কৃষক খুঁজে না পাওয়ায় ব্যয় কমল পাটবীজ প্রকল্পের

আপডেট : ০২ জুলাই ২০২৩, ০২:১২ এএম

সোনালি আঁশের সুদিন ফিরিয়ে আনতে উন্নত জাতের পাট উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার। কৃষকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উৎপাদনেও ভিন্নতা আর উন্নত প্রযুক্তির কথা বলা হয়েছে। কিন্তু প্রকল্পের জন্য যেসব এলাকা নির্বাচন করা হয়েছিল সেসব এলাকায় পাট উৎপাদনে আগ্রহী কোনো কৃষক পাওয়া যায়নি। তাই কিছু খাত বাদ দিয়ে আরও কিছু খাত সংযোজন করা হয়েছে। মূল প্রকল্পে ৩ কোটি ২৬ লাখ টাকা ব্যয় কমেছে।

পাট অধিদপ্তরের বাস্তবায়নাধীন ‘উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর পাট ও পাটবীজ উৎপাদন এবং সম্প্রসারণ’ শীর্ষক প্রকল্পটির প্রথম সংশোধনী প্রস্তাব গত ২২ মে অনুমোদন দিয়েছেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। এটি গত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় (একনেক) অবগত করা হয়েছে।

অনুমোদনের পর প্রকল্পটির ব্যয় কমে দাঁড়িয়েছে ৩৭৩ কোটি ২০ লাখ টাকায়। মূল অনুমোদিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩৭৬ কোটি ৬৬ লাখ। ব্যয় কমেছে ৩ কোটি ২৬ লাখের কিছু বেশি। নতুন মেয়াদ ২ বছর ৩ মাস বেড়ে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে।

প্রকল্পটি সংশোধনের কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, প্রয়োজনীয় সংখ্যক আগ্রহী পাটচাষি না থাকায় নেত্রকোনা জেলার দুর্গাপুর ও মুন্সীগঞ্জ জেলার সদর ও টঙ্গীবাড়ী উপজেলাকে প্রকল্প থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে কৃষকদের আগ্রহের কারণে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলাকে নতুন করে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

প্রকল্পের ব্যয় কমার আরেকটি উল্লেখযোগ্য কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, প্রকল্পের আওতায় ২৯২টি মোটরসাইকেল কেনার প্রস্তাব ছিল। পরিকল্পনা কমিশনের আপত্তির কারণে এ খাতটি পুরোপুরি বাদ দেওয়া হয়েছে। এতে ব্যয় কমেছে ১২ কোটি ৫৯ লাখ টাকা।

প্রকল্পটি অনুমোদনের আগে চলতি বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি প্রকল্প মূল্যায়ণ কমিটির সভা (পিইসি) অনুষ্ঠিত হয়েছিল। পিইসি সভায় পরিকল্পনা কমিশনের আপত্তি ছিল মূল প্রকল্প প্রস্তাবে উল্লেখিত ৯ কোটি ৭২ লাখ টাকার বিদেশ ভ্রমণের বিষয়টি নিয়ে। কমিশন এ পরিস্থিতিতে এ ব্যয়ের খাত বাদ দিতে বলেছিল। পরে এ খাতটি বাদ দিতে বাধ্য হয় পাট অধিদপ্তর।

এ প্রকল্পটিতে উন্নত জাতের পাটের বীজ উৎপাদন ও স্বল্প পানিতে পাট জাগ দেওয়ার বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে ৫ লাখ ৫০ হাজার কৃষককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এর মধ্যে উচ্চফলনশীল পাটবীজ উৎপাদনের জন্য ১ লাখ ৫০০ জন এবং গুণগত মানসম্পন্ন পাটের আঁশ উৎপাদন ও পচনের জন্য ২ লাখ ৬১ হাজার ৩৫০ জন কৃষককে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এতে ব্যয় হবে ৫৭ কোটি ৪৩ লাখ টাকা।

প্রকল্প সংশোধনের কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, কভিড-১৯ পরিস্থিতির কারণে পাটচাষিদের তালিকা, প্রশিক্ষণ, কৃষক সমাবেশ, সেমিনার-কর্মশালা এবং পাটবীজ ও সার লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী বিতরণ করা সম্ভব হয়নি। তাই ২ বছর ৩ মাস মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। এ ছাড়া রিবনের ক্রয় ও বিতরণ বাদ দিয়ে উন্নত পাট পচনের বিষয়ে চাষিদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

কৃষি ভর্তুকির মাধ্যমে পাটের জমিতে অগভীর গর্ত খনন ও পাওয়ার রিবন চাষিদের মধ্যে বিতরণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। মোট ১ হাজার ৬০৮টি কৃষি প্রদর্শনী মাঠ দিবস অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ রকম বিভিন্ন কারণে প্রকল্প সংশোধন প্রস্তাব করা হয়েছে।

উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর পাট ও পাটবীজ উৎপাদন ও সম্প্রসারণ প্রকল্পটি জুলাই ২০১৮ থেকে মার্চ ২০২৩ মেয়াদে বাস্তবায়নের জন্য অনুমোদিত হয়। এ প্রকল্পের আওতায় উন্নত জাতের পাটের বীজ উৎপাদনে প্রশিক্ষণ নিতে ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারতে যেতে চেয়েছিলেন পাট অধিদপ্তর ও বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। যদিও পরিকল্পনা কমিশন প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভার কার্যপত্রে বিদেশ প্রশিক্ষণ না দেওয়ার পক্ষে থাকায় তা বাদ পড়েছে।

প্রকল্পের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের মধ্যে রয়েছে ৩১৯০ দশমিক ৭০ টন উচ্চফলনশীল পাটবীজ উৎপাদন এবং নিম্নমানের পাটবীজের জায়গায় উচ্চফলনশীল পাটবীজের ব্যবহার ও ১১০-১১৫ লাখ বেল উচ্চফলনশীল তোষা পাট উৎপাদন; পাট পচনের ক্ষেত্রে কচুরিপানা, খড়, কংক্রিট সø্যাব, বাঁশের খুঁটি ইত্যাদি ব্যবহারে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা এবং কলাগাছ ও মাটি ইত্যাদি ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করা; কম পানির কারণে পাট পচনের সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে পাটের জামিতে অগভীর গর্ত খনন এবং পাওয়ার রিবনার চাষিদের মধ্যে বিতরণ করা; মানসম্মত বীজ ও পাটের আঁশ উৎপাদন এবং পচনের জন্য ৩ লাখ ৬১ হাজার ৮৫০ জন কৃষককে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং কৃষকদের কাছ থেকে পর্যায়ক্রমে ৫৫০ টন প্রত্যয়িত বীজ অথবা টিএলএস বীজ কেনা ও বিতরণ করা।

প্রকল্পটি নেওয়ার গুরুত্ব সম্পর্কে বলা হয়েছে, গুণগত মানসম্পন্ন পাটের উৎপাদন এলাকা ধীরে ধীরে কমে ১০-১২ লাখ একরে দাঁড়িয়েছে। ফলে উৎপাদন ৬৮ লাখ বেল থেকে কমে ০-৫০ লাখ বেল হয়েছে। পাট খাত দেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ১০ শতাংশ। দেশের জিডিপিতে প্রায় ৪ শতাংশ এবং রপ্তানি আয়ের ৫ শতাংশ অর্জনে অবদান রাখছে। দেশে পাটবীজের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৫ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার টন। এর মধ্যে প্রায় ৩ হাজার ৮০০ টনই বেসরকারিভাবে আমদানি করা। তাই দেশে মানসম্মত পাটবীজের ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে।

উচ্চ-৬ ফলনশীল পাটবীজের অধিক উৎপাদনের সুফল সারা দেশে সম্প্রসারণের লক্ষ্যে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় পাট অধিদপ্তরের মাধ্যমে ‘উচ্চফলনশীল (উফশী) পাট ও পাটবীজ উৎপাদন এবং উন্নত পাট পচন’ প্রকল্পটি ২০১১ সালের জুলাই থেকে ২০১৭ মেয়াদের জুনে বাস্তবায়িত হয়। এ প্রকল্পের আওতায় দেশের পাট উৎপাদনকারী ৪৪টি জেলার ২০০টি উপজেলায় বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিজেআরআই) উদ্ভাবিত উন্নত তোষা জাতের পাটবীজ বাংলাদেশে কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) থেকে কিনে নির্বাচিত পাটচাষিদের বিতরণ করা হয়। আগের প্রকল্পের ধারাবাহিকতায় পাট অধিদপ্তর এই ‘উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর পাট ও পাটবীজ উৎপাদন এবং সম্প্রসারণ’ প্রকল্প হাতে নেয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত