সাত সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ডিজিটাল আইনে মামলা

আপডেট : ১১ জুলাই ২০২৩, ০২:৫৫ এএম

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে সাত সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হয়েছে। নবীনগর পৌরসভার নারী কাউন্সিলর নীলুফার ইয়াসমিন ৫ জানুয়ারি মামলা করলেও শুক্রবার (৭ জুলাই) বিষয়টি জানাজানি হয়। মামলার বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর সারা দেশের উপজেলা ও জেলার সাংবাদিকরা ও সুশীলসমাজ তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান।

মামলার সাত আসামি হলেন সাবিনা ইয়াসমিন পুতুল (ভোরের সময়), মাহাবুব আলম লিটন (সমকাল), মো. বাবুল (আমার সংবাদ), জ, ই বুলবুল (এশিয়ান টিভি ও দেশ রূপান্তর), মো. সফর মিয়া (দৈনিক বর্তমান), দৈনিক সত্যের সন্ধ্যানে পত্রিকার নবীনগর প্রতিনিধি (নাম জানা যায়নি) ও মমিনুল হক রুবেল (ঢাকা নিউজ)।

চট্টগ্রাম সাইবার ট্রাইব্যুনাল আদালতের বিচারক মামলাটির তদন্তের জন্য পুলিশের কাউন্টার টেররিজম বিভাগকে নির্দেশ দিয়েছেন।

মামলার দায়িত্বপ্রাপ্ত তদন্তকারী কর্মকর্তা কাউন্টার টেররিজমের (সিএমপি) এসআই জুয়েল চৌধুরী শুক্রবার আসামিদের নাম ও ঠিকানা যাচাই করে প্রয়োজনীয় তথ্য জানানোর জন্য নবীনগর থানাকে চিঠি দেন। এরপরই বিষয়টি জানাজানি হয়।

নবীনগর থানার ওসি সাইফুদ্দিন আনোয়ার জানান, কাউন্টার টেররিজমের (সিএমপি) চিঠির ভিত্তিতে মামলায় আসামি হওয়া সবার নাম-ঠিকানা শনাক্ত করতে থানার এএসআই মাহমুদুল হককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মামলার এজাহার ও বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, নবীনগর পৌরসভার ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর নীলুফার ইয়াসমিনের বিরুদ্ধে সাবিনা ইয়াসমিন পুতুল মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট ও নবীনগর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে ‘শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধার ভুয়া সন্তান সেজে মুক্তিযোদ্ধা ভাতা উত্তোলনের অভিযোগ করেন। এতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তদন্ত কমিটি গঠন করে তদন্তপূর্বক তার ভাতা স্থগিত করেন। ওই অভিযোগের ভিত্তিতে সাত সাংবাদিক সংবাদ প্রকাশ করেন।

এরপরই ওই সাত সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ৫ জানুয়ারি চট্টগ্রাম সাইবার ট্রাইব্যুনাল আদালতে মামলাটি করেন নীলুফার ইয়াসমিন।

মামলার প্রধান আসামি ও অভিযোগকারী সাংবাদিক সাবিনা ইয়াসমিন পুতুল বলেন, ‘কাউন্সিলর নীলুফার শহীদ মুক্তিযোদ্ধার একজন ভুয়া সন্তান। তার বিরুদ্ধে সব প্রমাণসহ আমি গত বছর মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দিয়েছি। এতে তদন্ত কমিটি গঠন হয়ে তার ভাতা বন্ধ করা হয়েছে, কদিন আগেও আমার অভিযোগের ভিত্তিতে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী উভয় পক্ষকে ডেকে বিস্তারিত শুনে তাকে শাসিয়েছেন সঠিক কাগজপত্র দেওয়ার জন্য। আর আমার অভিযোগের ভিত্তিতে আমিসহ দায়দায়িত্বশীল সাংবাদিকরা পত্রিকায় রিপোর্ট করেছেন। আমাদের রিপোর্টে কোনো মিথ্যা তথ্য নেই, যা তথ্য-উপাত্ত নিয়েই করা এবং আমাদের কাছে সব তথ্য-প্রমাণ রয়েছে। তিনি বলেন, ‘নীলুফারের করা ডিজিটাল মামলাটি আমরা আইনগতভাবেই মোকাবিলা করব।’

মামলার বাদী কাউন্সিলর নীলুফার ইয়াসমিন বলেন, ‘পত্রিকায় মিথ্যা রিপোর্ট প্রকাশ হওয়ার পর তদন্তের স্বার্থে সাময়িকভাবে চলতি বছরের শুরুতে আমার ভাতা স্থগিত ছিল। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টসহ বিভিন্ন দপ্তরে শুনানির পর অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হয় এবং ভাতা আবার চালু হয়। এতে আমার মানহানি হওয়ায় মামলা করেছি।’

মামলায় আসামি হওয়া প্রবীণ সাংবাদিক নবীনগর প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি সমকালের মাহবুব আলম লিটন জানান, ‘আমরা সাংবাদিকতার রীতিনীতি মেনে, অভিযোগের ভিত্তিতে তথ্য সংগ্রহ করে নিউজ করেছি। আমরা নবীনগরে দুর্নীতি-অনিয়মের বিরুদ্ধে লাগাতার রিপোর্ট করায় একটি মহল আমাদের কণ্ঠরোধ করতে কাউন্সিলরকে দিয়ে মামলাটি করিয়েছে। আমরা মামলাটি আইনি মোকাবিলা করব।’

নবীনগর থানা প্রেস ক্লাবের সভাপতি এম কে জসিম উদ্দিন জানান, ‘মামলায় নবীনগর থানা প্রেস ক্লাবের দুজনকে আসামি করা হয়েছে। সেজন্য আমরা মামলার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি করছি। কেউ যদি মিথ্যা মামলা দিয়ে যদি সাংবাদিকদের হয়রানি করে, তাহলে আমরা থানা প্রেস ক্লাবের পক্ষ থেকে তা মোকাবিলা করব।’

নবীনগর প্রেস ক্লাবের সদ্য সাবেক সভাপতি সাংবাদিক জালাল উদ্দিন মনির ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলাটি করার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, ‘আমার জানা মতে, সাংবাদিকরা তথ্য-প্রমাণ রেখেই রিপোর্ট করে থাকেন। তাই কারও বিরুদ্ধে সত্য রিপোর্ট প্রকাশ হলেই সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।’

নবীনগর প্রেস ক্লাব সভাপতি শ্যামা প্রসাদ চক্রবর্তী ও সাধারণ সম্পাদক সাইদুল আলম সোহরাব বলেন, ‘মামলায় নবীনগর প্রেস ক্লাবের দুজনকে আসামি করা হয়েছে। সেজন্য আমরা নিন্দা জানাচ্ছি এবং মামলার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি করছি। কোনো সাংবাদিককে মিথ্যা মামলা দিয়ে যদি হয়রানি করা হয়, তাহলে আমরা প্রেস ক্লাবের পক্ষ থেকে তা মোকাবিলা করব।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত