গায়েবি মামলায় পুলিশও বিব্রত

আপডেট : ১০ আগস্ট ২০২৩, ০৫:৫৩ এএম

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক সহিংসতা বেড়ে চলছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষ হচ্ছে। সংঘর্ষের ঘটনায় মামলা হচ্ছে বিএনপি ও তার অঙ্গ সংগঠনের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে দায়ের হওয়া মামলায় আসামি যাদের করা হয়েছে, তাদের মধ্যে কেউ কেউ আছেন দেশের বাইরে। আবার অনেকে মারাও গেছেন। এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বইছে দেশ-বিদেশে। পাশাপাশি এসব কা- নিয়ে পুলিশও বিব্রত। পুলিশ সদর দপ্তর থেকেও একটি বিশেষ বার্তা গেছে পুলিশের সব ইউনিটপ্রধান, রেঞ্জ ডিআইজি ও জেলার এসপিদের কাছে। তাড়াহুড়া বা অতি উৎসাহী হয়ে মামলা না নিতে বলা হয়েছে বার্তায়। এমনকি প্রবাসী ও মৃত ব্যক্তিরা কীভাবে মামলার আসামি হয়েছেন, সে জন্য তদন্ত করতে বলা হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গায়েবি মামলা ও আসামিদের নিয়ে সমালোচনা ওঠায় আমরা বিব্রত। পুলিশ তাড়াহুড়া করে কেন মামলা নিল, সে বিষয়ে তদন্ত করছি। সম্প্রতি পুলিশের ইউনিটপ্রধান, রেঞ্জ ডিআইজি ও জেলার এসপিদের কাছে এর ব্যাখা চাওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের কোনো ঘটনা না ঘটে সেদিকে বিশেষ নজর দিতে বলা হয়েছে। তাড়াহুড়া বা অতি উৎসাহী মামলা নেওয়া যাবে না। যারা গায়েবি আসামি ও মামলা করেছে, তাদের বিষয়েও খোঁজ নেওয়া হবে। তবে আন্দোলনের নামে সরকারবিরোধীরা কোনো বিশৃঙ্খলা করলে অবশ্যই কঠোরভাবে মোকাবিলা করা হবে। সামনের দিনগুলোতে রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেবে তা আমরা নিশ্চিত।’

আইজিপি বৈঠকে বলেছেন, দেশের শান্ত পরিবেশ যাতে কেউ অশান্ত করতে না পারে, সে জন্য সবাইকে সতর্ক থাকতে বলেছেন; বিশেষ করে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তদের এলাকাভিত্তিক তালিকা করে তাদের শক্তভাবে মোকাবিলা করতে হবে। হুটহাট করে পুলিশকে গুলি করতে বারণ করা হয়েছে। যেখানে লাঠিচার্জ করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে, সেখানে গুলি করা যাবে না। তবে গুলি বা টিয়ারসেল নিক্ষেপ করলে অবশ্যই ঊর্ধ্বতনদের অনুমতি নিয়ে তা ব্যবহার করতে হবে।

পুলিশ সূত্র জানায়, মামলাগুলোর মধ্যে চট্টগ্রামের কয়েকটি মামলা নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়েছে। এর মধ্যে চন্দনাইশ থানায় যুবলীগের এক নেতার দায়ের হওয়া মামলায় বলা হয়েছে, ২৭ জুলাই বিএনপির শতাধিক নেতা যুবলীগের নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা চালায়। এতে বেশ কয়েকজন আহত হন। এ ঘটনায় চন্দনাইশ উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মঞ্জুর মোর্শেদ চৌধুরী ও সাইফুল করিমসহ অন্তত ১২০ জনকে আসামি করা হয়। মোর্শেদ চৌধুরী ও সাইফুল করিম ঘটনার সময় হজে ছিলেন। এই তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি আলোচনায় আসে পুলিশের বৈঠকে। পুলিশের একটি ইউনিট গোপনে তদন্ত করে সত্যতা পেলে পুলিশ সদর দপ্তরকে অবহিত করে। তারা প্রায় ৩৫ দিনের মতো সৌদি আরব ছিলেন। তারা হজ শেষে দেশে আসেন ৩০ জুলাই। পুলিশের ওই ইউনিটটি তদন্ত করে আরেকটি মামলার বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছে ২৭ জুলাই চট্টগ্রামের হাটহাজারী থানায় একটি মামলা করেন ছাত্রলীগ নেতা আয়মান আওসাফ চৌধুরী। মামলায় বিএনপির ও অঙ্গসংগঠনের ১২১ জনকে আসামি করা হয়। এর মধ্যে বিএনপির সদস্য সচিব গিয়াস উদ্দিন ঘটনার সময় ঢাকায় ছিলেন। অথচ তাকে বলা হয়েছে, ২৬ জুলাই হাটজাহারী এলাকায় নাশকতা করেছেন। গত ৩০ ডিসেম্বর পুরান ঢাকার বানিয়ানগর এলাকায় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা চালায় বিএনপি। এ ঘটনায় আওয়ামী লীগ নেতা খায়ের উদ্দিন বাদী হয়ে সূত্রাপুর থানায় বিস্ফোরক আইনে মামলা করেন। এজাহারে আসামি করা হয় বিএনপির কয়েকজন নেতাকে। তারা ঘটনার সময় দেশের বাইরে ছিলেন। তিন মাস আগে জয়পুরহাটে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সংঘর্ষের সময় নাশকতা চালায় বিএনপি। এ ঘটনায় সদর থানায় মামলায় স্থানীয় বিএনপি নেতাদের আসামি করা হয়। কিন্তু গোয়েন্দারা তদন্ত করে অনেকটা নিশ্চিত করে ঘটনার সময় এলাকায় কোনো সংঘর্ষ হয়নি। গত ২৩ মে রাজধানীর শ্যামপুরে আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের অর্ধশত নেতা-কর্মীর ওপর হামলা চালায় বিএনপি। এ ঘটনায় থানায় মামলা হলেও তদন্তে নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ ওই সময় কোনো হামলার ঘটনা ঘটেনি। মাস দুয়েক আগে নোয়াখালীতে একটি মামলায় বিএনপি নেতা ফকরুল ইসলাম ফারুকসহ ৯৩ নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। আসামিরা উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়েছেন। তবে আসামিরা অভিযোগ করেছেন, দায়ের হওয়া মামলার মধ্যে অন্যতম আসামি নিজাম উদ্দিন দিপু মারা গেছেন। মৃত অবস্থায় তিনি নাশকতা করেছেন। সংঘর্ষে জড়িত ছিলেন। ২০১৮ সালের ২০ আগস্ট তিনি মারা গেছেন বলে নেতারা দাবি করেন।

জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, আসলে গায়েবি মামলা হচ্ছে কি না, সেই বিষয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। আর তদন্তে এ ধরনের ঘটনার সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে যারা নাশকতা ও বিশৃঙ্খলার সঙ্গে জড়িত থাকবে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।

একই কথা বলেছেন কয়েকটি জেলার পুলিশ সুপার। তারা দেশ রূপান্তকে বলেন, অতি উৎসাহী কিছু পুলিশ কর্মকর্তা এসব মামলা নিয়ে পুরো বাহিনীর বদনাম করছে। তাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। আর না হয় এ ধরনের ঘটনা ঘটতেই থাকবে। সামনের দিনগুলোতে রাজনৈতিক অস্থিরতা আরও বাড়বে। রাজনৈতিক মামলা নিয়ে যাতে কোনো সমালোচনা না হয়, সেদিকে বিশেষ নজর দিতে বলা হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে পুলিশ সুপাররা আরও জানান, যেসব গায়েবি মামলা ও আসামি আছে, সেগুলোর বিষয়ে তদন্ত হচ্ছে। মামলার কোনো বাদীর ইচ্ছে করে এসব কা- করার প্রমাণ মিললে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ নিয়েও তারা কাজ করছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত