দেশব্যাপী ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে। বিশেষ করে, এই ঢাকা শহরেই প্রতিদিন গড়ে আক্রান্ত হচ্ছেন ১০০০ রোগী। আর দেশব্যাপী প্রতিদিন, সরকারি হিসাবে আক্রান্ত হচ্ছে প্রায় ২৫০০ রোগী। এই রোগে দেশব্যাপী মৃত্যু হচ্ছে গড়ে ১০ জনের। তারা প্রত্যেকেই ভর্তি হচ্ছেন, সরকারি বা বেসরকারি হাসপাতালে। কিন্তু দেশের সাধারণ মানুষের সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ছাড়া উপায় নেই। বেসরকারি হাসপাতালে প্রতিদিন হাসপাতালের খরচ এবং ওষুধের খরচ পরিশোধের সামর্থ্য সাধারণ মানুষের নেই। ডেঙ্গু রোগের প্রাথমিক এবং জরুরি চিকিৎসা হচ্ছে, স্যালাইন। নিয়মিতভাবে একজন রোগীকে স্যালাইন দিতে হয়। সিজনাল এই রোগের প্রিভেনটিভ ব্যবস্থা হিসেবে থাকার কথা ছিল স্যালাইনের। বিশেষ করে, সরকারি হাসপাতালগুলোতে। সেখানেও দেখা দিয়েছে সংকট। এর কারণও রয়েছে। সরকারি পর্যায়ে স্যালাইন উৎপাদন বন্ধ থাকায় বেসরকারি ওষুধ কোম্পানি থেকে কিনে সরকারি হাসপাতালে সরবরাহ করছে সরকারের ওষুধ কোম্পানি এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেড (ইডিসিএল)। প্রশ্ন হচ্ছে, সরকারি পর্যায়ে স্যালাইন উৎপাদনের সমস্যা কোথায়? নাকি সরকারি পর্যায়ে স্যালাইন উৎপাদন করলে, বেসরকারি ওষুধ কোম্পানির স্যালাইনের কী হবে? সব হাসপাতালে যদি সরকারই স্যালাইন সরবরাহ করে, আমরা কী করব? হতে পারে, এমন সংকটময় পরিস্থিতি তৈরি করে বেসরকারিভাবে আরও চাহিদা বাড়ানো হয়েছে স্যালাইনের। চার বছর ধরে দেশে সরকারি পর্যায়ে স্যালাইন উৎপাদন বন্ধ। এর আগে সরকারি পর্যায়ে রাজধানীর জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে ২২ ধরনের স্যালাইন, ব্লাডব্যাগ ও ট্রান্সফিউশন সেট উৎপাদন করা হতো। এতে বছরে ১ লাখের বেশি ব্লাডব্যাগ তৈরি হতো, যা দেশের মোট চাহিদার ৭ ভাগের ১ ভাগ এবং উৎপাদন করত বিভিন্ন ধরনের ১৪ থেকে ১৭ লাখ ব্যাগ স্যালাইন। কিন্তু ২০১৯ সালের আগস্টে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করে সব ধরনের স্যালাইন উৎপাদন, মজুদ, সরবরাহ ও বিক্রি বন্ধ করে দেয়।
এর ফল কী হলো? এখন খোলাবাজারেও স্যালাইনের সংকট দেখা দিয়েছে। যদিও পাওয়া যাচ্ছে, তাও বেশি দামে বাধ্য হয়ে কিনতে হচ্ছে, রোগীর স্বজনদের। এ ব্যাপারে প্রতিষ্ঠানের এক সাবেক কর্মকর্তা বলেন, গুড ম্যানুফ্যাকচারিং প্র্যাকটিস বা জিএমপি অনুযায়ী মানসম্পন্ন স্যালাইন উৎপাদন হচ্ছে না কারণ দেখিয়ে উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়া হয়। অথচ প্রতিষ্ঠান যত জায়গায় স্যালাইন সরবরাহ করেছে, কোথাও কারও কোনো সমস্যা হয়নি। গত বুধবার দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত ‘চাহিদা ৫ গুণ সরবরাহে হিমশিম’ শিরোনামের সংবাদের মাধ্যমে আরও জানা যাচ্ছে- ইডিসিএলের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে যেখানে সব ধরনের স্যালাইন লেগেছে ৬০ লাখ ব্যাগ, অর্থাৎ মাসে ৫ লাখ ব্যাগ। গত দুই মাসে সেই চাহিদা গিয়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ কোটি ব্যাগ। সে হিসাবে ডেঙ্গুর জন্য স্যালাইনের চাহিদা বেড়ে হয়েছে ১০ গুণ। পরিস্থিতি সামাল দিতে স্যালাইন সরবরাহে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে ঢাকার সরকারি হাসপাতালগুলোকে। রাজধানীর ডেঙ্গু ডেডিকেটেড হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এসব হাসপাতালে আড়াই থেকে সর্বোচ্চ ৫ গুণ পর্যন্ত স্যালাইনের চাহিদা বেড়েছে। তবে এখন পর্যন্ত তাদের স্যালাইন সংকট দেখা দেয়নি। পাশাপাশি ঢাকার বাইরের হাসপাতালগুলোতেও দেড় থেকে তিনগুণ পর্যন্ত স্যালাইনের চাহিদা বেড়েছে।
কিন্তু সমস্যা হয়েছে তাদের, যারা বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। সাধারণত মোট রোগীর ১০ গুণ বেশি রোগী থাকেন বেসরকারি হাসপাতালে। সরকারি হাসপাতালগুলো অধিকাংশ স্যালাইন ক্রয় করার কারণে বেসরকারি হাসপাতালের রোগীরা স্যালাইন সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। কারণ স্বাভাবিকভাবে খোলা দোকানেও, স্বল্পতা দেখা দিয়েছে স্যালাইনের। তবে আশার কথা, আগামী নভেম্বর থেকে গোপালগঞ্জে ইডিসিএলের নতুন প্ল্যান্টে স্যালাইন উৎপাদন শুরু হবে। নিশ্চয়ই আশা করা যায়, তখন আর স্যালাইনের কোনো সংকট দেখা দেবে না। তবে এই উৎপাদনের সময়সীমা আরও এগিয়ে নিয়ে আসতে পারলে, স্যালাইন বিষয়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের দুর্ভোগের পরিমাণ কমত।
