রূপপুর বিদ্যুৎ প্রকল্প

জ্বালানি আমদানি পরিবহন সংরক্ষণে লাইসেন্স লাভ

আপডেট : ১৪ জুলাই ২০২৩, ০১:২৬ এএম

পারমাণবিক জ্বালানি আমদানি, পরিবহন ও সংরক্ষণের লাইসেন্স অনুমোদনের মধ্য দিয়ে আরেকটি মাইলফলক অর্জন করল রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প। গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় পাবনার একটি হোটেলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বায়রা) এ লাইসেন্স হস্তান্তর করে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান বলেন, ‘রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাঙালি জাতির সক্ষমতার বড় প্রমাণ। আন্তর্জাতিক সব শর্তপূরণ করেই আমরা প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছি। এই লাইসেন্সপ্রাপ্তির মধ্য দিয়ে জাতি আজ একটি ঐতিহাসিক দিনের সাক্ষী হলো। কোনো ষড়যন্ত্রই এই প্রকল্পের বাস্তবায়ন রুখতে পারবে না।’

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক আন্তর্জাতিক পরমাণু বিশেষজ্ঞ ড. শৌকত আকবর বলেন, ‘পরমাণুর শান্তিপূর্ণ অবস্থান নিশ্চিতে বাংলাদেশ প্রতিটি ধাপে আইএইএর নীতিমালা অনুযায়ী কাজ করে নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে। সব শর্তপূরণ করেই আমরা জ্বালানি আমদানি, সংরক্ষণ ও পরিবহনের জন্য লাইসেন্স পেলাম।’

এই লাইসেন্সের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ পারমাণবিক জ্বালানি আমদানির সক্ষমতা অর্জন করল বলে জানিয়েছেন পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের নিউক্লিয়ার রেগুলেটরি স্ট্রাকচার উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ড. সত্যজিত ঘোষ।

তিনি বলেন, ‘পরমাণু জ্বালানি ব্যবহারে আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন আছে। বাংলাদেশে পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের রেগুলেটিং ও সুপারভিশন করে। পারমাণবিক জ্বালানি আমদানি, পরিবহন ও সংরক্ষণের জন্য রূপপুর প্রকল্প বাস্তবায়নে জড়িত সংস্থাগুলোর আমাদের কাছ থেকে লাইসেন্স নিতে হয়। রূপপুর প্রকল্প-সংশ্লিষ্টরা লাইসেন্সের জন্য আবেদন করার পর এক বছর ধরে প্রয়োজনীয় শর্তপূরণের নথি জমা দিয়েছেন। বারবার পর্যালোচনা ও মূল্যায়নে সন্তুষ্ট হওয়ার পর বায়রা তাদের এই লাইসেন্স দিতে সম্মত হয়েছে। আমরা লাইসেন্স প্রদান করছি বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন ও জ্বালানি পরিবহনে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে। এর মধ্য দিয়ে আগামী সেপ্টেম্বরে দেশের প্রথম পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য জ্বালানি আমদানিতে আর কোনো বাধা থাকল না।’

বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. মোজাম্মেল হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব জিয়াউল হাসান, রাশান ফেডারেশনের রোসটেকনাজোরের ডেপুটি চেয়ারম্যান, রোসাটমের ডেপুটি ডিরেক্টর মি এ ওয়াই পেত্রোভ, বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. অশোক কুমার পাল প্রমুখ।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বর্তমানে প্রথম ইউনিটের কমিশনিংয়ের প্রথম ধাপের কার্যক্রম চলমান আছে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) গাইডলাইন মেনে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির মূল কমিশনিং পর্যায়ের কাজের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। কমিশনিংয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে পারমাণবিক চুল্লিতে নিরাপদে পারমাণবিক জ¦ালানি লোড করা, সুষ্ঠুভাবে নিউক্লিয়ার বিক্রিয়ার মাধ্যমে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের ‘ফিজিক্যাল স্টার্টআপ’ কার্যক্রম সম্পন্ন, বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে গ্রিড লাইনের সিনক্রোনাইজেন বা যুক্ত করা, পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সবশেষে বাণিজ্যিক উৎপাদনের মাধ্যমে এই বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডের সাহায্যে গ্রাহকদের কাছে সরবরাহ করা।

আগামী সেপ্টেম্বরে প্রথম ব্যাচের পারমাণবিক জ্বালানি প্রকল্প এলাকায় সরবরাহ করতে নানা রকম প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। বেশিরভাগ কাজই ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে।

রাশিয়ার কারিগরি ও আর্থিক সহায়তায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের আওতায় পরমাণু শক্তি কমিশন বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পের জেনারেল ডিজাইনার ও কন্ট্রাক্টর রাশিয়ার রসাটম করপোরেশনের প্রকৌশল শাখা।

বাংলাদেশের একক প্রকল্প হিসেবে সবচেয়ে বড় অবকাঠামো এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট থেকে ২০২৪ সালে এবং এরপরের বছর দ্বিতীয় ইউনিট থেকে ১২০০ মেগাওয়াট করে ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যোগ হওয়ার কথা রয়েছে।

তবে আগামী নির্বাচনের আগেই প্রথম ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য জোর প্রচেষ্টা চলছে। এজন্য পিছিয়ে পড়া বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন নির্মাণের কাজ দ্রুতগতিতে শেষ করার জন্য পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশকে (পিজিসিবি) তাগিদ দেওয়া হচ্ছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

প্রকল্প পরিচালক ড. মোহাম্মদ শৌকত আকবর দেশ রূপান্তরকে বলেন, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্রের কমিশনিং কাজ শেষে উৎপাদন শুরু করতে পরিকল্পনা মোতাবেক প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এরই মধ্যে ‘ফুয়েল রেডিনেসের’ (জ্বালানি আমদানির প্রস্তুতি) জন্য চুক্তি সই হয়েছে। জ্বালানি উৎপাদন এবং এটি হ্যান্ডেলিং করতে প্রয়োজনীয় জনবল তৈরিতে কোনো সমস্যা নেই। আইইএর প্রতিনিধিদল নিরাপত্তাসহ অন্যান্য বিষয় সরেজমিনে পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সহায়তা দিচ্ছে। প্রকল্পের অগ্রগতি এবং দেশের পারমাণবিক অবকাঠামো উন্নয়নে ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করেছে তারা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত