একসময় শক্তিশালী শ্রমিক আন্দোলনই ছিল জাতীয় রাজনীতির অন্যতম শক্তি। সেখানে মুখ্য ভূমিকা পালন করত আদমজী পাটকলের হাজার হাজার শ্রমিক। একাত্তরের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ কিংবা নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে, তাদের সর্বাত্মক অংশগ্রহণ আন্দোলনের গতি বাড়িয়েছিল কয়েকগুণ। সেই শ্রমিক আন্দোলনের ধরনটাই যেন পাল্টে যায়, নব্বইয়ের গণআন্দোলনের পর। ব্যাপক অর্থনৈতিক সংস্কারের পথ ধরে রাষ্ট্রায়ত্ত খাত সংকুচিত হয়ে বেসরকারি খাত যত বিস্তৃত হতে থাকে, শ্রমিক আন্দোলনেও আসতে থাকে পরিবর্তন। বর্তমানে আন্দোলনের জায়গা দখল করেছে মালিক পক্ষের নির্যাতন। পক্ষান্তরে শ্রমিকের শক্তিকে সুপরিকল্পিতভাবে, দুর্বল থেকে দুর্বলতর করা হয়েছে। এখন তারা ছড়িয়ে পড়েছে মূলত তিন ভাগে গার্মেন্টস, পরিবহন এবং পাটকল।
নব্বইয়ের পর থেকে এ পর্যন্ত হাজার হাজার শ্রমিক হত্যা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে। কিন্তু কয়টি ঘটনার সুষ্ঠু বিচার হয়েছে, তা আমাদের জানা নেই। সাভার, টঙ্গী এবং গাজীপুরে বছরের প্রায় সময়ই, বিভিন্ন দাবিতে গার্মেন্টস শ্রমিকদের রাস্তায় নামতে হয়। কয়েকদিন আগে, ঈদের বেতন-বোনাস দাবির পরিপ্রেক্ষিতে গাজীপুরে গড়ে ওঠে শ্রমিক আন্দোলন। সেই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের গাজীপুর শাখার সভাপতি শহীদুল ইসলাম। কিন্তু তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এ রকম অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। যে কারণে ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড ইউনিয়ন কনফেডারেশন (আইটিইউসি) প্রকাশিত বৈশ্বিক অধিকার সূচক-২০২৩-এ কর্মজীবীদের জন্য বাজে ১০ দেশের একটি হিসেবে বাংলাদেশকে চিহ্নিত করেছে। করারই কথা। কিন্তু এই লজ্জা তো কোনো মালিক পক্ষের নয়। যে কারণে বিশ্ববাসী জানছে, অধিকারহীন শ্রমিকের দেশ বাংলাদেশ।
ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড ইউনিয়ন কনফেডারেশন (আইটিইউসি) প্রকাশিত বৈশ্বিক অধিকার সূচক-২০২৩-এ বাংলাদেশ সম্পর্কে বলা হয়েছে, এখানে শ্রমিকের অধিকার ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। বৈদেশিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার নামে রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলগুলোয় ট্রেড ইউনিয়ন গঠনে বাধা দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া শ্রমিকদের নিজেদের অধিকার সম্পর্কে মতপ্রকাশে বাধা দেওয়া অব্যাহত রয়েছে দেশ রূপান্তরে রবিবার প্রকাশিত প্রতিবেদন এমনটিই জানাচ্ছে।
বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় শিল্প খাত পোশাক শিল্পে প্রায় ৪৫ লাখ শ্রমিক কর্মরত। সেখানেও ট্রেড ইউনিয়ন গঠনে বাধা দেওয়া হয়। শিল্প-পুলিশ পোশাক শিল্পের ধর্মঘট দমন করে থাকে। প্রতিবেদনে আরও বলা হচ্ছে কর্মপরিবেশের বাজে ১০টি দেশের ৯টিতেই আইনসংগত ধর্মঘটে যাওয়ায় শ্রমিকদের বিরুদ্ধে মামলা হয়। এর মধ্যে ৭৭ ভাগ দেশ ট্রেড ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠা ও তাতে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে শ্রমিকদের বঞ্চিত হতে হয়। ৪২ ভাগ দেশে শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়া, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কঠোরভাবে সংকুচিত করে রাখা হয়েছে।
শ্রমিক শ্রেণিকে শোষণ-নির্যাতন করে, কখনই বাংলাদেশ ‘শিল্পসমৃদ্ধ উন্নত দেশ হিসেবে’ পরিচিতি পাবে না। উন্নয়নশীলে আটকে থাকতে না চাইলে, শ্রমিকের অধিকার সম্পর্কে মুক্ত অবস্থান নিতে হবে। গার্মেন্টসে মাত্র তিন থেকে চার শতাংশ শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়নের সঙ্গে জড়িত। সেই হিসাবে সিংহভাগ শ্রমিক থাকে আন্দোলনের বাইরে। ট্রেড ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্কিত শ্রমিকের সংখ্যা শতকরা হারে বিবেচনা করলে, পরিবহন শ্রমিকদের ক্ষেত্রে শ্রম সংগঠনগুলোর সঙ্গে অংশগ্রহণ সবচেয়ে বেশি।
কেন একজন শ্রমিককে তার অধিকার আদায়ে আন্দোলনে যেতে হয়, এই বিষয়টি সবার আগে ভাবা দরকার। কর্মজীবীদের সামান্য দাবি পূরণে যদি কোনো বেসরকারি কর্তৃপক্ষ অপারগ হয় তাহলে নিজেকে আদালতের মাধ্যমে ‘দেউলিয়া’ ঘোষণার ব্যবস্থা করলেই পারেন। আন্দোলনের কোনো সুযোগ থাকে না। আর যদি শ্রমিকের প্রয়োজন হয়, তাহলে অবশ্যই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অধিকারগুলো দিতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষকে সচেতন থাকা প্রয়োজন। সরকারের দুর্বলতার সুযোগে, বেসরকারি কোন কোন সেক্টরে শ্রমিক অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে সে বিষয়ে স্বচ্ছ গবেষণাধর্মী প্রতিবেদন প্রয়োজন। একইসঙ্গে শ্রম আইনে শ্রমিকের অধিকার সম্পর্কে যা বলা হয়েছে, তা বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান মেনে চলছে কি না তা দেখা সরকারেরই দায়িত্ব।
