দ্রোণাচার্য প্রস্থানে গেছেন। এবার কৌরব-পা-বদের গুরুদক্ষিণা দেওয়ার পালা। আজ কুরুক্ষেত্রে নামছেন সাবিনা-কৃষ্ণা-সানজিদা-মনিকারা। আর দূর থেকে প্রিয় শিষ্যদের লড়াই দেখতে অপেক্ষায় গোলাম রব্বানী ছোটন। বহু বছর ধরে নিজের অর্জিত অভিজ্ঞতা দিয়ে যাদে পরিপূর্ণ যোদ্ধা হিসেবে গড়ে তুলেছেন, তারা কি পারবে তাকে গুরুমাল্য পরিয়ে দিতে? সেই প্রশ্নের জবাবটা মিলবে আজ সন্ধ্যায় নেপালের বিপক্ষে মর্যাদার লড়াইয়ে।
প্রশ্ন করতেই ফোনের ওপাশে শোনা গেল হাসি। তবে খুব বোঝা যাচ্ছিল সেই হাসির আড়ালে লুকিয়ে দীর্ঘশ্বাস। একটা নতুন অধ্যায়ের শুরুর মাহেন্দ্রক্ষণে সেই দীর্ঘশ্বাসটা আড়ালেই রাখলেন ছোটন। কেমন আছেনÑ প্রশ্নে ওপাশ থেকে হেসে বলে উঠলেন, ‘অনেক ভালো আছি ভাই। অনেক হালকা লাগছে। আজ (গতকাল) তো আপনাদের কঠিন কঠিন সব প্রশ্নের সামনে পড়তে হয়নি।’ অথচ এমন দিনে ছোটনের এতটা নির্ভার থাকার কথা ছিল না। কোনোমতে মিডিয়া সামলেই তাকে বসতে হতো শত্রুবধের ছক কষতে। শত্রু চিরচেনা নেপাল। যাদের হারিয়ে গত বছর ১৯ সেপ্টেম্বর মিলেছিল দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্ব। এই শত্রুকে ছোটনের চেয়ে কে আর ভালো চেনে? অথচ এসব ‘ঝুট ঝামেলা’ থেকে এখন তিনি অনেক দূরে। প্রস্তুতি নিচ্ছেন আমজনতার সারিতে বসে শিষ্যদের খেলা উপভোগের।
আবেগকে সন্তর্পণে আড়াল করে রাখাটা ছোটনের বড় গুণ। পেশাদারি কোচদের যেটা থাকা বাঞ্ছনীয়। তাই এমন দিনেও আবেগকে দূরে সরিয়ে রাখতে চাইলেন। তার অধীনে বাংলাদেশের নারী ফুটবলের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পথচলা শুরু ২০১০ সালের ২৯ জানুয়ারি। ২০১০ ঢাকা এসএ গেমসে তৎকালীন টেকনিক্যাল ডিরেক্টর শহীদুর রহমান সান্টুর সঙ্গে ছোটন নামেন নিজেদের প্রমাণের অভিযানে। নিজেদের প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচে নেপালের কাছে ১-০ গোলে হেরে শুরু। তবে পরের দুই ম্যাচে শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানকে হারিয়ে পদক নিশ্চিত হয়। শেষ গ্রুপ ম্যাচে প্রবল প্রতিপক্ষ ভারতের কাছে হারায় ব্রোঞ্জপদক আসে বাংলাদেশের ঘরে। তবে সেই তামার পদকটাই ছোটনকে দিয়েছিল বড় স্বপ্ন দেখার সাহস।
সে বছরই প্রধান কোচের দায়িত্ব পেয়ে যান। আর ডিসেম্বরে কক্সবাজারে হয় প্রথম নারী সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ। সেই আসরের সেমিফাইনাল খেলে চমকে দেয় ছোটনের বাংলাদেশ। সেই শুরু। এরপর নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে পৌঁছে যাওয়া কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে। জিতে নেওয়া সাফ শিরোপা। তাও সেটা বীরের মতো, অপরাজিত থেকে। এর মাঝে তার অধীনে বয়সভিত্তিক সাফল্য এসেছে অসংখ্য। সাফের গ-ি ছাড়িয়ে গোটা এশিয়ায় পেয়েছে ব্যাপক প্রশংসা। ছোটনের হাত ধরেই দেশের ফুটবলের বড় বিজ্ঞাপন হয়ে ওঠেন মেয়েরা। অথচ তাকেই কিনা নিতে হলো এমন কষ্টের বিদায়!
সাফ খেলে আসার পর থেকেই বারবার বাফুফেকে তাগাদা দিয়েছেন মেয়েদের নিয়মিত আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার সুযোগ করে দেওয়ার। বাফুফে সেটাকে গুরুত্বই দেয়নি। অর্থ সংকটের অজুহাত দেখিয়ে দল পাঠানো হয়নি অলিম্পিক বাছাইয়ে খেলতে। সিঙ্গাপুরে ফিফা প্রীতি ম্যাচ খেলতে যাওয়াটাও বাতিল করে বাফুফে। মেয়েদের ন্যায্য দাবি-দাওয়া পূরণেও বারবার তাগাদা দিয়েছেন ছোটন। এসব কিছুই কাল হয়। আর অ্যাংলো-অস্ট্রেলিয়ান টেকনিক্যাল ডিরেক্টর পল স্মলি পদে পদে ধরতে থাকেন তার ভুল। পাশাপাশি কান ভারী করতে থাকেন খোদ বাফুফে সভাপতি কাজী সালাউদ্দিনের। একটা সময় সালাউদ্দিন বলেই ফেলেন, নারী ফুটবলের জাগরণে ছোটনের কোনো অবদানই নাকি নেই! সেটা আর নিতে পারেননি জাতীয় দলের সাবেক এই ফুটবলার। মে মাসের শেষভাগে পদত্যাগের ঘোষণা দেন হুট করেই। এরপর থেকে অবশ্য বাফুফে অনেক চেষ্টা করেছে তাকে ফেরানোর। তবে আত্মমর্যাদা বিকিয়ে ছোটন ফেরেননি নতমস্তকে। বরং গর্ব নিয়েই আজ শিষ্যদের লড়তে দেখতে চান, ‘আমি আগেও বলেছি, যেটা একবার ছেড়ে আসি, সেটা নিয়ে আক্ষেপ করার মানুষ আমি না। তাই বলে খেলা দেখব না, তা তো হতে পারে না। আমি আজ আরাম করে গ্যালারিতে বসে খেলা দেখব। আর মনেপ্রাণে চাইব দল যাতে জেতে।’
ছোটনের পরের কথাটাই বাকি জীবনে তার বড় অর্জন হয়ে থাকবে, ‘ভাই, আমি নিজেকে ভীষণ ভাগ্যবান মনে করি। একটা জাতীয় দলের শুরুর পর থেকে টানা ১৪ বছর কাজ করে নিজেই সরে এসেছি। কেউ আমাকে সরিয়ে দেয়নি। এরচেয়ে বড় আর কী হতে পারে?’ আর একেবারে শেষটায় যে কথাটা বলে ফোনটা রাখলেন, সেটা দেশের নারী ফুটবলের খেরো খেতায় থাকবে বড়সড় আক্ষেপ হয়ে, ‘কখনই ভাবিনি গত বছর সাফের ফাইনালটাই হবে বাংলাদেশের কোচ হিসেবে আমার শেষ ম্যাচ। এরপর তো...। থাক বাদ দেন।’
কথাটা আর শেষ করলেন না ছোটন। ইস্পাত কঠিন মানুষটাকে ঠিক সেই মুহূর্তে মনে হলো তিনিও একজন রক্তমাংসে গড়া মানুষ। যাকে আবেগও কখনো কখনো ছুঁয়ে যায়। সেটা শত আড়ালে চেষ্টা করলেও প্রকাশিত হয় দীর্ঘশ্বাস হয়ে।
