বাজেট ঘাটতি অর্থায়নে সদ্যবিদায়ী অর্থবছর ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ১১ হাজার ৬০৮ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছিল সরকার। কিন্তু বিদেশি ঋণের প্রবাহ কম থাকা ও রাজস্ব আহরণে ব্যর্থতার কারণে সংশোধিত বাজেটে লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে ১ লাখ ১৫ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা ধরা হয়। তবে সরকারের ব্যাংকঋণের পরিমাণ সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রাকেও ছাড়িয়ে গেছে। বিদায়ী অর্থবছরে সরকার সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৮ হাজার ৭০০ কোটি টাকা বা ৭ দশমিক ৫৩ শতাংশ বেশি ঋণ নিয়েছে। ফলে বিদায়ী অর্থবছর সরকার ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নিয়েছে ১ লাখ ২৪ হাজার ১২২ কোটি টাকা।
আবার ব্যাংকঋণের বেশিরভাগই নেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের বড় অংশই নতুন করে টাকা ছাপিয়ে জোগান দিতে হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে এত বেশি ঋণ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে। এতে দ্রব্যমূল্যের দাম বেড়ে যাওয়াসহ টাকার আরও অবমূল্যায়ন হতে পারে বলেও মত তাদের।
ব্যাংকাররা বলছেন, অর্থনৈতিক সংকট, সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ না পাওয়া ও সঞ্চয়পত্রের আগের ঋণ পরিশোধ করতে হওয়ায় বিদায়ী অর্থবছরের প্রথম দিক থেকেই ব্যাংকের ওপর বেশি নির্ভর করতে হয়েছে সরকারকে। এতে বছরের প্রথম দিক থেকেই ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ না করে নতুন করে ঋণ নিতে হয়েছে। আবার এসব ঋণের বেশিরভাগই জোগান এসেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিভলবমেন্ট (নতুন টাকার জোগান) ফান্ড থেকে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, বিদায়ী অর্থবছর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন টাকার জোগান থেকে সরকার ৭৮ হাজার ১৪০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। অর্থাৎ এসব টাকা ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাজারে নতুন করে জোগান দেওয়া হয়েছে। এতে ডিভলবমেন্ট থেকে সরকারের ঋণের স্থিতি ১ লাখ ৩১ হাজার ৩৩৩ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। আর এই অর্থবছরে সরকার বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে মোট ৯৮ হাজার ৮২৬ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছে। এটি স্বাধীনতার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নেওয়া সর্বোচ্চ ঋণ। এতে সার্বিকভাবে ব্যাংকিংব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ লাখ কোটি টাকা।
প্রতি সপ্তাহের রবিবারে সরকার তার ট্রেজারি বিল ও মঙ্গলবারে বন্ডের বিপরীতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে ঋণের জন্য নিলামের ব্যবস্থা করে। এক্ষেত্রে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো যদি নিলামে বন্ড বা বিল কিনতে ব্যর্থ হয় তাহলে তা ডিভলবমেন্ট করা হয়। এর বিপরীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন টাকার রিজার্ভ থেকে সরকারকে ঋণ দেওয়া হয়। এটিকেই নতুন টাকা ছাপিয়ে ঋণ হিসেবে গণ্য করে অনেকেই।
গেল বছর কয়েকটি ব্যাংকের ঋণ কেলেঙ্কারি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর মানুষের ব্যাংকব্যবস্থায় আস্থা কমে যায়। পাশাপাশি ব্যাংকে টাকা রাখলে ফেরত পাওয়া যাবে না এমন গুজব ও দেশে মূল্যস্ফীতি আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাওয়ায় বেশিরভাগ ব্যাংকই তারল্য সংকটে পড়ে। যে কারণে সরকারের ট্রেজারি বিল ও বন্ড কিনতে ব্যর্থ হচ্ছে ব্যাংকগুলো।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২১-২২ অর্থবছরের শুরুতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিভলবমেন্ট ফান্ড থেকে সরকারের ঋণের স্থিতি ছিল ২৫ হাজার কোটি টাকা। আর বিদায়ী অর্থবছরের শুরুতে ছিল ৫৩ হাজার ১৯৪ কোটি টাকা। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩১ হাজার ৩৩৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক অর্থবছরে সরকার ডিভলবমেন্টের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া বাড়িয়েছে ১৪৬ দশমিক ৮৯ শতাংশ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক নতুন টাকার জোগানের তথ্যটি অস্বীকার করলেও সংস্থাটির তথ্যেই নতুন টাকা ছাপানোর তথ্যটি উঠে আসে। তথ্য বলছে ২০২২ সালের মে মাসে দেশে মোট ছাপানো টাকার পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৯৪ হাজার ৮৬১ কোটি টাকা। চলতি বছরের মে মাসে যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৪০ হাজার ৭৫৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ একবছরের ব্যবধানে বাজারে টাকার জোগান বেড়েছে ৪৫ হাজার ৯০০ কোটি টাকা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ইতিপূর্বে একই অর্থবছরের ডিভলবমেন্ট করে সরকারকে এত বেশি ঋণ কখনো দেওয়া হয়নি। ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকটের কারণে চলতি অর্থবছর ডিভলবমেন্টের মাধ্যমে ঋণ দেওয়া বেড়েছে। ঋণের বিপরীতে বাজারভিত্তিক সুদের হার না থাকায় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ওপরও চাপ তৈরি হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি সরকারকে ঋণ বাড়িয়ে না দেয় তাহলে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সরকারের ট্রেজারি বিল ও বন্ড কেনার দিকে মনোযোগী হবে। এতে দেশের ঋণব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে।
ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগে সুদের হার প্রায় ৯ শতাংশ বা তার বেশি। এবং এতে কোনো ঝুঁকিও থাকে না। অপরদিকে, ঋণ বিতরণ ও উত্তোলনে ব্যাংকগুলোকে ঝুঁকি নিতে হয়। তাই ব্যাংকগুলোকে যদি অধিক পরিমাণে বিল ও বন্ড কেনার সুযোগ দেওয়া হয় তাহলে তারা শূন্য ঝুঁকির বিল আর বন্ডই কিনবে। অপরদিকে ঋণ বিতরণ কমিয়ে দেবে। এতে দেশের শিল্প খাত ক্ষতির মুখে পড়বে।
যদিও বিষয়টির সঙ্গে একমত নন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, সুদের হার বৃদ্ধি না করে বাংলাদেশ ব্যাংক যেই নীতি অবলম্বন করছে তা কোনো সমাধান নয়। এতে সাময়িকভাবে সমস্যার সমাধান হলেও দীর্ঘমেয়াদে মূল্যস্ফীতিতে প্রভাব ফেলবে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকার ব্যাংকব্যবস্থা থেকে এত বেশি ঋণ নিলে বেসরকারি খাতে প্রভাব পড়ে। সরকার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে অনেক কাজ করছে বলে দাবি করে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এভাবে ঋণ নিলে মূল্যস্ফীতি কমবে না। এছাড়া সরকার ডিভলভমেন্টের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে টাকা ছাপিয়ে ঋণ নিয়েছে। সরকার যদি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ঋণ চায় তখন তারাও নিষেধ করতে পারে না। এটা মার্কেটে মানি সার্কুলেশন বাড়াচ্ছে, যা মূল্যস্ফীতির জন্য ভালো কিছু নয়। এজন্য সরকারের উচিত বন্ড মার্কেটকে শক্তিশালী করা এবং ঋণ সেখান থেকেই নেওয়া।
