মেয়ের কান্না আছড়ে পড়বে টিভি স্ক্রিনে

আপডেট : ০২ জুলাই ২০২৩, ১১:৩৭ পিএম

গ্রাম নিয়ে কিছু লিখতে গেলেই, কেন জানি না দু-চার লাইন কবিতা মনে পড়ে যায়। বন্দে আলী মিঞার লেখা- ‘আমাদের ছোট গাঁয়ে ছোট ছোট ঘর,/ থাকি সেথা সবে মিলে- নাহি কেহ পর।/ পাড়ার সকল ছেলে মোরা ভাই ভাই/ একসাথে খেলি আর পাঠশালে যাই।’ বন্দে আলী মিঞার যুগ কবেই চলে গেছে। আমাদের দেখা তিরিশ চল্লিশ বছরের গ্রামজীবনও আর নেই। সামনে, পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েত নির্বাচন। ফলে নতুনভাবে গ্রামজীবনের বারমাস্য রোজ উঠে আসছে সংবাদ মাধ্যমে। পুরনো দিনের সেই ছোট ঘর কিংবা সবাই মিলেমিশে ভাই ভাই হয়ে থাকা, পাঠশালায় যাওয়া এসব বৃত্তান্ত নিতান্তই অতীত। এখন চারপাশের গ্রাম এলাকায় বিপুল রাজনীতিকরণের ধাক্কায় যাবতীয় মূল্যবোধ, গ্রামীণ সংস্কৃতি, সামাজিক চেতনা সব দ্রুত বদলে যাচ্ছে। যাচ্ছে বলব না। ইতিমধ্যেই বদলে গেছে বলা ভালো।

এই বদলে যাওয়ার শুরু বোধহয় ১৯৭০-৭১ বা তারও আগে থেকেই। তখনো পশ্চিমবঙ্গের গ্রামে গ্রামে বড় ভূস্বামী, আড়তদার, মহাজন, সুদখোরদের প্রবল দাপট। এই গ্রামীণ মাতব্বরদের প্রায় একশো শতাংশই কংগ্রেস। আর গ্রাম সর্বহারার বেশিরভাগ কমিউনিস্ট পার্টির কর্মী-সমর্থক। সত্তর দশকের সময় নকশালপন্থি রাজনীতি নিস্তরঙ্গ গ্রামজীবনে মৃদু ধাক্কা মারল। দু-চারজন সম্পন্ন কৃষক বা মহাজনের গলা কেটে শোষণহীন সমাজের আওয়াজ দিয়ে বলা হলো লাল রাজ গড়ে উঠেছে। রাষ্ট্রের প্রবল আক্রমণে অল্প সময়েই নকশাল আন্দোলন স্তিমিত হলো। হিসেব-নিকেশ করলে দেখা যাবে যে গ্রামের কাঠামো, দৈনন্দিন জীবন বা শ্রেণি সম্পর্কে কোথাও কোনো বদল ঘটল না। সত্তরের দশকে কংগ্রেসের আমলে কৃষি সম্পর্কে বদল না ঘটলেও প্রযুক্তি ব্যবহার করে চাষের উৎপাদন বাড়ল। বৃষ্টিনির্ভর কৃষিব্যবস্থার জায়গায় সেচ ও শ্যালো। নলকূপের আমদানি গ্রামবাংলার চেহারায় আপাত বদল এলো। তবে পশ্চিমবঙ্গের গ্রামজীবন ও শ্রেণি সম্পর্কে বদল এলো, স্বীকার করতেই হবে বামপন্থি রাজনীতির হাত ধরে। ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট রাজ্যের মসনদে বসেই দুটো, তিনটি বিষয়ে অগ্রাধিকার দিল। বর্গা রেকর্ড, ভূমিহীনদের  জমিদান। এবং পঞ্চায়েতের মধ্য দিয়ে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ।

ফলে গ্রামে গ্রামে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বাড়ল। আপাত শান্ত গ্রামজীবনেও পরিবর্তন আসতে লাগল। শ্রেণি সম্পর্কেও বদল ঘটল। ভূমি সংস্কারের দৌলতে, ল্যান্ড সিলিং কুড়ি একর করার কারণে সচ্ছল ভূস্বামী বা ধনী কৃষকদের দাপট রাতারাতি কমল। অর্থনৈতিক পরিবর্তন সামাজিক সম্পর্ক বদলে দিল। আগে যে মোড়ল মাতব্বররা গ্রাম্য সমস্যা সমাধানের নেতা ছিলেন, তাদের জায়গা নিল পঞ্চায়েত ও পার্টি। গ্রামীণ সর্বহারা, হাড়ি, কামার, কুমোর, দুলে, বাগদী, রাজবংশী, মাহাত, ওঁরাও, সাঁওতাল ইত্যাদি সিডিউল কাস্ট ও ট্রাইবদের সামাজিক ক্ষমতায়ন, নতুন এক শ্রেণি-দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করল এটাও অস্বীকার করা যাবে না।

প্রত্যেকটি বিষয়ের কিছু ইতি ও নেতি থাকে। অন্তত দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ তাই-ই বলে। আপাতভাবে প্রথম বামফ্রন্টের সময়ে সর্বস্তরের যে কর্মচঞ্চলতা তা ধীরে ধীরে কমতে লাগল। পার্টির মধ্যে দানা বাঁধতে লাগল আমলাতন্ত্র। কৃষি মজুরের মজুরি বাড়ল। তবে তাদের জমির মালিকের সঙ্গে সম্পর্ক আলগা হলো। তাদের আট ঘণ্টা কাজ করার অধিকার শেখানো হলেও উৎপাদন দায়বদ্ধতা বলা হলো না। বড় পুঁজির মালিকদের পরিবর্তে শ্রেণিশত্রু চিহ্নিত হতে লাগল ক্ষুদ্র জোতের মালিক। পার্টির নেতৃত্বে উঠে আসতে লাগল গ্রামীণ মধ্যবিত্ত পরিবারের লোকজন। শিক্ষক, অধ্যাপক, সরকারি চাকুরেরা। ততদিনে কৃষিতে লগ্নি কঠিন হয়ে পড়েছে। সারের দাম বাড়ছে। এই অবস্থা ভয়ংকর চেহারায় দেখা দিল ১৯৯০-এর পরে, নতুন অর্থনীতি বা ভুবনায়নের দৌলতে। যা কিছু সাবেক তা রাতারাতি বদলে গিয়ে গ্রাম সমাজ বাজারমুখী হতে বাধ্য হলো।

বামফ্রন্ট নতুন এই চ্যালেঞ্জের কাছে দিশেহারা হয়ে তাদের আদি শ্রেণি মিত্র ভুলে গ্রামের দ্রুত উঠে আসা নতুন কায়েমি স্বার্থের কাছে সমর্পণ করল। সিপিআইএম দাবি করত, তাদের কর্মসূচিতে লেখাও আছে স্পষ্ট করে যে গণআন্দোলন বিকশিত করতেই সরকারে যাওয়া। শ্রমিক কৃষক মৈত্রীর ভিত্তিতে জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব সফল করুন। নব্বইয়ের পর থেকে বিপ্লব-টিপ্লব মাথা থেকে নামিয়ে বামফ্রন্ট যেনতেন প্রকারে চোখের মণির মতো সরকারকে রক্ষা করতে যত ব্যস্ত হলো তত দ্রুত তাদের গ্রামীণ ভিত্তিতে ধস নেমে গেল।

বাম আমলের বেনোজল আজ প্লাবনের সৃষ্টি করেছে। পঞ্চায়েত দুর্নীতি বাম আমলে শুরু। তখন যা ছিল সরু নদী এখন তা মোটামুটি বন্যা হয়ে গ্রামবাংলা ভাসিয়ে দিচ্ছে। পঞ্চায়েতে উন্নয়ন করার তাগিদে যখন থেকে বিপুল অর্থ পৌঁছতে লাগল, তখন থেকেই এই গ্রামজীবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঘুণ ধরতে শুরু করল। পাশাপাশি ভোগবাদ আছড়ে পড়ে যাবতীয় মূল্যবোধ পাল্টে দিতে লাগল। এখন পশ্চিমবঙ্গের এমন কোনো গ্রাম পাবেন না, যেখানে লোকের হাতে মোবাইল নেই। অনেক গ্রামে জিজ্ঞেস করেছি ছোট দোকানদারকে শ্যাম্পু, ক্রিম কেমন বিক্রি হয়? সবাই বলেছে প্রচুর। গ্রামে গ্রামে ডাব খাওয়া এখন উঠে গেছে। তার জায়গা নিয়েছে কোল্ড ড্রিংকস। ঠা-া মতলব কোকা-কোলা এই টিউন মাত করে দিয়েছে গ্রামজীবনকে। যেমন করেছে ফর্সা হওয়ার ক্রিম। ঘরে ঘরে সিরিয়াল বুঁদ করে রেখেছে গ্রামজীবন। টিভির প্রেম, নরনারীর যৌন আবেদন গ্রামের জনজীবনেও নতুন এক ফ্যান্টাসির জন্ম দিচ্ছে। অবচেতনে অনেক নারী-পুরুষ এখন বলিউডের নক্ষত্র। ফলে কে জিতবে না জিতবে পরের কথা। যেই জিতুক পুরনো গ্রামসমাজ কখনো ফিরবে না। আহা, কী সুন্দর দিন কাটাইতাম ভেবে লাভ নেই। বাস্তব এটাই, যত দিন যাবে তত গ্রাম-শহরের ফারাক কমবে।

এটাই স্বাভাবিক। সিস্টেম পাল্টালে কী হবে বলতে পারব না। তবে এখন অমুকের জায়গায় তমুক, কিংবা তমুকের পরিবর্তে অমুক এলেও ছবি খুব পাল্টাবে বলে মনে হয় না। ভোগবাদ এমন জায়গায় আমাদের নিয়ে গেছে, যেখানে দুর্নীতি আজ কোনো ইস্যু নয়। ফলে শহরের মিডিয়া দেখে যারা ভাবছেন যে তৃণমূল হারবে, রাগ করলেও আমি তাদের সঙ্গে একমত হতে পারছি না। নিশ্চিত পুলিশ, প্রশাসনিক ক্ষমতা তারা অনেক ক্ষেত্রেই অন্যায়ভাবে কাজে লাগাচ্ছেন। না লাগালেও তাদের হারানো অন্তত এই মুহূর্তে সম্ভব বলে মনে হয় না। আমি যে বদলে যাওয়া গ্রামের কথা বলছি, তা সামগ্রিক ছবি। দক্ষিণ, উত্তর বাংলার ছবি আলাদা আলাদা করে আলোচনা করলেও আমার ধারণা একই থাকবে। তবে আমার মনে হয় বামপন্থি রাজনীতি নতুন করে প্রাসঙ্গিক হচ্ছে, তা তাদের মিটিং-মিছিলে গণউন্মাদনা দেখলেই বোঝা যায়। তবে বিপুল ভিড় ভোটের বাক্সে খুব একটা প্রতিফলন ঘটবে বলে মনে হচ্ছে না। কংগ্রেসের এ রাজ্যে নেতৃত্ব বদল না হলে তাদের খুব কিছু সিট জিতবে বলে মনে হচ্ছে না। সিপিআইএম তৃণমূল নিয়ে কথা না বলে নিজেদের গ্রাম উন্নয়ন নিয়ে ভাবনা স্পষ্ট করে তুলে ধরলে অনেক ইতিবাচক প্রভাব ফেলত। সিপিআইএম বড় বেশি ইডি, সিবিআই-নির্ভর হয়ে গেছে। তারা শ্রেণিসংগ্রামের পথ থেকে এতটাই দূরে চলে গেছে যে, শ্রেণিবিভক্ত সমাজে কেন্দ্রীয় এজেন্সির যে শ্রেণিচরিত্র থাকবে এই সহজ বিষয়টাই মাথা থেকে বের করে দিয়েছে। অন্যদিকে, গ্রামীণ তো বটেই, সামগ্রিকভাবে রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ ও ক্ষমতায়নে বামদের বড় ভূমিকা থাকলেও আজ মমতার বিভিন্ন সামাজিক প্রকল্প ও তার সহজ-আটপৌরে চলন-বলন গ্রামের নারীদের কাছে তার আলাদা গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করেছে।

এবারের ভোটে নিঃসন্দেহে মমতা ব্যানার্জির সাধের ‘দুধেলা গাই’ সংখ্যালঘু সম্প্রদায় সামান্য হলেও বিপক্ষে ভোট দেবে। ভয়টা সেখানেই। সংখ্যালঘু অধ্যুষিত মালদা, মুর্শিদাবাদ, দিনাজপুরের বিভিন্ন জায়গায় তৃণমূল এবার নিশ্চিত প্রতিরোধের মুখে পড়বে। সেক্ষেত্রে ভোটের দিন সংঘর্ষ হওয়ার কথা ভেবে আতঙ্কিত হচ্ছি। প্রাণহানি এখন পশ্চিমবঙ্গের গ্রামে নিত্যদিনের বিষয়। শহরের বাবুদের ক্ষমতার কেন্দ্রে বসাতে গ্রামে খুন জখম না হলে হবে না। মরবে গরিব। মারবে গরিব। আমরা বাবু ভদ্রলোকেরা নিশ্চিন্তে ঠা-া ড্রইংরুমে বসে টিভি দেখতে দেখতে যুদ্ধক্ষেত্রের উত্তেজনায় বুঁদ হব। মায়ের, স্ত্রীর, বাবার, মেয়ের কান্না আছড়ে পড়বে টিভি স্ক্রিনে।

লেখক: প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত