চট্টগ্রামে ১৯৪৩টি মামলার একটিও নিষ্পত্তি হয়নি

আপডেট : ১৫ জুলাই ২০২৩, ০৬:২৫ এএম

চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলার থানাগুলোতে গত প্রায় ১৪ বছরে (২০০৯-১২ জুলাই, ২০২৩) নাশকতার অভিযোগে বিএনপি-জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হওয়া ১ হাজার ৯৪৩টি মামলার একটিও নিষ্পত্তি হয়নি। যদিও চলতি বছর ১৭ জানুয়ারি কাজীর দেউড়ি এলাকায় বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ ও গাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগে কোতোয়ালি থানায় চারটি এবং সর্বশেষ গত ১৫ জুন জামালখান এলাকায় বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল ভাঙচুরের অভিযোগে নগরীর চকবাজার ও কোতোয়ালি থানায় করা দুটি মামলা ছাড়া অবশিষ্ট মামলার তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দিয়েছে পুলিশ।

আদালতসংশ্লিষ্টরা বলেছেন, যথাসময়ে তদন্ত প্রতিবেদন না দেওয়া, সাক্ষী হাজির করতে না পারা এবং মামলার তারিখ নির্ধারণের ক্ষেত্রে সময় দেওয়া যথাসময়ে বিচারের পথে অন্তরায় হচ্ছে। রাষ্ট্রপক্ষ থেকে এসব মামলার বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করার তাগিদ থাকলেও ধীরগতিতে এগোচ্ছে বিচার কার্যক্রম। এ প্রসঙ্গে মহানগর আদালতের সরকারি কৌঁসুলি আবদুর রশিদ বলেন, ‘নাশকতার মামলাগুলোর দ্রুত বিচার সম্পন্ন করে দোষীদের যাতে শাস্তির আওতায় আনা যায় সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নাশকতার অভিযোগে করা অধিকাংশ মামলা ট্রায়ালে (বিচার) আছে। রাষ্ট্রপক্ষ অপরাধ প্রমাণিত করবে। তবে এখন পর্যন্ত একটি মামলাও নিষ্পত্তি করা যায়নি।’

পুলিশ ও আদালতের সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে চলতি বছরের ১২ জুলাই পর্যন্ত চট্টগ্রাম নগর ও জেলার থানাগুলোয় বিএনপি-জামায়াতে ইসলামীর ৩৯ হাজার ৪৫৫ জন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে ১ হাজার ৯৪৩টি। বেশি মামলা হয়েছে ২০১৩ ও ২০১৫ সালে সংসদ নির্বাচনের আগে ও পরে। মামলা হয়েছে জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও। ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে এসব মামলা হয়। যদিও নগর বিএনপির আহ্বায়ক ডা. শাহাদাত হোসেনের দাবি, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পুলিশ বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে এসব মামলা করেছে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নেতাকর্মীদের ভয় দেখিয়ে রাজনীতি থেকে দূরে রাখার জন্য এসব মামলা হয়েছে। বিগত ১৪ বছরে শুধু আমার বিরুদ্ধে দায়ের হয়েছে শতাধিক মামলা। এসব মামলায় হাজিরা দিতে কেটে যায় পুরো মাস, বছর।’

অবশ্য পুলিশের দাবি, রাজনৈতিক বিবেচনায় কোনো মামলা করা হয় না। এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) অন্যতম এক শীর্ষ কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাজনৈতিক বিবেচনায় কোনো মামলা হয় না। কোনো ব্যক্তি বা দল যখন সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও জনগণের জানমালের ক্ষতিসাধন করে থাকে, তখনই এ ঘটনাগুলোকে কেন্দ্র করে মামলা হয়। চট্টগ্রাম নগর বিএনপি বা জামায়াত-শিবিরের বেলায়ও তাই হয়েছে। এটা আমলযোগ্য অপরাধ।’

বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে নাশকতার অভিযোগে হওয়া মামলার বিচারকাজ দ্রুত নিষ্পত্তির চেষ্টা চলছে বলে জানিয়ে চট্টগ্রাম জেলা আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী শেখ ইফতেখার সাইমুল চৌধুরী বলেন, ‘পুলিশকে যে গতিতে নাশকতার বিরুদ্ধে মামলা করতে দেখা যায়, তদারকি করার ক্ষেত্রে তেমন গতি দেখা যায় না।’

এদিকে কেন্দ্রীয় বিএনপির মামলা ও তথ্য সংরক্ষণবিষয়ক কর্মকর্তা মো. সালাউদ্দিন খান জানান, গত প্রায় ১৪ বছরে চট্টগ্রাম বিভাগে বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে ১৩ হাজার ৫২২টি। এসব মামলায় আসামি হয়েছে ৩ লাখ ৭৩ হাজার ৩৫ জন। সারা দেশে গত ১৪ বছরে নাশকতার অভিযোগে মামলা হয়েছে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৫৬৭টি। এসব মামলায় আসামি ৪৯ লাখ ৮০ হাজার ৮২৬ জন। যার মধ্যে অগ্নিসংযোগ, বাস পোড়ানো, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস, পুলিশ পিটিয়ে হত্যা, বাসে আগুন লাগিয়ে মানুষ ও পশু হত্যা ইত্যাদি ধরনের নাশকতামূলক মামলা রয়েছে।

নাশকতার মামলায় জমা দেওয়া একাধিক চার্জশিট বিশ্লেষণ করে সিএমপির প্রসিকিউশন শাখার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রায় ১৪ বছরে নাশকতার একটি মামলাও নিষ্পত্তি হয়নি। অধিকাংশ মামলার চার্জশিট দেওয়া হয়েছে অনেকটা দায়সারা। এসব মামলায় আদালতে শক্ত যুক্তি-সাক্ষী দাঁড় করানো যাবে না। বেশ কিছু মামলা ট্রায়ালে থাকলেও সেসব মামলায় যথাসময়ে সাক্ষী আদালতে উপস্থিত করতেও পারছে না তদন্তকারী সংস্থা। লম্বা তারিখ পড়ছে মামলাগুলোর। ফলে দীর্ঘদিনেও বিচারকাজ সম্পন্ন করা যাচ্ছে না।

জানা গেছে, নাশকতার অভিযোগে নগর বিএনপির আহ্বায়ক শাহাদাত হোসেনের বিরুদ্ধে আছে ১০৪টি মামলা। নগর বিএনপির সদস্য সচিব আবুল হাশেমের বিরুদ্ধে আছে ৭২টি মামলা। নগর ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও বর্তমানে নগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক গাজী সিরাজ উল্লাহর বিরুদ্ধে আছে ১৩৫টি মামলা। নগর বিএনপি নেতাদের অভিযোগ, পুলিশ আদালতে চার্জশিট দিলেও অনেক মামলার তদন্ত ছাড়াই চার্জশিট হিসেবে পুরো এজাহার তুলে দেওয়া হয়েছে। তবে সিএমপি কর্র্তৃপক্ষ এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত