নিষেধাজ্ঞা মানেনি বাল্কহেড

আপডেট : ০৭ আগস্ট ২০২৩, ০২:০৬ এএম

মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ের খিদিরপাড়া ইউনিয়নের ডহরী তালতলা খালে গত শনিবার রাতে বালুবাহী নৌযানের (বাল্কহেড) ধাক্কায় ট্রলারডুবিতে গতকাল রবিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত সাতজনের লাশ উদ্ধার হয়েছে। তবে প্রশাসন বলছে, এই নৌপথে বাল্কহেড চলাচলে ছিল নিষেধাজ্ঞা। ডুবে যাওয়া ট্রলারটি গতকাল বেলা পৌনে ১২টার দিকে ক্রেন দিয়ে টেনে ওপরে তোলা হয়। ট্রলারডুবিতে এখনো তিনজন নিখোঁজ রয়েছে বলে জানিয়েছেন তাদের স্বজনরা।

এদিকে ট্রলারডুবির ঘটনায় মামলা হয়েছে। নিহত দুই তরুণী হ্যাপি আক্তার ও পপি আক্তারের ভাই রুবেল বাদী হয়ে গতকাল দুপুরে বাল্কহেডটির মালিক ও চালকের বিরুদ্ধে লৌহজং থানায় মামলা করেন। এ ছাড়া ঘটনা তদন্তে কমিটি গঠন করেছেন মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক। জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক শারমিন আরাকে প্রধান করে গঠিত পাঁচ সদস্যের এই কমিটি গতকাল সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে।

পরিদর্শন শেষে কমিটির সদস্যরা বলেন, মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনায় এখনো তিনজন নিখোঁজ রয়েছেন। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বালু বহনকারী বাল্কহেড চলাচলের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এ ছাড়া ট্রলারডুবির ঘটনায় তদন্তসাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ বিষয়ে থানায় মামলা হয়েছে। জব্দ করা বাল্কহেডটি পুলিশের হেফাজতে রয়েছে।

লৌহজং ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার আব্দুল মতিন জানান, গত শনিবার রাত ২টা পর্যন্ত তাদের উদ্ধার অভিযান চলমান ছিল। পরে কিছু সময় বন্ধ রেখে গতকাল ভোর থেকে আবার উদ্ধার তৎপরতা শুরু হয়। বেলা পৌনে ১২টার দিকে ট্রলারটি উদ্ধার করা হয়। তবে তাতে নিখোঁজ থাকা কারও সন্ধান পাওয়া যায়নি।

তিনি আরও জানান, শনিবার রাতে সাতজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তারা সবাই সিরাজদিখান উপজেলার লতব্দী ইউনিয়নের বাসিন্দা। তবে শনিবার রাতে ফায়ার সার্ভিস আটজনের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছিল। নিখোঁজের সংখ্যা বলেছিল পাঁচজন। পরে তারা সংশোধন করে নিহত সাত এবং নিখোঁজ তিনজন বলে জানায়।

লৌহজং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ডা. মো. আব্দুল আউয়াল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে খালটি দিয়ে বালু বহনকারী বাল্কহেড চলাচল করেছে। আমরা গত বছর বালিগাঁও ব্রিজের নিচে বাঁশ দিয়ে ব্যারিকেড দিয়েছিলাম। নিষিদ্ধ করা হয়েছিল এসব নৌযান চলাচল।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা কঠোর নজরদারি রাখব, সেই সঙ্গে যদি কেউ এ নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে খালটি দিয়ে বালু বহনকারী বাল্কহেড চালায়, তাহলে তাদের শাস্তির আওতায় নিয়ে আসব।’

লৌহজং থানার ওসি খন্দকার ঈমাম হোসেন জানান, নিহত দুই তরুণীর ভাইয়ের করা মামলায় পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ চলমান রয়েছে।

কাঁদছে লতব্দীবাসী : মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার লতব্দী ইউনিয়নের খিদিরপুর ও লতব্দী গ্রামের কয়েকটি পরিবারের ৪৬ জন সদস্য ট্রলারে করে পদ্মা সেতু দেখার জন্য পিকনিকে বের হন শনিবার। লৌহজংয়ের মাওয়ায় পদ্মা সেতু স্বচক্ষে দেখার পর ওই দিন রাতে ফিরছিলেন নিজ নিজ বাড়িতে। পদ্মা সেতু দেখার আনন্দে মাতোয়ারা পরিবারগুলোর নারী, পুরুষ ও শিশুদের সেই আনন্দ মুহূর্তেই পরিণত হয়েছে বিষাদে। উত্তাল পদ্মা পেরিয়ে বাড়ি ফেরার পথে ডহরী খালে বালুবাহী বাল্কহেডের ধাক্কায় পিকনিকের সেই ট্রলার ডুবে নারী ও শিশুসহ সাতজনের সলিলসমাধি হয়েছে। এ ঘটনায় লতব্দী ইউনিয়নের লতব্দী ও খিদিরপুর গ্রামের ঘরে ঘরে চলছে কান্নার রোল। প্রিয়জন হারানোর বেদনায় যেন ভারী হয়ে উঠেছে লতব্দীর আকাশ-বাতাস। ট্রলারডুবিতে খিদিরপুর গ্রামের দুই বোন পপি আক্তার ও হ্যাপি আক্তার এবং হ্যাপি আক্তারের দুই ছেলে সাকিবুল (১০) ও সাজিবুল (৪) নিহত হয়েছে। ওই গ্রামের আব্দুল হাকিমের মেয়ে ও নাতি তারা। একই পরিবারের ৪ জনের এ বিদায়ে কান্না আর আহাজারিতে বুক ভারী হয়ে উঠেছে স্বজনদের। আব্দুল হাকিম এখন অনেকটা বাকরুদ্ধ। স্ত্রী হ্যাপি ও দুই ছেলে সাকিবুল ও সাজিবুলকে হারিয়ে কথা বলতে গিয়ে কেবলই কান্নায় ভেঙে পড়ছেন রাজমিস্ত্রি মো. জাহাঙ্গীর। স্ত্রী, দুই সন্তান ও স্ত্রীর বড় বোনকে নিয়ে তিনিও গিয়েছিলেন পিকনিকে। পদ্মা সেতু দেখার আনন্দময় সময় কাটানোর পর বাড়ি ফেরার পথে ট্রলারডুবিতে নিজে সাঁতরে তীরে উঠতে পারলেও বেঁচে নেই তার স্ত্রী, দুই সন্তান ও স্ত্রীর বড় বোন। ছেলে সাকিবুল ও সাজিবুল আর স্ত্রী হ্যাপি আক্তারের চিরবিদায়ে এখন কান্নার লোনাজলে ভাসছে জাহাঙ্গীরের দুই চোখ। কিছু বলতে গেলেই কেঁদে ওঠেন, যেন অধিক শোকে পাথর হয়ে গেছেন তিনি।

লতব্দী ইউনিয়নের অন্য নিহতরা হচ্ছে লতব্দী গ্রামের মো. শাজাহানের স্ত্রী মোকছেদা বেগম (৪০), খিদিরপুর গ্রামের শাহাদাত হোসেনের মেয়ে রোজা মনি (৪ মাস) ও ফিরোজ সরকারের ছেলে ফারিয়ান (৮)। 

স্বজনদের দাবি, ট্রলারডুবির ঘটনায় এখনো ৩ জন নিখোঁজ রয়েছে। নিখোঁজ ৩ জনই শিশু। মামা আরিফ খান মাহিন, নাফা ও তুরান নামে ৩ শিশুর নিখোঁজের তথ্য জানান।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত