ঢাকার তোপখানা রোডে রক্সি ফটো সার্ভিস নামে একটি স্টুডিও ছিল। স্টুডিওর মালিক ছিলেন বাংলাদেশের আলোকচিত্রের আচার্য মনজুর আলম বেগ। ১৯৬০ সালে তিনি স্টুডিওটি স্থাপন করেন। রক্সি স্টুডিও টিকে ছিল মাত্র চার বছর। ১৯৬৩ সালে স্টুডিওটি বন্ধ হয়ে যায়। স্বল্পায়ু হলেও রক্সি ফটো সার্ভিস বাংলাদেশের ফটোগ্রাফির ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কারণ, এই স্টুডিও থেকেই জন্ম নেয় বেগার্ট ইনস্টিটিউট অব ফটোগ্রাফি। বেগার্ট থেকে এ দেশের হাজারো তরুণ-তরুণী ফটোগ্রাফি বিষয়ে শিক্ষা লাভ করেন। ফলে বাংলাদেশের ফটোগ্রাফির ইতিহাসকে বুঝতে হলে রক্সি ফটো সার্ভিসকে জানা জরুরি।
রক্সি ফটো সার্ভিসকে জানতে গিয়ে পাওয়া যায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। মেট্রিক পরীক্ষা দিয়ে ১৯৪৯ সালে মনজুর আলম বেগ যোগ দেন পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে। এরপর ১৯৫৭ সালে করাচির প্যান্সডকে [পাকিস্তান ন্যাশনাল সায়েন্টিফিক টেকনিক্যাল ডক্যুমেন্টেশন সেন্টার] যোগ দেন। ১৯৬০ সালের গোড়ার দিকে প্যান্সডকে পদোন্নতির বিষয়ে মনজুর আলম বেগকে জানানো হয়, স্নাতক নয় এমন ব্যক্তিকে অফিসার হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া যাবে না। সেটি শুনে তিনি এক কথায় চাকরি ছেড়ে ঢাকায় চলে আসেন। এখানে মনজুর আলম বেগের প্রতিবাদী বৈশিষ্ট্যের প্রমাণ পাওয়া যায়।
ঢাকায় এসে তিনি নর্থ ব্রুক হল রোডে তার বড় বোনের বাসায় ওঠেন। বোনকে একটা স্টুডিও স্থাপনের কথা জানান। বড় বোন তাকে কিছু টাকা দিলেন। সেই টাকায় তিনি তোপখানা রোডে গড়ে তোলেন রক্সি ফটো সার্ভিস নামের একটা বাণিজ্যিক স্টুডিও। বিভিন্ন ফটোগ্রাফি ম্যাগাজিন, পুস্তকসহ অ্যানসাইক্লোডিয়া অব ফটোগ্রাফি দিয়ে স্টুডিওটাকে সাজালেন। মনজুর আলম বেগ কখনো ব্যবসায়ী মনোভাবের ছিলেন না; তার ছিল সৃষ্টির নেশা। ফলে রক্সি স্টুডিও কখনো আর্থিক সাফল্যের মুখ দেখে নি। ছবি তুলে কাস্টমারদের সন্তুষ্ট করার চেয়েও তিনি ফটোজেনিক লোক পাওয়া গেলে তার নানা রকম শৈল্পিক ছবি তুলতেই বেশি পছন্দ করতেন। ওই সময় মনজুর আলম বেগ ফ্লুরোসিভে আক্রান্ত হয়ে অনেক দিন ধরে মহাখালি বক্ষব্যাধি হাসপাতালে ভর্তি থাকেন। ফলে স্টুডিওটি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। এমন সময় বগুড়া থেকে নুরুল আজফার তোতা নামের এক তরুণ এসে তার সঙ্গে দেখা করেন। তিনি স্টুডিওটি দেখভালের দায়িত্ব নিতে চান। মনজুর আলম বেগ তাকে স্টুডিওতে চাকরি দিলেন। রক্সিতে তিনি ছাড়াও আরেকজন কর্মচারি ছিল। হঠাৎ ওই কর্মচারী উধাও। ডার্করুমের জিনিসপত্র খুঁজতে গিয়ে দেখা গেল সবই ঠিকঠাক আছে, শুধু দেওয়ালে লাগানো ডেভলাপার ফরমুলাটা নেই। কিছুদিন পর ওই কর্মচারীর সঙ্গে দেখা। কর্মচারী বললেন, 'আমি একটি অন্যায় করে ফেলেছি।' 'কি অন্যায়' জানতে চাইলেন মনজুর আলম বেগ। কর্মচারী বললেন, 'আপনাকে না জানিয়ে ডার্করুম থেকে আমি একটি ডেভলপার ফর্মুলাটি নিয়ে গিয়েছিলাম।' বেগ সাহেব বললেন, 'চাইলেই তুমি পেতে পারতে।' কর্মচারী বললেন, 'এগুলো সিক্রেট, কেউ কি কাউকে দেয়!'
এই কথা শুনে মনজুর আলম বেগ খুবই আশ্চর্য হলেন এবং আলোকচিত্র বিষয়ে বই লেখা ও ফটোগ্রাফি শিক্ষালয় প্রতিষ্ঠার কথা ভাবেন। ওই সময় মনজুর আলম বেগের বয়স মাত্র ২৯ বছর। ওই বছরের ২১ ডিসেম্বর তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বেগার্ট ইনস্টিটিউট অব ফটোগ্রাফি। ১৯৬৩ সালে নুরুল আজফার তোতা চাকরি ছেড়ে নিজে স্টুডিও খোলেন। তোতা চলে যাওয়ার পর রক্সি স্টুডিওটিও স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
তোপখানা রোডের কোথায় ছিল রক্সি স্টুডিও? মনজুর আলম বেগের লেখা থেকেই জানতে পারি এর ঠিকানা। রক্সি অবস্থিত ছিল ৩৩ নম্বর তোপখানা রোডে। আজ ২৭ জুলাই সকালে যাই সেই ঠিকানায়। ৩৩ তোপখানা রোডে এখন দাঁড়িয়ে আছে মেহেরবা প্লাজার বহুতল ভবন। ১৯৯৯ সাল থেকেই মেহেরবা প্লাজায় আমার নিয়মিত যাতায়াত। এই ভবনের নিচ তলায় ফুজি কালারের একটা ল্যাব ছিল। আমি প্রায় প্রতিদিন সেই ল্যাবে ফিল্ম ডেভেলপ ও ছবি প্রিন্ট করতে যেতাম। এই বহুতল ভবন গড়ে ওঠার আগে এখানে কী ছিল জানতে ফোন করি বিপিএসের সাবেক সভাপতি ও অগ্রজপ্রতীম ফটোসাংবাদিক বুলবুল আহমেদকে। বুলবুল ভাই জানান, আগে এখানে একটা বিল্ডিং ছিল, সেটা ভেঙেই করা হয়েছে মেহেরবা প্লাজা।
রক্সি স্টুডিওর গল্প শুনেছিলাম একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রয়াত আলোকচিত্রী গোলাম মুস্তাফার সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময়। বেগার্টের প্রথম ব্যাচের ছাত্র মুস্তাফা ভাই বলেছিলেন, রক্সিতেই বেগ সাহেবের সঙ্গে তার প্রথম পরিচয়। তিনি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। একদিন প্রেসক্লাব থেকে রাস্তা ধরে আগালেন বাস ধরবেন বলে। হঠাৎ রক্সি ফটো সার্ভিস এর সাইনবোর্ড চোখে পড়লো। ভেতরে গিয়ে দেখলেন, কাউন্টারে তামাটে বর্ণের ছিপছিপে একজন ভদ্রলোক, একটু দাড়ি আছে; খুবই ইন্টারেস্টিং চেহারা। ওই দিনই তার শিষ্য হয়ে যাই।
আজ মনজুর আলম বেগ নেই, গোলাম মুস্তাফা আর নুরুল আজফার তোতা নেই; রক্সি স্টুডিওরও অস্তিত্ব নাই। ঢাকার সায়েন্স ল্যাব এলাকায় ইতিহাসের নিরব সাক্ষী হয়ে টিকে আছে বেগার্ট ইনস্টিটিউট অব ফটোগ্রাফি।
লেখক : দেশ রূপান্তরের আলোকচিত্র সম্পাদক।
১. আলোকচিত্রাচার্য মনজুর আলম বেগ ও সমকালীন আলোকচিত্রের বিবর্তন, জাহাঙ্গীর সেলিম, প্রকাশক : পাঠশালা ও প্যাপিরাস, প্রকাশকাল : নভেম্বর ২০০২
২. বাংলাদেশের ফটোগ্রাফি ইতিহাস, এম এ বেগ, মাসিক ফটোগ্রাফি [প্রথম বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা, ডিসেম্বর ১৯৯২]
