প্রবেশপথের দেয়ালে লেখা ‘ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ, এই ভবনে বসবাস করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ’। কিন্তু উপায় কী! বাধ্য হয়েই ‘সিকদার মনোয়ারা’ নামক এ ভবনেই থাকছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হলের প্রায় দেড়শ ছাত্রী। ছাত্রী না ওঠাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং শাখার নির্দেশনা থাকলেও তা না মেনে এ ভবনের জন্য একজন হাউজ টিউটরও নিয়োগ দিয়েছে হল প্রশাসন। শুধু তা নয়, অতিথি ফির নামে নেওয়া হচ্ছে টাকাও।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের হলগুলোর মধ্যে সব থেকে ছোট বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হল। বছরের পর বছর এই হলের শিক্ষার্থীরা সিট সংকটে ভুগছেন। এই হলে অ্যালটমেন্ট পাওয়া শিক্ষার্থীরা তৃতীয় বর্ষের আগে বৈধ সিট পান না। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের তিনটি বছর বাইরে থাকার ব্যবস্থা করতে অপারগ শিক্ষার্থীরা হলের কথিত অতিথি কক্ষে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
বারবার হল প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেও ব্যর্থ হয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামানের শরণাপন্ন হন হলের ছাত্রীরা। আসন সংকট নিরসনে তিনশ ছাত্রীকে অন্য হলে স্থানান্তরের দাবিসহ গতকাল রবিবার তিন দফা দাবিতে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামানকে স্মারকলিপি দিয়েছেন হলের সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
তাদের দাবিগুলো হচ্ছে কুয়েত মৈত্রী হল থেকে অন্তত ৩০০ শিক্ষার্থীকে অন্য হলে এক মাসের মধ্যে স্থানান্তর করা, হলের আসন সংখ্যার সঙ্গে সমন্বয় রেখে শিক্ষার্থী অ্যালটমেন্ট দেওয়া এবং মূল ভবনের প্রতি রুমে ছয়জনের বেশি শিক্ষার্থী বরাদ্দ দিয়ে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট না করা। এসব দাবির সপক্ষে তারা ১০৫ শিক্ষার্থীর স্বাক্ষর সংগ্রহ করেছেন। এ ছাড়া দাবি আদায়ে আজ সোমবার দুপুরে তারা ভিসি চত্বরে অবস্থান কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছেন।
ছাত্রীরা জানান, মৈত্রী হল ছোট হলেও প্রতি বছর অধিক ছাত্রী এখানে অ্যালটমেন্ট দেওয়া হয়। ফলে ছাত্রীদের কেউ অন্যান্য হলে ছয় মাসের মধ্যে বৈধ আসন পেলেও মৈত্রী হলে ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের ছাত্রীরা চতুর্থ বর্ষে উঠেও এখনো আসন পাচ্ছেন না। এর পাশাপাশি ২০২০-২১, ২১-২২, ২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের সবার আসন অনিশ্চিত অবস্থায় আছে। এ অবস্থায় ২০২২-২৩ সেশনকে এই হলে অ্যালটমেন্ট দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ চারটি সেশনের শিক্ষার্থীরা মৈত্রী হলের সিট জটিলতায় তাদের বৈধ সিটের অধিকার হারাতে বসেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চতুর্থ বর্ষের এক শিক্ষার্থী বলেন, আমাদের যাদের থাকার পরিস্থিতি নেই তারা বাধ্য হয়েই এ পরিত্যক্ত, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে থাকতে হয়, তাও টাকার বিনিময়ে। কোনো ধরনের সুযোগ-সুবিধা এখানে নেই। ১৫০ থেকে ২০০ জন এখানে গাদাগাদি করে থাকছেন। অনেকে বাধ্য হয়ে কষ্ট করে বাইরেও থাকছেন। তাছাড়া জগন্নাথ হল ট্র্যাজেডির মতো আরেকটি ট্র্যাজেডির আশঙ্কা রয়েছে এই হল। যেকোনো সময় বড় বিপদ হতে পারে। আমরা এই দুরবস্থা থেকে মুক্তি চাই।
হলের আবাসিক ছাত্রী নুসরাত জাহান বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য ছাত্রী হলে শিক্ষার্থীরা প্রথম বর্ষেই বৈধ সিট পান এবং ঢাকায় নিজেদের বসবাসের ব্যবস্থা থাকা শিক্ষার্থীরাও সেখানে বৈধ সিট পান। সেই একই বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত আমাদের হলে বরাদ্দ পাওয়া সহপাঠীরা যাদের হল ছাড়া ঢাকায় বসবাসের সুযোগ নেই তারা তৃতীয় বর্ষের আগে বৈধ সিট পান না, এখন যা চতুর্থ বর্ষে গিয়ে ঠেকেছে। এ ধরনের বৈষম্যমূলক অবস্থার অবসান ঘটাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন যদি সদিচ্ছা করে তবে মৈত্রী হল থেকে শিক্ষার্থীদের একাংশকে অন্য হলে স্থানান্তরিত হওয়ার সুযোগ দিতে পারে এবং ভবিষ্যতে মৈত্রী হলে এর প্রকৃত ধারণক্ষমতা অনুসারেই শিক্ষার্থী অ্যালটমেন্ট দেওয়া জারি রাখতে পারে।
এ বিষয়ে জানতে হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. নাজমুন নাহারকে একাধিকবার ফোন করা হলেও রিসিভ করেননি। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে ছাত্রীদের থাকা ও টাকা নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে কথা বলতে রাজি হননি প্রিন্সিপাল অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অফিসার তৌহিদুর জাহান।
তবে ছাত্রীদের এসব সংকটের সমাধানের আশ্বাস দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। প্রভোস্ট স্ট্যান্ডিং কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. আবদুল বাছির দেশ রূপান্তরকে বলেন, উপাচার্য স্যার বিষয়টি বিশেষভাবে দেখছেন। আশা করি দ্রুত সমাধান হয়ে যাবে। কীভাবে সে হল থেকে শিক্ষার্থী কমানো যায় সে চিন্তা করছি।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমি সরেজমিনে দেখেছি ওখানে জীবনযাত্রার মান কোনোক্রমেই গ্রহণযোগ্য নয়। সুযোগ-সুবিধার অনেক ঘাটতি রয়েছে। ছাত্রীরা যে দাবিগুলো জানিয়েছে সেগুলো খুব জরুরি। তাদের জীবনমান উন্নয়নে আমাদের আন্তরিক প্রয়াস থাকা জরুরি। হল প্রশাসনকেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যাতে দ্রুত তাদের সমস্যাগুলো সমাধান করা যায়।
