বর্ষাকালে নৌযান চলাচলে ঝুঁকিপূর্ণ বঙ্গোপসাগরের ভাসানচর এলাকা। গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ‘পানগাঁও এক্সপ্রেস’ ছাড়াও আরও তিনটি জাহাজ দুর্ঘটনার কবলে পড়েছিল। এ ছাড়া গত পাঁচ বছরে ১৩টি লাইটার জাহাজ (ছোট জাহাজ) দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিল এই এলাকায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতিরিক্ত জোয়ার ও বাতাসে গতি কমে আসায় ভাসানচর এলাকায় দুর্ঘটনার শিকার হয় ছোট জাহাজ।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত বছরের ১৮ মে ১৬০০ টন গম নিয়ে ‘এমভি তামিম’ নামের একটি লাইটার জাহাজ ডুবে যায় এই এলাকায়। এ ছাড়া একই বছরের ১৬ এপ্রিল কয়লাবাহী লাইটার জাহাজ ‘তন্ময়-২’ ডুবে যায়। ডুবে থাকা অন্য জাহাজের সঙ্গে ধাক্কা লেগে ২০২১ সালের ১৩ জুলাই ডুবে যায় ‘এমভি হ্যাং গ্যাং’ নামের একটি লাইটার জাহাজ। একই পয়েন্টে ২০২১ সালের প্রথম সপ্তাহে ডুবে যায় ‘ফুলতলা-১’ নামের আরও একটি জাহাজ। ২০২০ সালের ১৫ আগস্ট সাগরের অতিরিক্ত ঢেউয়ে হ্যাজে পানি প্রবেশ করে সিটি গ্রুপের মালিকানাধীন ‘এমভি সিটি-১৪’ নামের একটি চিনি বোঝাই জাহাজ ডুবে যায়।
এই এলাকার নৌ চলাচল রুটের দায়িত্বে রয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ। দুর্ঘটনার বিষয়ে কথা হয় সংস্থাটির যুগ্ম পরিচালক (নৌ সংরক্ষণ ও পরিচালন) সবুর খানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘শুধু গত সাত মাসে ভাসানচর ও হাতিয়া এলাকায় ছয়টি জাহাজডুবির ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে তিনটি উত্তোলন করা হলেও এখনো বাকিগুলো ডুবন্ত অবস্থায় রয়েছে। আর গতকাল পানগাঁও এক্সপ্রেস ছাড়াও আরও তিনটি জাহাজ জোয়ারের সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে কোনোক্রমে উপকূলে গিয়ে ডুবে যাওয়া থেকে রক্ষা পেয়েছে।’
কেন এত দুর্ঘটনা ঘটে : দুর্ঘটনার কারণ জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (হারবার) কমোডর এম ফজলার রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই পয়েন্টে জোয়ারের সময় ঢেউ ও স্রোত খুব বেশি থাকে। তখন জাহাজের গতিবেগ প্রায় শূন্যে নেমে আসে। আর তখনই দুর্ঘটনার মুখোমুখি হয়। গতকাল পানগাঁও এক্সপ্রেসের ক্ষেত্রেও এমনটি হয়েছে। আরও তিনটি জাহাজও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।’ চট্টগ্রাম থেকে পানগাঁওয়ের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া ‘পানগাঁও এক্সপ্রেস’ জাহাজটিতে ৯৬টি একক কনটেইনার পণ্য ছিল। সব কনটেইনার নিয়ে জাহাজটি সাগরে ডুবে যায়।
এই ঢেউ কোন সময়ে বেশি থাকে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সাধারণত সাগরে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত দেখানো হলেই এই অংশে ঢেউয়ের সঙ্গে বাতাসের গতিবেগ বেশি দেখা যায়। কিন্তু তারপরও যেহেতু পণ্য পরিবহন সচল রাখতে হয় তারা সিগন্যালের সময় জাহাজ চলাচল বন্ধ রাখেন। তবে বৃহস্পতিবার জাহাজটি চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসার সময় সিগন্যাল ছিল না, মাঝপথে এসে সিগন্যাল পায় এবং দুর্ঘটনায় পড়ে।
গত কয়েক বছরের দুর্ঘটনার সময়গুলোর দিকে তাকালে দেখা যাবে বেশির ভাগ দুর্ঘটনা ঘটেছে এপ্রিল থেকে জুলাই মাসের মধ্যে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষের যুগ্ম পরিচালক (নৌ সংরক্ষণ ও পরিচালন) সবুর খান বলেন, ‘এপ্রিল থেকে জুলাই মাসে সাগর উত্তাল থাকে বলে এখানে জোয়ার ও ঢেউ বেশি থাকে। এ ছাড়া শীতকালে এই এলাকায় কুয়াশা বেশি থাকে। তখন এক জাহাজের সঙ্গে আরেক জাহাজের ধাক্কা লেগে দুর্ঘটনা ঘটে থাকে।’
উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম থেকে পানগাঁও এবং খুলনা বা মোংলায় পণ্য স্থানান্তরে জাহাজগুলো ভাসানচরের কাছ দিয়ে অতিক্রম করে থাকে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে ভারতের বিভিন্ন বন্দরের উপকূলীয় বাণিজ্য প্রকল্পের আওতায়ও কিছু জাহাজ উপকূল দিয়ে ভারতে গিয়ে থাকে। তখনো কিছু জাহাজ দুর্ঘটনার মুখোমুখি হয়ে থাকে।
