অগ্নিগর্ভ মণিপুরে ২ নারীকে নগ্ন করার আগুন ভারত জুড়ে

আপডেট : ২১ জুলাই ২০২৩, ০২:২১ এএম

ভারতের অগ্নিগর্ভ মণিপুরে দুজন কুকি নারীকে প্রকাশ্য রাস্তায় নগ্ন করে ঘোরানোর একটি ভিডিও সামনে আসার পর সারা দেশ শোকে-দুঃখে-রাগে স্তম্ভিত হয়ে পড়েছে। প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে পার্লামেন্ট, সাংস্কৃতিক অঙ্গন, বিরোধী শিবির থেকে শুরু করে সর্বত্র। মণিপুরে শুরু হয়েছে নতুন সংঘাত। দেশটির সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, এ ‘চরম সাংবিধানিক ব্যর্থতা’র বিরুদ্ধে সরকার যদি কোনো ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে তারা নিজে থেকেই পদক্ষেপ নেবে। এর কিছু সময় পর অবশ্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পার্লামেন্টের অধিবেশন শুরুর আগে দেওয়া এক ভাষণে বলেছেন, ওই দৃশ্য দেখে তার হৃদয় দুঃখে ও ক্রোধে ফুঁসছে। তবে পার্লামেন্টের অধিবেশনে আর সব কার্যক্রম স্থগিত করে মণিপুর পরিস্থিতি নিয়ে জরুরি আলোচনার জন্য বিরোধী দলের অন্তত ১৫ জন এমপি মুলতবি প্রস্তাবও এনেছেন।

বিবিসি বলছে, গত ৩ মে থেকে মণিপুরে সংখ্যাগুরু মেইতেই ও সংখ্যালঘু কুকিদের মধ্যে যে রক্তাক্ত জাতি-সংঘাত এবং অবাধ হত্যা-লুণ্ঠন-ধর্ষণ-অগ্নিসংযোগ শুরু হয়েছে, দুই নারীকে নগ্ন করার ওই ঘটনা ছিল ঠিক তার দ্বিতীয় দিনেরই। তবে এ ঘটনার বীভৎসতা ও নৃশংসতা ঠিক কতখানি ছিল, তা সারা দেশ জানতে পারল ঘটনাটি ঘটে যাওয়ার আড়াই মাস পর। আড়াই মাস আগের ভিডিওটি কে বা কারা গত বুধবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়।

সোশ্যাল মিডিয়াতে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, মণিপুরের রাস্তায় কুকি-জোমি সম্প্রদায়ের দুজন নারীকে নগ্ন করে একদল লোক রাস্তায় হাঁটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে এবং তাদের ক্রমাগত যৌন লাঞ্ছনা করা হচ্ছে। দুজন নারীর একজনের বয়স ছিল মাত্র বিশ-বাইশ, অন্যজনের চল্লিশের আশপাশে। ভিডিওতে দেখা যায়, জনতার মধ্যে অনেকেই ওই নারীদের শরীরের বিভিন্ন অংশ খামচে ধরছে। এরপর তাদের জোর করে একটি চাষের ক্ষেতের দিকে টেনে নিয়ে যেতেও দেখা যায়।

বিবিসি বলছে, ১৮ মে ওই ঘটনার যে এফআইআর করা হয়েছে, তাতে ভিকটিমরা অভিযোগ করেছেন, কমবয়সী মেয়েটিকে প্রকাশ্য দিবালোকে অত্যন্ত নৃশংসভাবে দল বেঁধে ধর্ষণ করা হয়েছিল।

অভিযোগে আরও বলা হয়, ঘটনার দিন কাংপোকপি জেলায় তাদের গ্রাম যখন জ¦ালিয়ে দেওয়া হচ্ছিল, তখন প্রাণে বাঁচতে তারা পরিবারের কয়েকজন মিলে কাছের জঙ্গলের দিকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। পথে থৌবাল জেলার একটি পুলিশ ভ্যান তাদের উদ্ধার করে গাড়িতে তুলে নেয়। তবে পুলিশ যখন তাদের থানায় নিয়ে যাচ্ছিল, তখন থানা থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার দূরে একদল উত্তেজিত জনতা তাদের ঘিরে ধরে। ক্ষুব্ধ জনতা তাদের পুলিশের হেফাজত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়।

মণিপুর পুলিশও স্বীকার করেছে, সোশ্যাল মিডিয়াতে ছড়িয়ে পড়া ওই ভিডিওটি জাল নয়, সত্যি। তবে ওই ঘটনা গত ৪ মে তারিখের এবং তাতে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অপহরণ, দল বেঁধে ধর্ষণ ও হত্যার মামলাও হয়েছিল।

ভারতের সংবাদমাধ্যম এএনআই জানিয়েছে, গতকাল এ ঘটনার হোতাদের একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মণিপুরের মুখ্যমন্ত্রী এন বীরেন সিং বলেছেন, এ ঘটনায় যারা দোষী, তারা যাতে ফাঁসির সাজা পায়, তিনি সেই চেষ্টাই চালাবেন। কিন্তু ভিকটিম দুজন নারীর একজন ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকাকে জানিয়েছেন, পুলিশ আসলে হামলাকারীদের সঙ্গেই ছিল। ওরা বাড়ির বেশ কাছেই প্রথমে তাদের গাড়িতে তুলে নেয়, তারপর গ্রামের একটু বাইরে গিয়েই রাস্তায় ছেড়ে দেয়। পুলিশই ওই জনতার হাতে তাদের তুলে দিয়েছিল। ওই জনতা এরপর জোর করে তাদের সব জামাকাপড় খুলতে বাধ্য করে। তাদের রাস্তা দিয়ে নগ্ন করে হাঁটানো হয়, এরপর পাশের ধানক্ষেতে নিয়ে গিয়ে যৌন নির্যাতন চালানো হয়।

অভিযোগপত্রে লেখা হয়েছে, তিনজন নারী ও দুজন পুরুষসহ তারা দলে পাঁচজন ছিলেন, যারা গ্রাম থেকে পালানোর চেষ্টা করছিলেন। বছর পঞ্চাশের যে তৃতীয় নারী ছিলেন, তাকেও নগ্ন করে ঘোরানো হয়েছিল। দলের দুজন পুরুষ ছিলেন সবচেয়ে কমবয়সী নারীটির বাবা ও ভাই। ধর্ষণে বাধা দেওয়ায় তাদের দুজনকেই হামলাকারীরা হত্যা করেছে বলেও এফআইআরে জানানো হয়েছে।

গত মে মাস থেকে বিজেপি-শাসিত মণিপুরে অন্তত ১২০ জনের মৃত্যু হয়েছে, আহত হয়েছে সহস্রাধিক। অসংখ্য ঘরবাড়ি, গির্জা, মন্দির ধূলিসাৎ হয়েছে। ৬০ হাজার মণিপুরি এখনো শরণার্থীশিবিরে বন্দি।

মণিপুর পরিস্থিতি নিয়ে এতদিন একবারের জন্যও প্রধানমন্ত্রী মোদি মুখ খোলেননি। বিরোধীদের সমস্বর প্রতিবাদের মধ্যেই ভাইরাল হয় ভিডিওটি। যেদিন তা জনসমক্ষে ছড়িয়ে পড়ে, তার পরদিন থেকেই শুরু সংসদের অধিবেশন। সেই অধিবেশনে যোগ দেওয়ার মুখে প্রধানমন্ত্রী মোদি প্রথমবারের মতো সরব হলেন। ওই ঘটনায় যারা দোষী, তাদের কঠোরতম শাস্তি দেওয়া হবে বলে অঙ্গীকার করেছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী সকালে বলেছেন, মণিপুরের দুহিতাদের সঙ্গে যা ঘটেছে, তা কিছুতেই ক্ষমা করা যায় না।

এর কিছুক্ষণ আগেই মণিপুর সংকট নিয়ে মুখ না খোলার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে সরাসরি আক্রমণ করে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে মন্তব্য করেন, ‘নরেন্দ্র মোদিজি, মণিপুর নিয়ে আপনার নীরবতার জন্য দেশ কিছুতেই আপনাকে ক্ষমা করবে না।’

অধিবেশনের শুরুতেই বিরোধীদলীয় এমপিরাও একসুরে দাবি জানাতে থাকেন, পার্লামেন্টে বাকি সব কাজ ফেলে অবিলম্বে মণিপুর নিয়ে আলোচনা শুরু করতে হবে। এর একটু পরেই পার্লামেন্টের বাইরে অধিবেশন শুরুর আগে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী মোদি অবশেষে মণিপুর নিয়ে তার নীরবতা ভঙ্গ করেন। ওই ভাষণে পার্লামেন্টের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, ‘আজ আমি যখন গণতন্ত্রের মন্দিরের ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে, আমার হৃদয় গভীর যন্ত্রণা আর ক্রোধে ভরে উঠেছে। মণিপুরের ঘটনা যেকোনো সভ্য রাষ্ট্রের জন্য কলঙ্ক, আমাদের গোটা দেশ এর জন্য লজ্জিত।’ তিনি বলেন, ‘আমি দেশকে কথা দিচ্ছি, এ ঘটনায় দোষীরা কেউ পার পাবে না। আইন অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মণিপুরের দুহিতাদের সঙ্গে যা ঘটেছে, তা ক্ষমার অযোগ্য।’

তার আগে ভারতের শীর্ষ আদালতও স্বতঃপ্রণোদিতভাবে মণিপুরের ওই ঘটনাটি ‘কগনিজেন্সে’ নিয়ে এটিকে ‘চরম সাংবিধানিক ব্যর্থতা’ বলে বর্ণনা করে। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি ডিওয়াই চন্দ্রচূড় বলেছেন, গতকাল থেকে যে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়েছে, সেটি দেখে আমরা অত্যন্ত বিচলিত বোধ করছি এবং গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছি। সরকার আপনা থেকে এর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে সুপ্রিম কোর্ট ২৮ জুলাই থেকে নিজেরাই এ মামলার শুনানি শুরু করবে।

এ সময়ের মধ্যে সরকার দোষীদের বিরুদ্ধে কী কী ব্যবস্থা নিচ্ছে, তার প্রতিটি পদক্ষেপও সুপ্রিম কোর্টকে নিয়মিত অবহিত করতে হবে বলে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত