আবহাওয়া অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম মহানগরীর আমবাগান এলাকায় স্থাপন করা বৃষ্টিমাপক যন্ত্রটি গতকাল শুক্রবার সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত তিন ঘণ্টায় ৫৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। আর এ বৃষ্টিতেই নগরীর অর্ধেকটা পানিতে তলিয়ে গেছে।
জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পেতে সরকারের পক্ষ থেকে চারটি প্রকল্পে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এসব প্রকল্পের ফল প্রায় শূন্য।
জলাবদ্ধতা নিরসনে ২০১৬ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) ৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প অনুমোদন হয়। প্রকল্পটি ২০২০ সালে শেষ হওয়ার কথা ছিল। চট্টগ্রাম মহানগরীর ৩৬টি খাল সংস্কার ও সম্প্রসারণের আওতায় নগরীকে জলাবদ্ধতা মুক্ত করতে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) প্রকল্পটি নিলেও এখনো প্রকল্পের কাজ শেষ করতে পারেনি। ২০১৭ সাল থেকে প্রকল্পের কাজ শুরু হলেও বর্তমানে প্রকল্পের বাজেট বেড়ে ৯ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা হয়েছে। তারপরও বৃষ্টিতে ডুবছে চট্টগ্রাম।
গতকালের বৃষ্টিতে নগরীর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রেয়াজউদ্দিন বাজার, তামামকুমুন্ডি লেন, গোলাম রসুল মার্কেট এলাকায় সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ হয়েছে। এ ছাড়া চকবাজার, মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, বাকলিয়া, চান্দগাঁও প্রভৃতি এলাকার অলিগলি ও রাস্তাঘাটে পানি হাঁটু থেকে কোমরসমান পানিতে তলিয়ে দুর্ভোগ বাড়িয়েছে বহুগুণ। কিন্তু এত প্রকল্প হচ্ছে, সুফল পাওয়া যাচ্ছে না কেন?
নগরীতে জলাবদ্ধতা নিরসনে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বহদ্দারহাট থেকে বারৈয়পাড়া পর্যন্ত ১ হাজার ২৫৬ কোটি টাকায় একটি নতুন খাল খননের প্রকল্পর অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে এর অগ্রগতি প্রায় শূন্য। অন্যদিকে সিডিএর ৯ হাজার ৬২৬ কোটির প্রকল্পের আওতায় পাঁচটি স্লুইসগেট, ২ হাজার ৩১০ কোটি টাকায় চাক্তাই থেকে কালুরঘাট সেতু পর্যন্ত উপকূলীয় বেড়িবাঁধ ও স্লুইসগেট নির্মাণের একটি প্রকল্প রয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় ১২টি স্লুসগেট বসছে। এ ছাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের আরেক প্রকল্পের আওতায় ১ হাজার ৬২০ কোটি টাকায় কর্ণফুলীর মোহনা থেকে উজানে মদুনাঘাট পর্যন্ত ২৩টি স্লুইসগেট রয়েছে। সব মিলিয়ে ৪০টি স্লুইসগেটে নগরীর খালগুলো বন্ধ হওয়ার কথা। কিন্তু মেগা প্রকল্পের স্লুইসগেটগুলোর বাইরে সিডিএর আরেক প্রকল্পের আওতায় চাক্তাই খালের স্লুইসগেটটি চালু হয়েছে। আর এর সুফলও পাওয়া যাচ্ছে। গতকালের বৃষ্টিতে মহেশখালের ওপর থাকা স্লুইসগেটের কারণে আগ্রাবাদ সিডিএ আবাসিক এলাকা, হালিশহরসহ নগরীর পশ্চিমের বিশাল একটি এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা যায়নি। কিন্তু মধ্য ও পূর্বের এলাকাটি ঠিকই জলাবদ্ধতার শিকার হলো।
জলাবদ্ধতা নিরসনে মেগা প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে সেনাবাহিনী। এ বিষয়ে সেনাবাহিনীর প্রকল্প পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. শাহ আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘স্লুইসগেট যেসব এলাকায় লাগানো হয়েছে সেসব এলাকায় জোয়ারের পানি প্রবেশ করতে পারেনি। আর যেসব এলাকায় এখনো হয়নি সেসব এলাকায় পানি জমেছে। তাই সব স্লুইসগেট লাগানোর কাজ শেষ করতে হবে।’
প্রায় চার ঘণ্টা জলমগ্ন কেন?
বৃহস্পতিবার রাত থেকে থেমে থেমে বৃষ্টি হলেও গতকাল সকাল ৬টা থেকে ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। গতকাল বেলা ৩টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় নগরীর আমবাগান কেন্দ্র ১২৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে। এর মধ্যে সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত তিন ঘণ্টায় হয়েছে ৫৫ মিলিমিটার। কম সময়ে বেশি বৃষ্টিপাতের পাশাপাশি গত কয়েক দিন ধরে পূর্ণিমার প্রভাবের কারণে সাগরের পানি জোয়ারের সময় ১৪ ফুট পর্যন্ত বাড়ছে। এ বিষয়ে লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. শাহ আলী বলেন, ‘জোয়ারের কারণে আমাদের খালগুলো পানিতে পরিপূর্ণ ছিল। তাই বৃষ্টির পানি নামতে পারেনি। যথারীতি দীর্ঘ সময় (সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা) জলমগ্ন ছিল প্রায় অর্ধেক নগরী।’
সিডিএ সিটি করপোরেশন যা বলছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম মানিক বলেন, ‘জলাবদ্ধতা নিরসনে কাজ করছে সিডিএ। এখন তারা যেদিন এ কাজ থেকে আমাদের মুক্তি দেয় সেদিন জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পাব।’
এ বিষয়ে সিডিএর প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস বলেন, ‘সিটি করপোরেশন তাদের একটি খাল খনন প্রকল্প ছিল। এটি বাস্তবায়ন করতে পারলে জলাবদ্ধতা থেকে নগরবাসী কিছুটা হলেও মুক্তি পেত।’
কিন্তু আপনাদের প্রকল্পের সীমাবদ্ধতা কোথায়? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘জলাবদ্ধতা প্রকল্পের আওতায় ভূমি অধিগ্রহণের জন্য অর্থ বরাদ্দ না দিলে খালগুলো সম্প্রসারণ করা যাবে না। আর তা করা যায়নি বলে চাক্তাই ও বাকলিয়া অংশে পানি দ্রুত নামতে পারছে না এবং জলাবদ্ধতার শিকার হচ্ছে।’
নগরীতে বৃষ্টিপাত প্রসঙ্গে আবহাওয়া অধিদপ্তরের পতেঙ্গা কার্যালয়ের সহকারী আবহাওয়াবিদ সুমন সাহা বলেন, ‘মৌসুমি বায়ু সক্রিয়তার কারণে নগরীতে বৃষ্টি হচ্ছে। তা আরও কয়েক দিন অব্যাহত থাকবে।’
টাইগারপাসে ধসে পড়ল পাহাড়
এদিকে টানা বর্ষণে নগরীর সিডিএ অ্যাভিনিউ সড়কের টাইগারপাস ও লালখান বাজারের মধ্যবর্তী স্থানের পাহাড়ের একাংশ ধসে পড়ে গতকাল সকালে। এ সময় একটি মাইক্রোবাসের ওপর মাটিগুলো এসে চাপা দিলেও বড় ধরনের কোনো ক্ষতি হয়নি। ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে এসে উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করে এবং রাস্তা থেকে মাটি সরিয়ে নেয়।
উল্লেখ্য, চট্টগ্রামে বৃষ্টি ও জোয়ারের সময় একই হলে জলাবদ্ধতা দুর্ভোগ বেশি হয়ে থাকে। প্রতি বছরই এ দুর্ভোগের মুখোমুখি হয় নগরবাসী।
