‘তুঘলকি কাণ্ড’ প্রবাদটি সবার জানা। এর অর্থ হলো ভীষণ বা বড়সড় কোনো ঘটনা, অন্যায় আর জোরজবরদস্তির ঘটনা। তুঘলক রাজবংশেরই বৈপরীত্যে ভরা দুই শাসকের পাগলাটে কীর্তিকলাপ, খামখেয়ালিপনা ও জোরজবরদস্তির জের ধরে এই প্রবাদের প্রচলন। কিন্তু সুলতানদের এই কর্মকান্ডের জের টানতে হতো প্রজাদের। আজকের দিনেও এমন কর্তৃপক্ষ ও প্রতিষ্ঠানের ইচ্ছেমাফিক কর্মকান্ডে ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ প্রবাদটির স্মরণ করেন। এমনই এক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিসন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি।
জনজীবনে নানাবিধ ব্যয়ের চাপ কীভাবে কমানো যায় তা নিয়ে চলমান উদ্বেগের মধ্যেই গ্যাসের মিটারের ভাড়া দ্বিগুণ করার প্রস্তাব দিয়েছে তিতাস গ্যাস। গ্রাহকের পকেট কেটে মুনাফা আরও বাড়াতে চাইছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তিতাস গ্যাস অনিয়মের চূড়ান্তে উঠেছে। মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরে ‘দ্বিগুণ হচ্ছে তিতাসের মিটার ভাড়া’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, তিতাসের পক্ষ থেকে গ্রাহকদের ৬ লাখ ৫০ হাজার প্রিপেইড মিটার দেওয়ার জন্য ২ হাজার ২৮৩ কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। ‘স্মার্ট মিটারিং এনার্জি এফিশিয়েন্সি ইম্প্র“ভমেন্ট প্রজেক্ট’ নামের প্রকল্পে প্রতি মাসে গ্রাহকের জন্য মিটার ভাড়া ধরা হয়েছে ২০০ টাকা। অথচ তিতাসেরই আরেক প্রকল্পে মিটার ভাড়া ধরা হয়েছে ১০০ টাকা। নতুন ভাড়ায় আপত্তি তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন।
যদি ১০০ টাকা ভাড়া ধরা হয়, তাহলে এ প্রকল্পে সাড়ে ছয় লাখ মিটারে প্রতি মাসে ভাড়া আসবে ৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ২০০ টাকা হলে ভাড়া আসবে ১৩ কোটি টাকা। বছরে ভাড়া আদায় হবে ১৫৬ কোটি টাকা। পুরোটাই যাবে গ্রাহকের পকেট থেকে। মিটার ভাড়া দ্বিগুণ করার যুক্তি কী জানতে চাইলে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিসন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ‘মিটারের দাম ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। ১০ বছরের লাইফ। এটার সার্ভারের চার্জ আছে, অন্য চার্জও আছে।’ প্রকল্পের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এ প্রকল্পের প্রি-পেইড মিটারের চুক্তিমূল্য ছিল ১৫ হাজার ৮৭৩ টাকা। তিতাসের প্রস্তাবিত প্রকল্পে মিটারের চুক্তিমূল্য ১০ শতাংশ বেশি ধরা হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের শিল্প শক্তি বিভাগের উপপ্রধান বলেছেন, প্রস্তাবিত প্রকল্পের ১০ শতাংশ অতিরিক্ত চুক্তিমূল্য বাদ দিতে হবে। এ ব্যাপারে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. শামসুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তিতাসে তুঘলকি কান্ড চলছে। এর আগে রাষ্ট্রপতি মিটারের ভাড়া বাড়ানোর অনুমোদন দিয়েছিলেন। এখন আবার পরিকল্পনা কমিশনের কাছে আবদার করা হয়েছে। রামরাজত্বেও এসব ঘটেনি।’
দেশে প্রি-পেইড গ্যাস মিটার স্থাপন কার্যক্রম চলছে খুবই ধীরগতিতে। কর্মকর্তারা বলছেন, প্রি-পেইড মিটার বসালে গ্রাহকপ্রতি গড়ে অন্তত ৩০ ঘনমিটার গ্যাস সাশ্রয় হবে। এতে গ্রাহকের আর্থিক সুবিধার পাশাপাশি দেশে চলমান গ্যাস সংকটও কিছুটা কমবে। অভিযোগ রয়েছে, তিতাসের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর অবৈধ আয় যাতে বন্ধ না হয় সেজন্য প্রি-পেইড মিটার স্থাপনে গড়িমসি করে।
মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, তিতাসে ৬ শতাংশ সিস্টেম লস হয় মূলত অবৈধ সংযোগের কারণে। অথচ গ্যাসের বিপুল সংখ্যক অবৈধ সংযোগ বন্ধের কোনো উদ্যোগ নেই। অথচ এবারও জনগণের পকেট কাটার সহজ পথে হাঁটার রাস্তাই বেছে নিয়েছে তিতাস।
তিতাসের বিরুদ্ধে বহু অভিযোগ রয়েছে। এগুলো দীর্ঘদিনের। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। কারও কাছে তাদের কোনো জবাবদিহি নেই। আইনে থাকুক আর না থাকুক, মিটারের ভাড়া বাড়িয়ে মূল্যস্থিতির বাজারে ভোক্তার পকেট কেটে তার আরও বেশি আয় করতে হবে? এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ও হাত-পা গুটিয়ে রাখতে পারে না।
