প্রশাসনকে প্রশাসনিক পদ্ধতিতে চালাতে হবে

আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০২৩, ১১:৫৯ পিএম

স্থানীয় সরকার বিভাগের সাবেক সচিব আবু আলম শহীদ খান। সম্প্রতি গণশুনানির পর এক পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার ও প্রত্যাহার আদেশ ফিরিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে গণশুনানি, প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের মধ্যকার দ্বন্দ্বসহ নানা বিষয়ে তিনি কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সম্পাদকীয় বিভাগের সাঈদ জুবেরী

দেশ রূপান্তর : সম্প্রতি নাটোরে এলাকাবাসী ও স্থানীয় প্রশাসনের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে সেবা না পাওয়ার বিভিন্ন অভিযোগ ওঠে নাটোরের সিংড়া থানার ওসি মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে। ফেসবুক লাইভে রেখে ওসির ওপর প্রতিমন্ত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে ওসিকে প্রত্যাহারের পর পুনর্বহালসহ এই পুরো বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

আবু আলম শহীদ খান : আমাদের যে প্রশাসনিক পদ্ধতি এতে গণশুনানির বিষয়টি  নেই। এটা একটা রাজনৈতিক পদ্ধতি হতে পারে। কিন্তু সেখানে প্রশাসনের লোকজনের উপস্থিত থাকার বাধ্যবাধকতাও নেই এবং এটা না থাকাই বেটার। এখন আপনি রাজনৈতিকভাবে অনেক কিছুই বলতে এবং করতে পারেন। আপনি নেতা হিসেবে এলাকার লোকজনের সঙ্গে কথা বলবেন, তাদের অভাব-অভিযোগ, বক্তব্য শুনবেন এবং সেটা শুনে এলাকার এমপি বা মন্ত্রী হিসেবে যদি কোনো ব্যবস্থা নিতে চান সেটা তিনি যথাযথ কর্তৃপক্ষকে বলতে পারেন। নাটোরের যে গণশুনানির কথা বলছেন, খবরে যেমন দেখলাম সেখানে থানার ওসিসহ অন্য কর্মকর্তারাও ছিলেন। খবরে যতটুকু জানলাম সেখানে ওসির বিরুদ্ধে বেশ কিছু অভিযোগ আসে, এতে প্রতিমন্ত্রী মহোদয় ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে সেখানকার কর্তৃপক্ষ ওই ওসিকে প্রত্যাহার করেছেন। এটা হলো একটা দিক। এ ধরনের ঘটনার পর তাকে প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিতেই পারেন কর্তৃপক্ষ। কিন্তু পরে দেখা গেল পুলিশ অ্যাসোশিয়েশন থেকে এ ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ করা হয়েছে এবং এর মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ওই প্রত্যাহারের আদেশ প্রত্যাহার করা হলো।

প্রথমত হলো গণশুনানি, এটা তো আমাদের প্রশাসনিক পদ্ধতির মধ্যে নেই। দ্বিতীয়ত হলো, যখন অভিযোগের বিষয়টি সামনে এলো তখন তাকে প্রত্যাহার করলেন, বা বদলি করলেন, খুব ভালো কথা। এটা আপনি করতেই পারেন। তৃতীয়ত হলো, আপনি প্রত্যাহার বা বদলি করলেন আবার অ্যাসোশিয়েশনের চাপে সেই আদেশ প্রত্যাহার করলেন। এই তিনটি জিনিসই আমাদের প্রশাসনিক সংস্কৃতির বড় ধরনের দুর্বলতা প্রকাশ করে। এভাবে চলতে পারে না। প্রশাসন সেটা পুলিশ হোক, জুডিশিয়াল হোক, সিভিল প্রশাসন হোক কিংবা সেনাবাহিনী হোক প্রত্যেকের তো একটা নিয়মকানুন আছে। তাদের সেই নিয়মের মধ্য দিয়েই চলতে হবে। সুতরাং এখানে গণশুনানি, বদলি বা প্রত্যাহারের মতো শাস্তি এবং অ্যাসোসিয়েশনের চাপে সেটা বাতিল কোনোটাই সমীচীন হয়নি।

দেশ রূপান্তর : আপনি তো জানেন যে, সাধারণ মানুষের পক্ষে কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছানো নানা কারণে তেমন সহজ নয়। অনেকে জানেন না, কেউ কেউ ভয় পান। এ পরিস্থিতিতে জনপ্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে গণশুনানির আয়োজনের বিষয়টি চালু হয়। এই প্রান্তিক মানুষগুলো তাদের সমস্যা, অভিযোগগুলো তুলে ধরার এবং কর্তৃপক্ষের নজরে আনার একটি সুযোগ পান গণশুনানিতে।

আবু আলম শহীদ খান : সেক্ষেত্রে গণশুনানিকে ফরমাল করেন। এটা তো এখন ফরমাল কোনো পদ্ধতি না। আমাদের এমপি সাহেবদের কাছে তাহলে এই দায়িত্ব দিতে হবে যে তারা নিজ নিজ এলাকায় গণশুনানি করতে পারবেন এবং বিভিন্ন কর্তৃপক্ষকে তারা ডাকতে পারবেন, তাদের সামনে গণশুনানি হবে। গণশুনানির পরে তিনি যে ব্যবস্থা নিতে বলবেন সেটা আইনানুগ হলে সে ব্যবস্থা নিতে হবে। আপনি কোনো একটা এলাকায় তো আলাদাভাবে এটা করতে পারবেন না। এরকম আর কোথায়, কোন এলাকায় গণশুনানি হয়?

দেশ রূপান্তর : নির্বাচনী এলাকায় জনপ্রতিনিধিদের এমন গণশুনানি তেমন না হলেও ভোক্তা অধিকার, রাজউক, দুদক কিংবা বিটিআরসির গণশুনানি তো হয়...।

আবু আলম শহীদ খান : সেগুলো তো আলাদা জিনিস। এসব শুনানিও তো কার্যকর না। কথা হচ্ছে একটা রাজনৈতিক এলাকায় একজন রাজনীতিবিদ তিনি এমপি এবং মন্ত্রী, তিনি একটি গণশুনানির আয়োজন করছেন। এটাকে তো ফরমালাইজড করতে হবে। প্রশাসনে পদ্ধতিগতভাবে না এলে তো কিছু হবে না। আপনার কথার সঙ্গে আমি একমত যে, গণশুনানিতে সাধারণ মানুষ তাদের সমস্যা, অভিযোগ তুলে ধরতে পারেন। সেজন্য গণশুনানি আপনি করতে পারেন কিন্তু কোনো অফিসারকে হাজির রাখার কোনো দরকার নেই। এই বাধ্যবাধকতা রাখারও দরকার নেই। উনি হাজির হতে বাধ্যও নন। সমস্যা হচ্ছে আমাদের বাংলাদেশে এখন আপনি সরকারে আছেন, আপনি মন্ত্রী, আপনি যদি আমাকে বলেন যে, এখানে আপনাকে থাকতে হবে, আমি থাকব। কিন্তু গণশুনানিতে কেন একজন অফিসার, ওসি, ইউএনও, এসিল্যান্ড বা এসপি থাকবেন? তাকে কেন আপনি হাজির করবেন? এর তো একটা পদ্ধতি আছে। তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে সেটা লিপিবদ্ধ হবে এবং আপনি আইনানুগ ব্যবস্থা নেবেন। আমাদের তো কন্ডাক্ট রুলস আছে, এর বাইরে যদি তিনি কিছু করেন তাহলে তার বিরুদ্ধে তদন্ত হবে এবং দোষ বা গাফিলতি পাওয়া গেলে তাকে শাস্তি দেবেন। এখন আপনি বলতে পারেন এটা তো দীর্ঘ প্রক্রিয়া এবং শাস্তিও তো হয় না। এটাও সরকারের দুর্বলতা। রাজনৈতিক সরকারের চরম দুর্বলতা যে তারা আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণে সমর্থ হয় না। এই দুর্বলতা ঢাকতে তো আপনি একটা ইনফরমাল ব্যবস্থা চালু করতে পারেন না। বাংলা ভাইও তো গণশুনানি করতেন, মনে আছে আপনার? ইউ কান্ট ফলো বাংলা ভাই। গণশুনানি আমাদের প্রশাসনের অংশ নয়।

দেশ রূপান্তর : ইউনিয়ন পর্যায়ে যে সালিশের বিষয়টা আছে, গণশুনানিকে কি সেভাবে ফরমাল বা ইনকরপোরেট করার কথা বলছেন?

আবু আলম শহীদ খান : এটাকে ইনকরপোরেট করার কথা বলছি না। কারণ, আমাদের প্রশাসনকে প্রশাসনিক পদ্ধতিতে চালাতে হবে। গণশুনানি কখনই প্রশাসনিক পদ্ধতির অংশ হতে পারে না। গণশুনানি একধরনের রাজনৈতিক বিবেচনায় করা হয়। হয়তো রাজনীতিকদের ইমেজ বাড়ানোর একটা কৌশল। আর সালিশটা একদম আলাদা জিনিস, এটা শত বছর ধরে চলে আসছে। এটা আমাদের একটা পদ্ধতি এবং এই পদ্ধতিতেও সীমাবদ্ধতা আছে। এটার সঙ্গে গণশুনানির বিষয়টা যায় না। গণশুনানি হয় কখন? আপনি যে বিটিআরসি, রাজউক, দুদকের কথা বললেন সেটা একটা। আরেকটা হলো যখন কোনো জুডিশিয়াল ইনকোয়ারি হয়, তখন লোকজনের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়। বা গণশুনানিতে কোনো ঘটনার প্রতক্ষ্যদর্শীদের ডাকা হতে পারে। এছাড়া পুলিশের ওপেন ডেতে ডিসি, এসপি, ওসিরা ভুক্তভোগী মানুষের সমস্যা, অভিযোগ সম্পর্কে শোনেন। কিন্তু নাটোরের যে গনশুনানি, সেখানে একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এটার আয়োজক, এ কারণে এটার ফরমালাইজেশনও হবে না। এবং দেখেন এটা একটা পর্যায়ে গিয়ে কিন্তু ভেঙে পড়ল। আর দেখেন, ওসির প্রত্যাহার আদেশ যে বাতিল হলো এটা তো আমাদের প্রতিমন্ত্রীর জন্যও খারাপ উদাহরণ হয়ে দাঁড়াল।

দেশ রূপান্তর : পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিক্রিয়া কি যথাযধ ছিল? অ্যাসোসিয়েশনের কাজ কী?

আবু আলম শহীদ খান : গণশুনানি, ওসির প্রত্যাহার, প্রত্যাহার আদেশ বাতিল কোনোটাই ঠিক হয়নি। আর অ্যাসোসিয়েশনের কাজ কী সেটা তো পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন বলতে পারবে। কিন্তু যে কোনো অ্যাসেসিয়েশন গড়ে তোলার যে আইনানুগ পদ্ধতি আছে সেটা তো মূলত সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের কল্যাণের জন্য। এখন একজন ওসিকে প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং সেই প্রত্যাহার আদেশ বাতিল করানোর মধ্যে পুলিশ সদস্যদের কী কল্যাণ আছে সেটা তাদের জিজ্ঞাসা করা উচিত। দেখেন যে কোনো কারণে একজন ওসিকে তো বদলি বা প্রত্যাহার করা যেতেই পারে। কিন্তু আলোচনা হচ্ছে তো সেটা বাতিল হওয়াতে। আর যেসব অভিযোগে প্রত্যাহার করা হয়েছিল, তেমন অভিযোগ তো আপনি যে কোনো জায়গায় গেলেই পাবেন। একটা দেশের স্বাধীনতার ৫২ বছর হয়ে গেল, তবু এসব অভিযোগের সমাধান কেন হচ্ছে না? পুলিশ জনগণের বন্ধু হতে পারছে না কেন? এটা নিয়ে গবেষণা করে বসতে হবে। স্বাধীন দেশে আমরা চাই পুলিশ জনগণের বন্ধু হোক। পুলিশ অনলাইনে জিডি করার ব্যবস্থা করেছে দাবি করছে না? আমি রিকোয়েস্ট করছি আপনি এখন অনলাইনে ট্রাই করে দেখেন পারেন কি না। হঠাৎ করে গণশুনানি করে আপনি সমস্যার সমাধান তো দিতে পারবেন না। 

দেশ রূপান্তর : একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে যাই, রাজনৈতিক সমাবেশে পুলিশের বক্তব্য রাখা ও অনেক সময় ক্ষমতাসীন দলের এমপি, মন্ত্রীদের পক্ষে ভোট চাওয়ার ঘটনাকে কীভাবে দেখছেন?

আবু আলম শহীদ খান : সর্বশেষ এমন ঘটনায় আগামী নির্বাচনে অর্থমন্ত্রীকে জয়ী করার অনুরোধ জানিয়ে যে পুলিশ কর্মকর্তা বক্তব্য দিয়েছিলেন, তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এটা তো নতুন ঘটনা না। আপনার নিশ্চই মনে আছে যে ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে এরকম দু’একজন পুলিশ কর্মকর্তা অথবা প্রশাসনের কোনো কোনো কর্মকর্তা এমন কাজ করেছেন। সরকারে তখন যারা ছিলেন বা এখন যারা আছেন তারা তো এসব ঘটনায় কোনো ব্যবস্থা নেননি। রাজনৈতিক সভায় যোগদান বা সেখানে বক্তৃতা তো সরকারি কর্মজীবীরা চাকরিবিধি অনুযায়ী রাখতে পারেন না। নিরাপত্তাও যদি দিতে হয়, সেটা তো স্টেজে উঠে বা নেতার পাশে বসে বক্তৃতা করে দেওয়ার বিষয় নয়। গণকর্মচারী হিসেবে আপনি কোনো রাজনৈতিক সভায় উপস্থিত থাকতে পারেন না। এটা কন্ডাক্ট রুলসের ব্যত্যয়। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক নেতারা, বা রাষ্ট্র চালান যারা তারা এসবে খুব উৎসাহিত বোধ করেন। এরকম করে করে বাংলাদেশের প্রশাসনের বারোটা বেজে যাচ্ছে।

দেশ রূপান্তর : সংসদে তো এমপিরা এমন বক্তব্য দিয়েছেন যে প্রশাসনের লোকেরা তাদের কথা শোনেন না।

আবু আলম শহীদ খান : গণকর্মচারীরা রাজনীতিবিদদের কথা শোনেন না, এমন অভিযোগ যেসব রাজনীতিবিদ করেন, তারা কেন করেন তার ব্যাখ্যা আমার কাছে নেই। গণকর্মচারীদের তো রাজনীতিবিদদের কথা শোনার কথা না। তাদের কাজ করার কথা দেশের সংবিধান এবং আইন, বিধিবিধান অনুযায়ী। এমপির তো কোনো প্রশাসনিক দায়িত্ব নেই। গণকর্মচারী তার কাজে ব্যত্যয় ঘটালে, বিশৃঙ্খলা করলে এমপি সংসদে আলোচনা করতে পারেন বা অভিযোগ নিয়ে মন্ত্রীর কাছে যেতে পারেন। অভিযোগের ভিত্তিতে রাষ্ট্র নিশ্চই ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু আমাদের কথা শোনে না, এটা কি কোনো আবদার নাকি! ওনাদের কথা শুনতে হবে কেন? প্রশাসনকে আইনানুগভাবে কাজ করতে দিতে হবে। সেটা করতে না দিলেই এমন কথা আসবে যে, প্রশাসন কথা শোনে না। কথা শোনে না মানে কী? কী কথা শোনেনি? আপনার পাশে বসে নেই নাকি আপনার জন্য ভোট চায়নি? প্রশাসনের কেউ আইনানুগ কোনো কাজ যদি না করে, এমপিরা তো সেটার অভিযোগ জানাতে পারেন। সংসদে দাঁড়ান বললে তো হবে না যে ডিসি আমার কথা শোনেন না। এবং সংসদে যে এসব কথা এমপিরা বলেছেন, অনেক সিনিয়র নেতারা বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীও উপস্থিত ছিলেন। সংসদে এসব কথার পরে কোনো প্রশাসনিক কর্মকর্তার শাস্তি হয়েছে? বিভাগীয় মামলা হয়েছে? যদি তা না হয়, তাহলে এসব অভিযোগের ভিত্তি নেই।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত