হারবাল ওষুধের আড়ালে সক্রিয় অজ্ঞান পার্টি

আপডেট : ১৬ আগস্ট ২০২৩, ০২:০৫ এএম

বিভিন্ন হারবাল ওষুধের আড়ালে রাজধানীতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে অজ্ঞান পার্টি। হকারের বেশ ধরে বাসে উঠে হারবাল ওষুধ বিক্রির নামে যাত্রীদের চেতনানাশক ওষুধ খাইয়ে সর্বস্ব ছিনিয়ে নিচ্ছে। তাদের এই কার্যক্রমের সাংকেতিক নাম রেখেছে ‘রড ব্যবসা’। চেতনানাশক বিভিন্ন ওষুধের অতিরিক্ত প্রয়োগে অনেক ভুক্তভোগী মারাও যাচ্ছেন। রাজধানীতে প্রায়ই এই অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পরে সর্বস্ব হারাচ্ছেন পথচারীরা।

এদের খপ্পরে পড়ে জীবন হারানোদের একজন আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ লিমিটেড কোম্পানির অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এ আর শফিকুল ইসলাম (৫৭)। একই বাসের আরেক যাত্রী আরিফুল ইসলাম আরমান চক্রের ফাঁদে পড়ে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন, পরে সুস্থ হয়েছেন। শফিকুলের কাছে থাকা মানিব্যাগ ও বাড়ি বানানোর টাকা নিয়ে যায় অজ্ঞান পার্টির সদস্যরা। আর আরিফুলের কাছে থাকা ১০ হাজার টাকা নিয়ে যায়।

শফিকুলের ক্লুলেস হত্যার রহস্য উদঘাটন করতে গিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। অজ্ঞান পার্টির সদস্যরা বাসে ওঠার পর সাংকেতিক ভাষা ব্যবহার করে, যা কেবল তারাই বুঝতে পারে। মানুষকে অচেতন করে সর্বস্ব ছিনিয়ে নেওয়ার এ কাজকে তারা নাম দিয়েছে ‘রড ব্যবসা’।

ডিএমপির ডিবিপ্রধান অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শফিকুল হত্যার ঘটনাটি ক্লুলেস ছিল। গোয়েন্দা তেজগাঁও বিভাগ দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে। আরও তিনজনকে শনাক্ত করা গেছে। তাদেরও দ্রুতই গ্রেপ্তার করব। এরা প্রায়ই মানুষকে হারবাল ওষুধের কথা বলে হালুয়ারি রুটির সঙ্গে চেতনানাশক ওষুধ খাইয়ে অজ্ঞান করে সর্বস্ব নিয়ে যায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘বাসের ড্রাইভার ও হেল্পাররা সচেতন না। দূরপাল্লার গাড়িগুলোতে তো হকার উঠতে দেওয়া যায় না। তারা যাতে গেটলক অবস্থায় আসে, সেটা নিশ্চিত করা জরুরি। গাড়ির মধ্যে অবশ্যই সিসিটিভি মনিটরিং থাকতে হবে। অপরিচিত ব্যক্তিদের কাছ থেকে গাড়িতে কিছু খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। ৭ আগস্ট অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়ে অসুস্থ হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান শফিকুল। এ ঘটনায় ডিএমপির তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় শফিকুলের স্ত্রী খালেদা বেগম বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয়ের আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করেন। মামলার এজাহারে উল্লেখ করেন, শফিকুল ইসলাম গাজীপুর টঙ্গী পূর্ব থানাধীন মাদ্রাসা রোড বনমালা গ্রামে বাড়ির নির্মাণকাজ দেখাশোনার জন্য ৭ আগস্ট সকাল ১০টার দিকে রাজধানীর বনানীর বাসা থেকে বের হন। পরে সন্ধ্যায় স্ত্রী খালেদা বেগমকে তার দেবর মোর্শেদ আলম মোবাইল ফোনে জানান, উত্তরা জসীম উদ্্দীন রোডের মোড় থেকে মহাখালী বাস টার্মিনালে আসার পথে শফিকুল অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়ে গুরুতর অসুস্থ হন। পরে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এজাহারে আরও বলা হয়, পরে হাসপাতালের লোকজনের মাধ্যমে খালেদা বেগম জানতে পারেন তার স্বামী রাজিব পরিবহনের গাড়িতে করে উত্তরা জসিম উদ্্দীন রোডের মোড় থেকে বনানীর বাসার উদ্দেশে রওনা দিলে পথে অজ্ঞাতপরিচয় চার -পাঁচজন অজ্ঞানপার্টির সদস্য ওই গাড়ির ভেতরে শফিকুলকে নেশাজাতীয় দ্রব্য খাওয়ানোর কারণে অজ্ঞান হয়ে পড়েন। তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানাধীন মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে ওই বাসের চালকসহ অন্যরা তার স্বামীকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করেন এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। একই ঘটনায় বাসের আরেক যাত্রী আরিফুল ইসলাম আরমান (৪৩) অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়ে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়েছেন।

ডিবি তেজগাঁও বিভাগ তদন্তে নেমে রবিবার বিকেলে গাজীপুর মেট্রোর টঙ্গী পশ্চিম থানা এলাকা থেকে অজ্ঞান পার্টির সদস্য মো. মানিককে (৪২) গ্রেপ্তার করে। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনার সঙ্গে জড়িত অপর আসামি মোজাম্মেল হক মোজাকে (৫৬) একই দিন গাজীপুরের কালিয়াকৈর থানা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে। তারা হত্যার দায় স্বীকার করেছেন।

রাজিব পরিবহন বাসের সুপারভাইজার, হেলপার এবং আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদে ডিবি জানতে পারে, রাজিব পরিবহন বাসটি ঘটনার দিন সকাল সাড়ে ৮টার সময় জামালপুর থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে আসে। বেলা আনুমানিক দেড়টার দিকে টঙ্গীর চেরাগ আলী থেকে ভুক্তভোগী শফিকুল ও আরিফুল ওঠেন। এরপর বাসটি উত্তরা আজমপুর এলে একজন যাত্রী নামার পরে চার-পাঁচজন ওঠে। এ সময় মডার্ন হারবাল নামের যৌনবর্ধক হালুয়া এবং ব্রোশিয়া নামের ভিটামিন ওষুধ যাত্রীদের মধ্যে বিতরণ করেন হকারের বেশধারী অজ্ঞান পার্টির সদস্যরা। বাসের পেছনের সিটে বসা শফিকুল ও আরিফুলকে চেতনানাশক (মাইলাম) ওষুধ দিয়ে তৈরি হালুয়া খাওয়ানোর পর তারা অজ্ঞান হয়ে পড়েন। বাসটি বনানী পৌঁছালে গুলশান ১১ নম্বর রোডের মাথায় পুলিশ বক্সের সামনে বাস থেকে মানিক, মোজাম্মেলসহ তিন-চারজন যাত্রী একসঙ্গে নেমে যায়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত