আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রাক-নির্বাচন পর্যবেক্ষক মিশন দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বৈঠক করছে। এর মধ্যেই দেশের ব্যবসায়ী নেতারা শেখ হাসিনার প্রতি জোর সমর্থন ব্যক্ত করে বলেছেন, আবারও তাকেই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চান তারা। গতকাল শনিবার এফবিসিসিআই আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সংগঠনের সভাপতি জসিমউদ্দিনসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ীরা এ কথা বলেছেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ব্যবসায়ীদের দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করুন। আমরা সব সময় আপনাদের (ব্যবসায়ীদের) পাশে আছি।’
প্রধানমন্ত্রী ব্যবসায়ীদের উদ্ভাবনী ধারণা কাজে লাগিয়ে রপ্তানি বাড়াতে নতুন বাজার ও পণ্য খুঁজে বের করার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, এ জন্য সরকার সর্বদা তাদের পাশে থাকবে। তিনি বলেন, ‘ব্যবসায়ীদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমরা সব সময় দেশের মানুষের কল্যাণের কথা ভাবি।’
এ প্রসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন যে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নির্বিশেষে সরকার সবাইকে সুযোগ দিয়েছে যা, দেশের মানুষের জন্য কল্যাণকর।
বিশেষ অতিথি ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি এবং প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান ফজলুর রহমান।
‘স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে ব্যবসায়ীদের ভূমিকা’ শীর্ষক এ সম্মেলনে যোগ দিয়ে বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) সভাপতি জসিমউদ্দিন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, ‘আপনি যেভাবে দেশকে এগিয়ে নিয়ে আসছেন ও আমাদের যে অবস্থান সৃষ্টি হয়েছে, সেটিকে ধরে রাখার জন্য আপনাকে প্রয়োজন। ব্যবসায়ীদের বিদ্যমান সমস্যাগুলো আপনার মাধ্যমে আমরা সমাধান করতে চাই। এ জন্য সব ব্যবসায়ী ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন। তারা সবাই আগামীতে আপনার নেতৃত্বে বিদ্যমান সমস্যাগুলোকে সমাধান করতে চায়।’
ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন দাবি দাওয়ার বিষয়ে সুদৃষ্টি থাকায় শেখ হাসিনার প্রতি ব্যবসায়ীরা কৃতজ্ঞ এবং তাকে নিয়ে গর্বিত বলেও উল্লেখ করেন এফবিসিসিআই সভাপতি। তিনি বলেন, ‘দেশে ডলার ও জ¦ালানি সংকটের মতো ব্যবসা-বাণিজ্যের যেসব সংকট রয়েছে তা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে সমাধান হচ্ছে।’
অনুষ্ঠানে তার বক্তব্যে বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান বলেছেন, ‘আপনার কোনো বিকল্প নেই। শেখ হাসিনার বিকল্প, শুধু শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনা এখন বিশ্বে একটি ব্র্যান্ড। সারা বিশ্বকে তিনি বাংলাদেশের প্রতি আকর্ষণ করতে পারেন।’
এ সময় সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ব্যবসায়ীদের দুর্ভোগের কথা স্মরণ করে আকবর সোবহান বলেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। এই ষড়যন্ত্র প্রতিহত করতে হবে।’
বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান বলেন, ব্যবসায়ীরা শান্তিপূর্ণ পরিবেশ চায়। শান্তিতে ব্যবসা পরিচালনা করতে চায়। কিন্তু ইদানীং প্রতিদিন পদযাত্রা বা অন্যান্য কর্মসূচির নামে জনজীবন ব্যাহত হচ্ছে। এটা কোনো রাজনীতি নয়। গণতন্ত্র মানে এই নয় যে যার যা খুশি সে তাই করবে। তিনি আরও বলেন, ‘সারা দেশের ব্যবসায়ীদের ম্যান্ডেট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পেয়ে গেছেন। ব্যবসায়ীরা শেখ হাসিনার সরকারের পাশে আছে, থাকবে। সংবিধান অনুযায়ী, আগামী নির্বাচন সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে হবে। সংবিধানের বাইরে কিছু হবে না।’
আকবর সোবহান বলেন, দেশে কর দিতে সক্ষম ৪ কোটি মানুষ আছে। কিন্তু কর দেয় ৩০ লাখ লোক। কর সংগ্রহ আরও বাড়াতে হবে।
সম্মেলনে ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি) বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেছেন, স্মার্ট বাংলাদেশ সরকারের দূরদৃষ্টি-সম্পন্ন পরিকল্পনা, যা বাস্তবায়নের জন্য দরকার উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো। আর উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সরবরাহ বাড়াতে হবে। এ জন্য সরকারকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।
মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘বিদ্যুৎ খাতে অলস সক্ষমতা রয়েছে। অন্যদিকে বিদ্যুৎ আমদানি করতে হচ্ছে। জ্বালানি আমদানি করতে না পারার কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এ জন্য কয়লা ও গ্যাস উত্তোলনে উদ্যোগ দরকার।’
রেলওয়ে খাত সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ডিজিটাল বাংলাদেশের কারণেই করোনার মতো মহামারীতেও বাংলাদেশের অর্থনীতি ভালো ছিল। সরকারকে কৃষি খাতের আধুনিকায়নে জোর দেওয়া প্রয়োজন।
শেখ হাসিনার দৃষ্টি আকর্ষণ করে মাহবুবুর রহমান বলেন, এবারের বাজেটে কর বিভাগের কর্মকর্তাদের বিচারিক ক্ষমতা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তাহলে আদালতের আর প্রয়োজন কী থাকল? তিনি বলেন, কর বিভাগের কর্মকর্তাদের কোনোভাবেই বিচারিক ক্ষমতা দেওয়া ঠিক হবে না; বরং কর খাতের ব্যাপক সংস্কার দরকার। তিনি ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ে আট লেনের পরিবর্তে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের প্রস্তাব করেন।
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের সভাপতি নজরুল ইসলাম মজুমদার বলেন, সাড়ে ১৪ বছর আগে (যুক্তরাষ্ট্রে) বারাক ওবামা ক্ষমতায় আসার সময় সেখানে স্লোগান ছিল ‘চেঞ্জ উই নিড’। একই সময়ে গোলার্ধের অন্য প্রান্তে আমাদের নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্লোগান ছিল ‘দিন বদলের সনদ’। দিন এখন বদলে গেছে। তিনি আরও বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আমাদের আপামর জনসাধারণের জন্য অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা সবকিছু দিয়েছেন। বললেই কী আমরা ওনাকে পরিবর্তন করে ফেলব? গত ১৪ বছরে দেশে যে উন্নয়ন হয়েছে, তা আগে হয়নি। এখন অনেক প্রজেক্ট অর্ধেক সম্পন্ন হয়ে আছে। সরকার পরিবর্তন হলে সব প্রজেক্ট বন্ধ হবে।’
নজরুল ইসলাম মজুমদারও বর্তমান সরকারকে আবারও ক্ষমতায় চেয়ে তার বক্তব্য শেষ করেন।
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক বাংলাদেশের সিইও নাসের এজাজ বিজয় বলেছেন, ‘বাংলাদেশ হচ্ছে সক্ষমতা ও আত্মবিশ্বাসের গল্প। একসময় বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি কোম্পানির বেশিরভাগ সিইও ছিলেন বিদেশি। এখন হাতে গোনা কয়েকজন বিদেশি সিইও রয়েছেন। এর কারণ বাংলাদেশের সক্ষমতায় উন্নতি হয়েছে; বিশেষ করে, গত ১৫ বছরে সক্ষমতা বেড়েছে।’ তিনি বলেন, ‘দেড় যুগের ধারাবাহিক উন্নতির পরে এবার কিছু চ্যালেঞ্জ এসেছে। সেটা বাংলাদেশের জন্য ইউনিক না। সবাই মিলে কাজ করতে হবে। যেটা দেশের জন্য ভালো, সবার জন্য ভালো, তা নিয়ে সবাই মিলে কাজ করলে দেশ এগোবেই। তবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কিছু সংস্কার দরকার।’
