ভারতীয় একদল হ্যাকার ১৫ আগস্ট সামনে রেখে বাংলাদেশে বড় ধরনের সাইবার হামলার হুমকি দিয়েছে। গত শুক্রবার বাংলাদেশ সরকারের কম্পিউটার ইনসিডেন্ট রেসপন্স টিম বা কেন্দ্রীয় সার্ট থেকে সাইবার নিরাপত্তার বিষয়ে সতর্কতা জারির পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাইবার সিকিউরিটি ইউনিট থেকে ব্যাংকগুলোকে সতর্ক করা হয়েছে। পাশাপাশি সাইবার হামলা নিয়ে সতর্ক অবস্থানে আছে পুলিশও।
রাষ্ট্রের অর্থায়নে চলা বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাইবার হামলার পরই ব্যাংকগুলোকে সাইবার নিরাপত্তা বাড়াতে মৌখিক নির্দেশনা দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। সেই আলোকে সম্ভাব্য সাইবার হামলা থেকে সুরক্ষিত থাকতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। গত শুক্রবার কেন্দ্রীয় সার্ট থেকে সতর্কতা জারির পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাইবার সিকিউরিটি ইউনিট থেকে পুনরায় ব্যাংকগুলোকে সতর্ক করা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ সব ব্যাংকেই সাইবার রেসপন্স টিম রয়েছে। তারা সার্বক্ষণিক ডেটা সুরক্ষার কাজে নিয়োজিত রয়েছে। সেই সঙ্গে পুলিশের তথ্যভা-ার সুরক্ষায় কাজ করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সাইবার ইউনিট, ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম ইউনিটসহ অন্যান্য ইউনিট।
এদিকে আইটি খাত শক্তিশালী করছে ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। বেসরকারি খাতের এনসিসি ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে সাইবার সতর্কতা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছি। আমরা আমাদের কর্মীদের সতর্ক করতে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। কোনো কোনো সময় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বিভিন্ন চমকপ্রদ অফার দিয়ে মেইল দেওয়া হচ্ছে। তাদের মধ্যে যারা ওই সব মেইল ওপেন করছেন, তাদের চিহ্নিত করে প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হচ্ছে।’
তথ্য বলছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওয়েব পেজে আলাদা একটি অপশন খোলা হয়েছে সাইবার সিকিউরিটি অ্যালার্ট নামে। এতে সাইবার বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংযোজন করা হচ্ছে, যা থেকে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রয়োজনীয় তথ্য নিয়ে নিজেদের সিস্টেম হালনাগাদ করতে পারে।
সূত্র জানায়, যেসব ব্যাংকের ওয়েব পেজের সঙ্গে ব্যাংকের গ্রাহকদের হিসাবের তথ্য-উপাত্ত সংযোজন করা আছে এবং গ্রাহকরা ওয়েব পেজের মাধ্যমে নিজস্ব ইউজার নেম ও পাসওয়ার্ড দিয়ে প্রবেশ করে অনলাইনে লেনদেন করতে পারেন, ওই সব ব্যাংককে এখন বেশি সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
বিদেশি সিটি ব্যাংক এনএ, দেশের বেসরকারি খাতের ব্যাংক এশিয়া, ইস্টার্ন ব্যাংক, সিটি ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংকের ওয়েব পেজে গ্রাহকরা প্রবেশ করে লেনদেন করতে পারেন। এমন ব্যাংকগুলোর ওয়েব পেজে কারা প্রবেশ করেন, কতক্ষণ অবস্থান করছেন, কী করছেন প্রভৃতি সার্বক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করতে বলা হয়েছে সার্ট থেকে। এতে নতুন কেউ প্রবেশ করছেন কি না, তাও নিবিড়ভাবে দেখতে বলা হয়েছে।
এ ছাড়া ব্যাংকগুলো তাদের সব শাখা ও এটিএম বুথকে সতর্ক করেছে। ফলে এখন অনলাইন লেনদেন ও এটিএম বুথেও বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সরকারের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা থেকেও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী মুরশেদুল কবীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক ও কম্পিউটার কাউন্সিল থেকে আমাদের সতর্ক করা হয়েছে। সেই আলোকে আমরা সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছি। আমরা সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছি। আর কখনো আমরা সাইবার হামলার শিকার হইনি। আশা করি এবারও সমস্যা হবে না। ব্যাংকগুলো ইতিমধ্যে এসব কাজ শুরু করেছে। শনিবার ছুটির দিনেও অনেক ব্যাংকের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের কর্মকর্তারা সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে কাজ করেছেন।’
সাইবার হামলা নিয়ে সতর্ক অবস্থানে আছে পুলিশও। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ফরেনসিক ল্যাবসহ বিভিন্ন ইউনিটের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যভা-ার। এসব তথ্যভা-ার সাইবার হামলা থেকে রক্ষায় কাজ করছে সিআইডির সাইবার ইউনিট। জানতে চাইলে সিআইডি সাইবার ইউনিটের অতিরিক্ত ডিআইজি সৈয়দা জান্নাত আরা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা বিষয়টি নিয়ে কাজ করছি, আমাদের সব ইউনিটকে সতর্ক করেছি। যেখানেই আমাদের ডেটা আছে, সেগুলোর বিষয়ে সতর্ক আছি।’ ঝুঁকির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ঝুঁকি তো সব সময়ই থাকে। প্রযুক্তিতে শেষ বলে কোনো কথা নেই। আমি ঝুঁকিমুক্ত, প্রেশার অনুভব করছি নাÑ এ কথা কেউ কখনোই বলতে পারবে না।’
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্যভা-ার সুরক্ষায় কাজ করছে গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। ডিজিটাল ল্যাবসহ ডিএমপির সব তথ্যভা-ার সুরক্ষায় ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (দক্ষিণ) বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ ইকবাল হোসাইন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাইবার হামলার হুমকির বিষয়ে আমরা সবাই সতর্ক আছি। ডিবির সাইবার ল্যাবসহ ডিএমপির নিজস্ব যত তথ্যভা-ার আছে, সেগুলো আমরা সুরক্ষিত রাখার চেষ্টা করি। এ বিষয়ে আমাদের ল্যাবেও কাজ চলছে। আশা করি কোনো ধরনের সমস্যা হবে না।’ কোনো ধরনের দুর্বলতা পেয়েছেন কি নাÑ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের সাইটগুলোতে এখন পর্যন্ত কোনো দুর্বলতা ধরা পড়েনি।’
হ্যাকারদের বিষয়ে ইকবাল হোসাইন বলেন, ‘হ্যাকারদের বিষয়ে আমাদের কাছে যত তথ্য আছে, আমরা সেগুলো নিয়ে কাজ করছি।’
কম্পিউটার ইনসিডেন্ট রেসপন্স টিম বা সার্ট এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, ‘হ্যাকটিভিস্ট’ নামের ওই হ্যাকার গ্রুপটি ধর্মীয় উগ্রবাদে উদ্বুদ্ধ এবং তারাই ‘সাইবার হামলার ঝড় বইয়ে দেওয়ার হুমকি’ দিয়েছে। ওই হ্যাকার দলটি মূলত বাংলাদেশ ও পাকিস্তানকে উদ্দেশ্য করে এ হুমকি দিয়েছে।
উল্লেখ্য, ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের দিনটিতে বাংলাদেশে জাতীয় শোক দিবস হিসেবে পালন করা হয়। আবার দিনটি ভারতের স্বাধীনতা দিবস। তবে হ্যাকাররা এসব প্রসঙ্গ তাদের হুমকিসংবলিত বার্তাগুলোতে উল্লেখ করেনি বলে জানিয়েছে সার্ট।
