বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) উদ্বেগের বিষয়টি জানিয়েছেন ইইউর মানবাধিকারবিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি ইমোন গিলমোর। আইনের বিভিন্ন নেতিবাচক দিক এবং প্রয়োগের বিষয় তুলে ধরেন তিনি। আইনমন্ত্রী তাকে জানান, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এ বছরের সেপ্টেম্বরেই সংশোধনে হবে।
এ ছাড়া আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগের এবং পরের পরিস্থিতি কী হচ্ছে না হচ্ছে, তা ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) নজরে রাখবে বলে জানিয়েছেন গিলমোর। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের গণতন্ত্রের বয়স খুব বেশি নয় এবং এর ‘সীমাবদ্ধতা’ ইইউ নেতৃত্ব ভালো করে জানেন এবং বোঝেন।
গতকাল মঙ্গলবার ইইউর এ বিশেষ প্রতিনিধি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব তোফাজ্জল হোসেন ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন আহমেদের সঙ্গে বৈঠক করেন। তার সঙ্গে ছিলেন ইউরোপিয়ান এক্সটার্নাল অ্যাকশন সার্ভিসের (ইইএএস) রাজনৈতিক উপদেষ্টা ভিক্টর ভিলিক, ঢাকায় নিযুক্ত ইইউ রাষ্ট্রদূত এইচ ই চার্লস হোয়াইটলিসহ চার সদস্যের প্রতিনিধিদল।
গত সোমবার বাংলাদেশ সফরে আসেন গিলমোর। বাংলাদেশে এটি তার দ্বিতীয় সফর। সফরে তিনি রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন ছাড়াও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন। পাশাপাশি তিনি নাগরিক সমাজ, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও ঢাকায় জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় করার কথা রয়েছে।
আইনমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক : সচিবালয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের সঙ্গে তার দপ্তরে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ইইউ বিশেষ প্রতিনিধি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে উদ্বেগের কথা জানান। তিনি বলেন, ‘আমাদের মধ্যে বৈঠকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে কথা হয়েছে। এ আইনের প্রয়োগ নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন উদ্বিগ্ন। বিপুলসংখ্যক সাংবাদিক ও সামাজিকমাধ্যম ব্যবহারকারীর বিরুদ্ধে এ আইনে মামলা হয়েছে। আইনমন্ত্রী আমাকে নিশ্চিত করেছেন, আইনটি সংশোধনে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। আমরা আইনটি প্রকাশের অপেক্ষায় আছি। প্রকাশ হওয়ার পর ভালো করে দেখব।’
বৈঠক সম্পর্কে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সংশোধন করা হচ্ছে। এ সংশোধনে সাংবাদিকরাও খুশি হবেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এটার জন্য আপনাদের একটু অপেক্ষা করতে হবে। আমি মনে করি আপনাদের পরামর্শ সরকারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।’
উপাত্ত সুরক্ষা আইন নিয়েও কথা হয়েছে উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘ইইউ প্রতিনিধিদলকে বলা হয়েছে, এটা নিয়ে অংশীজনদের সঙ্গে একবার বৈঠক করার পর আবার একটা খসড়া তৈরি করা হয়েছে। আবারও অংশীজনদের সঙ্গে বসা হবে।’
শ্রম আইন নিয়ে আলোচনার বিষয়ে আনিসুল হক বলেন, ‘তাদের বলেছি, বাংলাদেশে শ্রমিকদের অধিকার জোরদার হয়েছে। এটি নিয়ে অনেক কাজ করেছি এবং করে যাচ্ছি। যেসব সমস্যা আছে, সেগুলো দূর হবে বলে আশা করছি। আমরা ইইউর সহযোগিতা চেয়েছি।’
নির্বাচন নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘ইইউ বিশেষ প্রতিনিধিকে বলেছি, প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনার নিয়োগে যে আইনি আমরা করেছি, এটি উপমহাদেশে প্রথম। গেল অর্ধশত বছরে আর কোনো আইন হয়নি। আমরা আইন করেছি অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের জন্য।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক : দুপুরের আগে মন্ত্রণালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের সঙ্গে বৈঠক করেছে ইমোন গিলমোরের নেতৃত্বে আসা প্রতিনিধিদল। পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ‘নির্বাচন নিয়ে বাংলাদেশের প্রস্তুতি জানতে চেয়েছেন তারা। আমরা তাদের জানিয়ে দিয়েছি, সংবিধান অনুসারে নির্বাচন হবে। সরকার নির্বাচন কমিশনকে সহযোগিতা করবে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা বলেছি নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব হচ্ছে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দেওয়া। সেই উপহার দেওয়ার জন্য তিন মাস নির্বাচন কমিশন সরকার পরিচালনা করবে। সরকার মানে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও নির্বাচন পরিচালনা করতে যা যা প্রয়োজন, তা নির্বাচন কমিশন স্বাধীনভাবে করতে পারবে।’
খুন, গুম ও বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলার অভিযোগ এসব বিষয়ে বৈঠকে কোনো আলোচনা হয়েছে কি না, এ প্রশ্নে আসাদুজ্জামান বলেন, ‘এসব নিয়ে বিশেষ কোনো কথা হয়নি। তারা বলেছে পর্যবেক্ষণ করছে।’
মন্ত্রী বলেন, ‘ইইউ প্রতিনিধিদলকে গুমের বিষয়ে বলা হয়েছে গুমগুলোর বেশিরভাগই হেইনাস (ঘৃণ্য) অপরাধের সঙ্গে জড়িত। দণ্ডের ভয়ে তারা পালিয়ে বেড়ায়। কিংবা পারিবারিক সমস্যার কারণে তারা পালিয়ে বেড়ায়। কিংবা ব্যবসা-বাণিজ্য লোকসান দিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে।’
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক : দুপুর ২টার দিকে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলমের সঙ্গে বৈঠক করেন ইমোন গিলমোর। বৈঠকের পর তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়েনের সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মানবাধিকার। আমরা সম্পর্কের ক্ষেত্রে মানবাধিকারকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকি।’ তিনি বলেন, ইইউ বাংলাদেশের আগামী জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ দেখতে চায়। বৈঠকে মানবাধিকার পরিস্থিতি, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ সম্পর্কের নানা দিক নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানান গিলমোর।
সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনের আমন্ত্রণে বাংলাদেশ সফর করে যাওয়া ইইউর স্বাধীন বিশেষজ্ঞ দল প্রসঙ্গে গিলমোর বলেন, তারা এ সফর সম্পর্কে ব্রাসেলসে প্রতিবেদন দেবেন। তার ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
শাহরিয়ার আলম বলেন, ‘আমরা নির্বাচন নিয়ে আলোচনা করেছি। কিন্তু অন্য রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনে নিয়ে আসার বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি।’
প্রতিমন্ত্রী জানান, ইইউর জিএসপি সুবিধা ২০২৬ সাল পর্যন্ত বলবৎ ছিল, যা তার ২০২৯ পর্যন্ত বর্ধিত করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওই মেয়াদ ২০৩২ পর্যন্ত বর্ধিত করতে সব উন্নত দেশকে আহ্বান জানিয়েছেন। জিএসপি প্লাস সুবিধা পাওয়ার জন্য ব্রাসেলসের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রেখেছি।
মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা : রাজধানীর কারওয়ান বাজারে কমিশনের কার্যালয়ে চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন আহমেদের সঙ্গে বৈঠক করেন ইইউর মানবাধিকারবিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি। বেলা সোয়া ১১টা থেকে শুরু হওয়া ঘণ্টাব্যাপী এ বৈঠকের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন কমিশনের চেয়ারম্যান ও ইমোন গিলমোর।
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেন্দ্র করে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে গিলমোর বলেন, ‘প্রতিটি দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এ ইস্যুতে আমরা বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছি। নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে একটি প্রতিনিধিদল ইতিমধ্যেই ঘুরে গেছে। তারা শিগগিরই রিপোর্ট দেবে। তবে নির্বাচন সামনে রেখে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগের কারণ আছে। তারা বলেছে, এ বিষয়ে সরকারি পর্যায়ে কথা বলবে।’
বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন ইউরোপিয়ান এক্সটার্নাল অ্যাকশন সার্ভিসের (ইইএএস) রাজনৈতিক উপদেষ্টা ভিক্টর ভিলিক, ঢাকায় নিযুক্ত ইইউ রাষ্ট্রদূত এইচ ই চার্লস হোয়াইটলি।
