গত এক যুগ ধরে বরিশালের জলাবদ্ধতা নিরসনে কোনো উদ্যোগ নেই। সাবেক মেয়র শওকত হোসেন হিরনের সময়ে নগরীতে কিছু ড্রেন স্থাপন করা হয়। সেগুলো রক্ষণাবেক্ষণ করতে পরবর্তী সময়ে সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব গ্রহণকারীদের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। স্থাপন হয় না নতুন কোনো ড্রেন। পুনঃখনন হয়নি খালগুলো। নগরীর মধ্যে যে কয়টি এলাকায় ড্রেন ব্যবস্থা রয়েছে তাও নদী ও খালের নিচের স্তরে হওয়ায় জোয়ার আর বৃষ্টি হলেই পানিতে প্লাবিত হয় পুরো নগরী। ২০২০ সালে ৪২টি খাল পুনরুদ্ধার এবং সৌন্দর্যবর্ধনসহ আনুষঙ্গিক উন্নয়নে ২ হাজার ৬৫০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠায় সিটি করপোরেশন। কিন্তু এর অনুমোদন মেলেনি। এতে গত ৫ থেকে ৭ আগস্ট একটানা বৃষ্টিতে বরিশালে ব্যাপক জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। পরের দুদিন বৃষ্টি কম হলেও নগরীতে জলাবদ্ধতা এখনো রয়ে গেছে।
বরিশাল পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, বরিশালে গত বছর ২৪ আগস্টের ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ে যে জলাবদ্ধতা হয়েছিল, ঠিক আবারও সেই দুর্ভোগে পড়েছে বরিশাল নগরবাসী। অথচ সিত্রাংয়ের সময় বরিশাল কীর্তনখোলা নদীর পানি জোয়ারের সময় বিপদসীমার সর্বোচ্চ ৩৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছিল। এদিন সকাল ৯টা থেকে পরদিন সকাল ৯টা পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হয়েছিল ২৪১ মিলিমিটার। কিন্তু এবার ৭ আগস্ট কীর্তনখোলা নদীর পানি জোয়ারের সময় বিপদসীমার ২৮ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছিল। আর ৭ আগস্ট সকাল ৯টা থেকে ৮ আগস্ট সকাল ৯টা পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হয়েছিল ১৭৭ মিলিমিটার। কিন্তু তারপরও জলাবদ্ধতা থেকে রেহাই পায়নি নগরবাসী।
বরিশাল পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. মাসুম বলেন, ‘বরিশালের নদনদীর নাব্য কমে যাওয়ায় জল ধারণক্ষমতাও স্বাভাবিকভাবে দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। এ ছাড়া নগরীর এলাকার মধ্যে যেসব ছোট নদী বা খাল রয়েছে সেগুলো বিভিন্ন জটিলতার কারণে এখন পর্যন্ত খননকাজ শুরু করা যায়নি। নগরবাসীকে জলাবদ্ধতার মধ্য থেকে রেহাই দিতে দরকার হলে ‘জলাধার’ উপায় গ্রহণ করা যেতে পারে। প্রয়োজনে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি অধিগ্রহণ করে জলাধার সৃষ্টি করা যেতে পারে। কিন্তু বর্তমানে বরিশালে ব্যক্তিমালিকানাধীন জলাধারগুলোও গণহারে ভরাট হচ্ছে। পাশাপাশি খোদ সরকারি প্রতিষ্ঠানও জলাধার ভরাট করে অবকাঠামো নির্মাণে পিছিয়ে নেই। ছোট নদী-খাল পুনঃখনন না করায় বরিশালের অধিকাংশ নদনদীর নাব্য কমে গেছে। এ ছাড়া নগরীর ময়লাগুলো নির্দিষ্ট স্থানে সরানো হলেও আশপাশের এলাকার খালগুলো ময়লা-আবর্জনা ফেলে ভরাট করে ফেলা হচ্ছে। এতে প্রবাহমান লিংক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আগামীতে এ কারণগুলো যদি আরও বৃদ্ধি পায় তবে বরিশালে ২০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাতেই ভয়াবহ জলাবদ্ধতা দেখা দিতে পারে। তাই এখনই এ বিষয়ে সমন্বিত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।’
বরিশালের ‘নদী খাল বাঁচাও’ আন্দোলন কমিটির সাবেক সদস্য সচিব কাজী এনায়েত হোসেন শিবলু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগে খালকেন্দ্রিক যোগাযোগব্যবস্থা ছিল। কিন্তু সামাজিক শক্তিকে হারিয়ে ফেলার কারণে বর্তমানে খালগুলোকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। তবে শহরের মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী খালগুলোকে চ্যানেলিং করার পরিকল্পনা চলছে। এ ক্ষেত্রে খালগুলোতে আবর্জনা ফেলা বন্ধ করা প্রয়োজন। জলাধার এবং খালগুলোকে পরিচ্ছন্ন রাখতে সবার মধ্যে দায়িত্ববোধ সৃষ্টি করতে হবে।’
বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ ফারুক হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বর্তমানে বিভিন্ন খালে আবর্জনা জমে নগরীতে যে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে তা নিরসনের জন্য পরিকল্পনা চলছে। গত চার বছর ধরে একটা প্রকল্পে ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে ৪২টি খাল খননের কথা চলছিল।
কিন্তু এখনো সেটি অনুমোদন পায়নি। আজকেও মন্ত্রণালয়কে ফোন করা হয়েছে। আশা করি শিগগিরই অনুমোদন মিলবে।’ তবে বর্তমানে যে খালগুলোতে ময়লা-আবর্জনায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে সেগুলো পরিষ্কার করার জন্য আলোচনা চলছে।
বরিশাল আবহাওয়া অফিসের উচ্চপর্যবেক্ষক মাসুদ রানা রুবেল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বুধবার গত ২৪ ঘণ্টায় বেলা ৩টা পর্যন্ত বরিশালে ২১.২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আর আগস্ট মাস জুড়ে বরিশাল বিভাগে বৃষ্টি থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।’
এদিকে অপরিকল্পিত নগর উন্নয়ন ও জলাবদ্ধতা দূর করার জন্য কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা না নিলে নগরবাসী ক্ষিপ্ত হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে। এদিকে গতকাল বেলা ১১টায় সরকারি ব্রজমোহন কলেজ জীবনানন্দ দাশ মুক্ত মঞ্চের সামনে হাঁটুসমান পানিতে দাঁড়িয়ে ক্যাম্পাসে জলাবদ্ধতা নিরসনের দাবিতে সরকারি ব্রজমোহন কলেজে সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট মানববন্ধন করেছে। মানববন্ধনে উপস্থিত ছিলেন সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট সরকারি ব্রজমোহন কলেজ শাখার সভাপতি হাফিজুর রহমান রাকিব, সাধারণ সম্পাদক বিজন সিকদার, সাংগঠনিক সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ও সদস্য মিনহাজুল ইসলাম ফারহান প্রমুখ।
গতকাল দুপুরে বরিশাল নগরীর বিভিন্ন স্থানে সরেজমিনে দেখা যায়, বরিশাল নগরীতে গত তিন দিন আগে অতি বৃষ্টি হওয়ায় নগরীর অধিকাংশ সড়কগুলোতে এখনো পানি জমে আছে। নগরীর বটতলা থেকে হাতেম আলী কলেজ চৌমাথা সড়ক, বটতলা আদম আলী হাজির গলি, অক্সফোর্ড মিশন রোড, করিম কুটির, কলেজ অ্যাভিনিউ, গোরস্তান রোড, বগুড়া রোড, বিএম স্কুল সড়ক, রূপাতলী হাউজিং, ধান গবেষণা সড়কের খ্রিস্টান কলোনি, পানি উন্নয়ন বোর্ডের ওয়াপদা কলোনি, পার্শ্ববর্তী শেবাচিম হাসপাতালের চতুর্থ শ্রেণি স্টাফ কোয়ার্টার, কালুশাহ সড়ক, কাজিপাড়া এবং কাউনিয়া এলাকার বেশ কিছু সড়কে এখনো পানি জমে আছে। এর মধ্যে বগুড়া রোড, বটতলা, কলেজ অ্যাভিনিউ এবং গোরস্তান রোড এলাকার সড়কগুলোতে হাঁটু পানি রয়েছে। বটতলা দুই লেন সড়কের এক লেনে যানবাহন চললেও অন্য লেনে বেশি পানি জমাট হলে যানবাহন চলাচল করতে পারছেন না। এরপর আবার গতকালও বৃষ্টি হয়েছে। যার ফলে নগরবাসীসহ, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ বাড়ছে। অন্যদিকে বাড়ছে মশার উৎপাত, ছড়াচ্ছে ভয়ংকর ডেঙ্গু। বরিশাল জেলার নিম্নাঞ্চলের অধিকাংশ টিনের ঘর, অর্ধপাকা এবং পাকা ভবনের নিচতলা পানিতে তলিয়ে থাকায় দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছে হাজার হাজার মানুষ।
