আবাসন ব্যবসার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় এক কোটি লোকের কর্মসংস্থান আছে। জড়িয়ে আছে প্রায় ১০ হাজার শিল্পপ্রতিষ্ঠান। বিশেষভাবে সিমেন্ট, পাথর, টাইলস, লিফট, সিরামিক, গ্লাস, সুইচ-সকেট, কেবল, কিচেনওয়্যারসহ শিল্প খাতের পণ্য সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় আবাসন খাতে। শিল্প খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আয়কর আইন-২০২৩-এর আওতায় উৎসে কর বিধিমালা জারি করে দেশের সব এলাকার প্লট, ফ্ল্যাট, অ্যাপার্টমেন্ট ও বাণিজ্যিক স্থাপনার নিবন্ধন কর বাড়ানোয় আবাসন খাতে ধস নেমেছে। আবাসন খাতে করের বোঝা বাড়ানোয় এর সঙ্গে জড়িত শিল্প খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এতে বৈশি^ক মন্দায় বেকায়দায় থাকা অর্থনীতির সংকট আরও বেড়েছে।
আবাসন খাতের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব) সভাপতি আলমগীর শামসুল আলামিন (কাজল) দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, চলতি বাজেটে উৎস করবিধিমালার আওতায় নিবন্ধন কর দ্বিগুণ করা হয়েছে। উৎসে কর প্রযোজ্য হারে বাড়ানো হয়েছে। অনেক এলাকায় আবাসনে নিবন্ধন কর কয়েক গুণ বাড়ছে। প্লট, ফ্ল্যাট, অ্যাপার্টমেন্ট, বাণিজ্যিক স্থাপনাসহ সব ধরনের সম্পত্তি হস্তান্তরে খরচ বেড়েছে। এতে ক্রেতা কমবে। আবাসন ব্যবসা খারাপ চললে এর সঙ্গে জড়িত শিল্প খাতেও বেচাকেনা কমবে।
দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, আবাসন খাত ও এ খাতের সঙ্গে জড়িত শিল্প খাত লোকসানে পড়লে ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে সংশ্লিষ্টরা কর্মী ছাঁটাই করতে বাধ্য হবে। নিয়মিত রাজস্ব পরিশোধ করতে হিমশিম খাবে। আবাসন খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়লে সমগ্র অর্থনীতিতে গতি কমবে।
রিহ্যাব সূত্র জানায়, আবাসন খাতের লিংকেজ শিল্পের মধ্যে আছে, রেডিমিক্স তৈরির কারখানা, রি-রোলিং স্টিল মিলস, রেডিমিক্স সাইলো (জেটি) তৈরির শিল্প, স্টিল মিল (স্টিলবার, এঙ্গেল, প্ল্যাটবার ইত্যাদি তৈরি), স্টাইনলেস স্টিল মিল, ব্রিকস ম্যানুফ্যাকচারিং কারখানা, কাস্ট আয়রন মিলস, অটো ব্রিকস ম্যানুফ্যাকচারিং ইন্ডাস্ট্রি, মাইল্ড স্টিল মিল, সিরামিক ব্রিকস ইন্ডাস্ট্রি, করোকেটেড সিট প্রস্তুত কারখানা, সিআই সিট প্রস্তুত কারখানা, সাধারণ ইট প্রস্তুত ব্রিক ফিল্ড, কংক্রিট ব্লক ম্যানুফ্যাকচারিং ইন্ডাস্ট্রি, প্লেইন সিট প্রস্তুত কারখানা, কংক্রিট ব্রিক্স তৈরি কারখানা, ব্ল্যাক ও জিপি সিট মেকিং ফ্যাক্টরি, ক্রিস্টান ব্রিকস ম্যানুফ্যাকচারিং ইন্ডাস্ট্রি, স্টিল ওয়ার্কশপ, বালি, সাটার মেকিং ফ্যাক্টরি, স্টিল কার্টার অ্যান্ড রিপেয়ারিং টুলস ফ্যাক্টরি, স্টিল প্রস্তুতকারক মেশিনারিজ তৈরির কারখানা, চুম্বক প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান, তারকাঁটা তৈরির কারখানা, স্ক্রু ম্যানুফ্যাকচারিং ইন্ডাস্ট্রি, নাট, বোল্ট ও স্পাইক ম্যানুফ্যাকচারিং ইন্ডাস্ট্র্রি, বালি উত্তোলনের ড্রেজিং প্রস্তুত কারখানা, গ্রে সিমেন্ট প্রস্তুত কারখানা, হোয়াইট সিমেন্ট প্রস্তুত কারখানা, সিমেন্ট ব্যাগ তৈরির কারখানা, সিমেন্ট ফিগমেন্ট তৈরির কারখানা, সিমেন্ট ক্লিংকার প্রস্তুত কারখানা, সাটার, লাইম ক্রাশিং ইন্ডাস্ট্রিসহ শিল্পের বিভিন্ন খাতের ব্যবসা আবাসন খাতের সঙ্গে জড়িত।
বাংলাদেশ ল্যান্ড ডেভেলপার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএলডিএ), আবাসন খাতের সংগঠন রিহ্যাবসহ সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা ব্যবসায়ীদের অনেকে অর্থনীতিতে গতি বাড়াতে আবাসন খাতে রাজস্বের বোঝা কমাতে সরকারি নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। এ বিষয়ে একাধিক আবেদনপত্রও জমা দিয়েছেন।
এরই মধ্যে গত ৬ জুলাই ভূমি উন্নয়ন-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকদের সংগঠনের (বিএলডিএ) সভাপতি ও বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবাসন খাতসহ শিল্প খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। সংগঠনটি মনে করে, আবাসনে করের ভার কমানো না হলে একে একে ১০ হাজার শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাবে। এক কোটি লোক বেকার হয়ে যাবে। এতে দেশে সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেবে। জমি নিবন্ধনে অতিরিক্ত কর আরোপের কারণে দেশের আবাসন খাতে বিনিয়োগ কমবে। পাশাপাশি অনেকেই দেশের বাইরে বাড়িঘর করতে আগ্রহী হবেন, ফলে শঙ্কা বাড়বে অর্থ পাচার বৃদ্ধিতে।
চিঠিতে আরও বলা হয়, এত বেশি কর নির্ধারণের কারণে জনগণ জমি, বাড়ি, ফ্ল্যাট ইত্যাদিতে বিনিয়োগ করতে নিরুৎসাহিত হবে। এ ছাড়া দেশের বাইরে বিনিয়োগের আগ্রহী হবে তারা। এসব কারণে বিদেশে অর্থ পাচারেরও সম্ভাবনা রয়েছে। এতে সরকারের রাজস্ব হারানোর পাশাপাশি দেশের আবাসন খাতে চরম অস্থিরতা দেখা দেবে। উচ্চ করহার অযৌক্তিক, অমানবিক, স্বেচ্ছাচারী এবং বাস্তবায়নের অযোগ্য উল্লেখ করে বাড়ি, ফ্ল্যাট ও জমি রেজিস্ট্রেশন কর সহনীয় পর্যায়ে আনার লক্ষ্যে উৎস কর পুনর্নির্ধারণের অনুরোধ জানানো হয়েছে চিঠিতে। কর বৃদ্ধির কারণে জমি বেচাকেনা কম হবে, ফলে সরকারের রাজস্ব আদায় কমে যাবে।
আবাসন খাতের সংগঠন রিহ্যাব থেকেও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) আবাসন খাতে করের ভার কমানোর আবেদন করে বলা হয়েছে, আয়কর আইন-২০২৩-এর আওতায় উৎসে কর বিধিমালা জারি করে দেশের সব এলাকার প্লট, ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্ট ও বাণিজ্যিক স্থাপনার নিবন্ধন কর বাড়ানো হয়েছে। দেশের অর্থনীতির গতি বাড়াতে এ হার পুনর্বিবেচনা করে কমানো না হলে আবাসন খাত ও এর সঙ্গে জড়িত শিল্প খাতে ধস নেমে আসবে। নিবন্ধন করা বাড়ায় প্লট, ফ্ল্যাট, অ্যাপার্টমেন্ট, বাণিজ্যিক স্থাপনাসহ সব ধরনের সম্পত্তি হস্তান্তরে খরচ বাড়বে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এ খরচ ২৪ গুণ বাড়বে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, আবাসন খাতে কর বাড়ানোর পাশাপাশি চলতি বাজেটে সিমেন্ট, পাথর, টাইলস, লিফট, সিরামিক, গ্লাস, সুইচ-সকেট, কেবল, কিচেনওয়্যারসহ কমপক্ষে ১০ থেকে ১২টি পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। এসব পণ্যের দাম বাড়বে। এসব পণ্যের বড় ক্রেতা যারা প্লট, ফ্ল্যাট, বাড়ি ও অ্যাপার্টমেন্ট তৈরি করে। এসবের দাম বাড়ার প্রভাবও শেষ পর্যন্ত পড়বে প্লট, ফ্ল্যাট, বাড়ি ও অ্যাপার্টমেন্টের দামের ওপর। এর নেতিবাচক প্রভাবে সবার জন্য আবাসন এই স্লোগানকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে ও অনেকের আবাসনের স্বপ্ন কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। করের পরিমাণ বাড়ানোয় এরই মধ্যে আবাসন শিল্পে সংকট তৈরি হয়েছে।
চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, আমাদের বেসরকারি উদ্যোক্তাদের একান্ত প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠা এ খাত করের ভারে প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়েছে। উদীয়মান এই খাতে নানা রকম কর আরোপ ও সরকারের নীতি-সহায়তার অভাবে ক্রমে দেশের আবাসন খাত মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
