বিভিন্ন পেমেন্ট স্কিম প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান (ভিসা, মাস্টারকার্ড এবং এমেক্স) এর সার্বিক তত্ত্বাবধানে একটি করে ডিজিটাল পেমেন্ট বুথ স্থাপিত হবে যেখানে ব্যাংক এবং এমএফএসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ক্রেতা ও বিক্রেতাদের ডিজিটাল লেনদেনের সব ধরনের সহায়তা প্রদান করবেন। উক্ত হাটগুলোতে পশু ক্রেতা ও বিক্রেতারা আর্থিক লেনদেন ডিজিটাল মাধ্যমে (ডেবিট/ক্রেডিট কার্ড, এমএফএস, মোবাইল ফোনে ব্যবহার্য অ্যাপ্লিকেশন, বিশেষভাবে বাংলা কিউআর) পরিচালনার সুযোগ পাবেন যা নগদ অর্থ বহনের ঝুঁকি, নকল ছেঁড়া/ফাটা নোট সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
