ধর্মঘট প্রত্যাহার করেছেন চিকিৎসকরা। রাজধানীর সেন্ট্রাল হাসপাতালে মা ও নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া দুই চিকিৎসকের মুক্তি দাবিতে গত সোম ও গতকাল মঙ্গলবার দেশের সব ব্যক্তিগত চেম্বারে রোগী না দেখা ও অস্ত্রোপচার না করার কর্মসূচি দিয়েছিলেন চিকিৎসকরা। এর মধ্যে সোমবার তার ধর্মঘট পালন করেন। কিন্তু গতকাল দুপুর পর্যন্ত এই ধর্মঘট চললেও পরে বিকেল থেকেই চেম্বারে রোগী দেখা ও অস্ত্রোপচার শুরু করেন তারা।
গতকাল গ্রেপ্তার দুই চিকিৎসক ডা. মুনা সাহা ও ডা. শাহজাদী মুস্তার্শিদা সুলতানাকে জামিন দেয় আদালত। পরে দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসকদের বিভিন্ন সংগঠনের নেতাদের এক বৈঠক শেষে ধর্মঘট প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সার্জনসের সভাপতি ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম।
এ ব্যাপারে তিনি বলেন, আটক দুই চিকিৎসকের জামিন হয়েছে। জামিন হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা আমাদের কর্মসূচি আপাতত প্রত্যাহার করে নিচ্ছি। আজ (গতকাল) এখন থেকেই (দুপুর) সবাই কাজে ফিরে যাবেন। চিকিৎসকরা চেম্বার করবেন, রোগী দেখবেন। সব ধরনের অস্ত্রোপচারসহ বাকি সব কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে চলবে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের কনফারেন্স রুমে এই বৈঠকে ফেডারেশন অব প্রফেশনাল মেডিকেল স্পেসালিস্ট সোসাইটি অব বাংলাদেশসহ চিকিৎসকদের অন্তত ৪০টি সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে আলোচনার প্রসঙ্গে অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেন, বৈঠকে বর্তমান পরিস্থিতিসহ চিকিৎসকদের নিরাপত্তা, রোগীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষাসহ নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন, বিশেষ করে চিকিৎসা সুরক্ষা আইন নিয়ে আমাদের অনেকে কথা বলেছেন। ডাক্তারদের সুরক্ষার কথা বলেছেন। কর্মস্থলে নিরাপত্তা, রোগীদের সুরক্ষার কথা বলেছেন। আমরা রোগীদেরও সুরক্ষা চাই, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে চাই। সেসব বিষয়ে আমাদের কার্যক্রম কী হবে সেটা পরে আমরা ঠিক করব।
মহাপরিচালক বলেন, কর্মক্ষেত্রে চিকিৎসকদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিতে আমরা উচ্চ আদালতে একটি রিট করারও সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সেই সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা ও সুরক্ষা আইন দ্রুত পাস করার কথাও বলছি।
চিকিৎসকদের ধর্মঘট প্রত্যাহারের ফলে মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে। রোগীদের উদ্বেগ কেটেছে। ধর্মঘট প্রত্যাহারের পরপরই বিভিন্ন হাসপাতালে রোগীদের আসার তথ্য জানিয়েছে হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ।
এর আগে প্রথম দিন সোমবারের মতো গতকালও দুপুর পর্যন্ত চেম্বারে রোগী দেখা ও অস্ত্রোপচার বন্ধ থাকায় রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে রোগীদের দুর্ভোগ দেখা গেছে। যদিও ধর্মঘটের কারণে এসব চেম্বারে রোগীর সংখ্যা কম ছিল, কিন্তু মারাত্মক জটিলতা নিয়ে আসা রোগীরা বসে ছিলেন চিকিৎসকের আশায়।
গতকাল দুপুরে রাজধানীর মগবাজারে রাশমনো স্পেশালাইজড হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে চিকিৎসকদের চেম্বারের বাইরে রোগীদের আসনশূন্য। হাসপাতালের তথ্য কর্মকর্তারা বলেছেন, ধর্মঘটের কথা রোগীরাও জানেন। তাই তারাও এই দুদিন আসেননি। তবে চেম্বারে আসা খুব অসুস্থ রোগীদের তারা অনকলে চিকিৎসকের পরামর্শ দিয়েছেন।
গতকাল দুপুর পর্যন্ত এই হাসপাতালে রুটিন অস্ত্রোপচার বন্ধ ছিল। এ ব্যাপারে ওটি (অপারেশন থিয়েটার) ইনচার্জ মোহাম্মদ রুহুল দেশ রূপান্তরকে বলেন, আগে দিনে গড়ে পাঁচটা করে অপারেশন হতো। কিন্তু গত সোম ও মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত মাত্র দুটি অপারেশন হয়েছে। অবশ্য হাসপাতালে ভর্তি থাকা ও জরুরি রোগীদের অপারেশন স্বাভাবিক ছিল। নতুন কোনো অপারেশন হয়নি।
একইভাবে অস্ত্রোপচার ও রোগী দেখা বন্ধ ছিল মগবাজারের ইনসাফ বারাকাহ কিডনি অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালেও। হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে, দোতলায় চিকিৎসকদের চেম্বারের বাইরে কোনো রোগী নেই। ইনফরমেশন ডেস্ক থেকে বলা হয়, এই দুদিন রোগীও কম এসেছে। খুব জরুরি কিছু রোগী এসেছিল, হাসপাতালের চিকিৎসকরা তাদের দেখেছেন।
এ ব্যাপারে হাসপাতালের জনসংযোগ কর্মকর্তা সোহরাব আকন্দ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ৫২-৫৩ জন চিকিৎসকের চেম্বার রয়েছে এখানে। তাদের কেউ তিন দিন, কেউ দুদিন, কেউ এক দিন এভাবে বসেন। এ সময় যেসব জরুরি রোগী এসেছে, তাদের ইমার্জেন্সি বিভাগ ও হাসপাতালের নিজস্ব ডাক্তার যারা আছেন, তারা দেখেছেন। সুপারিন্টেন্ডেন্ট অনকলে ডাক্তারদের দেখিয়েছেন। জরুরি অপারেশনগুলো তারা করে দিয়ে যাচ্ছেন।
এই কর্মকর্তা জানান, গত দুদিন রোগী আসেনি, অপারেশনও হয়নি। আগে দৈনিক গড়ে সর্বনিম্ন পাঁচটা থেকে ২০টা পর্যন্ত অপারেশন হয়। কিন্তু গত দুদিনে খুব কম পাঁচ-সাতটা অপারেশন হয়েছে। এগুলো সব জরুরি সাধারণ অপারেশন ছিল।
তিনি আরও গত ১৫ জুলাই দুই চিকিৎসক গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে দুদিন সারা দেশে প্রাইভেট চেম্বার ও অপারেশন বন্ধ রাখার ঘোষণা দেন চিকিৎসকরা। ওইদিন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) ও অবস্টেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজি সোসাইটি অব বাংলাদেশের (ওজিএসবি) যৌথ বৈঠক শেষে এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। পরে সেই সিদ্ধান্তের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে দেশের চিকিৎসকদের সবগুলো সংগঠন।
গত ৯ জুন রাজধানীর সেন্ট্রাল হাসপাতালে ডা. সংযুক্তা সাহার অধীনে হাসপাতালে ভর্তি হন মাহবুবা রহমান আঁখি। কিন্তু তখন এই চিকিৎসক দেশে ছিলেন না এবং সেই তথ্য রোগীর কাছে গোপন রাখেন হাসপাতালের অন্য চিকিৎসকরা। পরে ডা. সংযুক্তা সাহার অনুপস্থিতিতেই সে রাতেই অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান প্রসব করেন আঁখি ও পরে ১০ জুন বিকেলে নবজাতক সন্তান মারা যায়। এ ঘটনায় আঁখির স্বামী ইয়াকুব আলী ধানম-ি থানায় ‘অবহেলাজনিত মৃত্যুর একটি মামলা করেন। মামলায় ডা. শাহজাদী মুস্তার্শিদা সুলতানা, ডা. মুনা সাহা, ডা. মিলি, সহকারী জমির, এহসান ও হাসপাতালের ম্যানেজার পারভেজকে আসামি করা হয়। এ ছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকেও আসামি করা হয়েছে। মামলার পর ১৫ জুন রাতে ডা. শাহজাদী ও ডা. মুনা সাহাকে হাসপাতাল থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে ১৮ জুন দুপুরে ল্যাবএইড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান নবজাতকের মা আঁখিও।
দিনভর রোগী ভোগান্তি : ‘বোয়ালখালীর শাকপুরা গ্রাম থেকে চট্টগ্রাম শহরে এসেছি গাইনি ডাক্তার দেখাতে। এতদূর থেকে এসে শুনি ডাক্তার নেই। আগে জানলে তো হয়রানিতে পড়তাম না। দেশে যার যা ইচ্ছা তাই করছে।’ গতকাল মঙ্গলবার সকাল ১০টায় শাশুড়িকে নিয়ে চট্টগ্রাম নগরের পাঁচলাইশ বেসরকারি পার্কভিউ হাসপাতালে ডাক্তার দেখাতে আসা অন্তঃসত্ত্বা বিলকিছ বানু বলছিলেন এসব কথা।
গতকালও দিনভর সারা দেশে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা ভোগান্তিতে পড়েন। অবশ্য বিকেলে কর্মবিরতির প্রত্যাহার করা হলে রোগীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসে। চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনা থেকে আমাদের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, বিভাগীয় শহরগুলোতে বেসরকারি ক্লিনিক হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নিতে এসে ভোগান্তিতে পড়েন রোগীরা।
গতকাল দিনভর চট্টগ্রামে প্রাইভেট চেম্বার ও অপারেশন বন্ধ রাখায় ভোগান্তিতে পড়তে হয় রোগীদের। অনেকে চেম্বারে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থেকেও চিকিৎসকের সাড়া পাননি। সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, চিকিৎসক না থাকায় রোগীরা এসে ফিরে যাচ্ছেন। ফটিকছড়ি থেকে অসুস্থ মাকে নিয়ে ন্যাশনাল হাসপাতালে আসেন ব্যবসায়ী সৈয়দ সুমন। কিন্তু সংশ্লিষ্ট ডাক্তারের চেম্বার বন্ধ থাকায় বিপাকে পড়েন তিনি। ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘দেশটা তো মগের মুল্লুক হয়ে গেছে। যার যা ইচ্ছা তাই করছে। কারও কোনো মাথাব্যথা নেই।’
অসুস্থ বাবাকে নিয়ে পটিয়ার চক্রশালা থেকে আসেন ব্যাংকার ফরিদ উদ্দিন। কোনো হাসপাতালে ভর্তি করাতে না পেরে দুপুর ১২টায় বাবাকে নিয়ে যান চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানকার মেডিসিন ওয়ার্ডে সিট পাননি। অনেক কষ্টে ভর্তি করে তার বাবাকে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের মেঝেতে।
এদিকে রাজশাহীতে চিকিৎসকদের কর্মবিরতিতে স্থবির হয়ে পড়েছিল চিকিৎসাসেবা। অনেক রোগীই চেম্বারে এসে ঘুরে গেছেন। কেন্দ্রীয় ঘোষণার অংশ হিসেবে রাজশাহীর চিকিৎসকরা এ কর্মসূচি পালন করেন। তবে কর্মবিরতির আওতাভুক্ত না হওয়ায় সরকারি হাসপাতালে সেবা কার্যক্রম স্বাভাবিক ছিল। নাফিসা আক্তার নামে রোগীর এক স্বজন জানান, নাটোর থেকে তার এক আত্মীয় আসেন ডাক্তার দেখাতে। এসে শোনেন চেম্বার বন্ধ।
পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তাদের এখানে কোনো চিকিৎসক রোগী দেখেননি। সিরিয়ালও নেওয়া হচ্ছে না। তবে প্যাথলজিক্যাল টেস্ট করানো হয়।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ও বিএমএ রাজশাহীর সাধারণ সম্পাদক ডা. নওশাদ আলী বলেন, চিকিৎসকদের এটি কেন্দ্রঘোষিত কর্মসূচি। কোনো চিকিৎসকই প্রাইভেট প্র্যাকটিস করেননি। অপারেশন করাও ছিল।
ওদিকে খুলনায়ও বেসরকারি হাসপাতাল ও প্রাইভেট চেম্বারে চিকিৎসাসেবা বন্ধ রাখেন চিকিৎসকরা। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয় রোগীদের। তবে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা স্বাভাবিক ছিল।
আড়ংঘাটা থানা এলাকা থেকে আবদুল্লাহ আল কাফি (৫১) নামে এক রোগী খুলনা ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে আসেন এন্ডোসকপি করতে। কিন্তু বিশেষজ্ঞ ডাক্তার না আসায় এন্ডোসকপি করতে পারেননি।
পিরোজপুর জেলা সদর থেকে বেসরকারি খুলনা সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মস্তিষ্কে সমস্যা নিয়ে চিকিৎসা নিতে এসে চিকিৎসক না থাকায় ফিরে যান শিক্ষার্থী সুরমা (১৭)। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন সুরমার বাবা।
একই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা মো. ফিরোজ (৬০) জানান, তার হার্টে সমস্যা। দুপুর থেকে বসে আছেন, কিন্তু চিকিৎসক না আসায় কূল-কিনারা খুঁজে পাচ্ছেন না।
খুলনা সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ম্যানেজার (অ্যাডমিন) মো. হামিদুল ইসলাম খান জানান, জরুরি সেবা ও রুটিন অপারেশন চলেছে। কিন্তু বহির্বিভাগে রোগী দেখা বন্ধ ছিল।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, কর্মবিরতির জন্য হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা ভেঙে পড়ে। রোগীদের দুর্ভোগের পাশাপাশি তারাও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. মোহাম্মদ রবিউল হাসান বলেন, খুলনায় বেসরকারি হাসপাতাল ও প্রাইভেট চেম্বারে চিকিৎসাসেবা বন্ধ থাকলেও সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা স্বাভাবিক ছিল।
