সংস্কার বাস্তবায়নে প্রশিক্ষণ দেবে আইএমএফ

আপডেট : ২৩ আগস্ট ২০২৩, ১২:৩৮ এএম

বাংলাদেশে চলমান আর্থিক সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নে কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। গতকাল মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আবদুর রউফ তালুকদারের সঙ্গে সংস্থাটির ঢাকা সফররত প্রতিনিধিদলের সমাপনী বৈঠকে বিষয়টি জানানো হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে গত ১৩ আগস্ট আইএমএফের চার সদস্যের কারিগরি সহায়তা কমিটির সঙ্গে আলোচনায় বসেন গভর্নর। ঋণের শর্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ ও কারিগরি পরামর্শ দিতে বাংলাদেশ সফর করছে প্রতিনিধিদলটি।

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, আইএমএফ প্রতিনিধিরা চলমান আর্থিক সংস্কারের বিষয়গুলোর অগ্রগতি ও পদ্ধতি পরীক্ষার পাশাপাশি এর দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখেছেন। এর মধ্যে রয়েছেÑ ব্যাংক পরিচালনা কাঠামো পর্যবেক্ষণ, রিজার্ভের পর্যাপ্ততা যাচাই, তারল্য পরিস্থিতির পূর্বাভাস ও ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি যাচাই এবং আমদানি এলসি ও ফরেক্স মার্কেট পর্যবেক্ষণ। পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে সংস্কার কার্যক্রমের ত্রুটি চিহ্নিত করে তার সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা জানিয়েছে আইএমএফ প্রতিনিধিরা। এ সংক্রান্ত একটি প্রোগ্রাম শিডিউল নিয়ে গভর্নরের পরামর্শ চাওয়া হয়েছে। কারা ওই প্রশিক্ষণে অংশ নেবে তাও জানতে চেয়েছে সংস্থাটি।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মেজবাউল হক বলেন, ‘আইএমএফের একটি মিশন এসেছে। তারা মনিটারি অপারেশনসহ সার্বিক বিষয়ে কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রস্তাব করেছে। তাই বিভিন্ন বিষয় পরীক্ষা করে দেখেছে কোন কোন বিষয়ে প্রশিক্ষণের প্রয়োজন আছে। এ সংক্রান্ত একটি প্রোগাম শিডিউল তৈরি করার বিষয়ে গভর্নরের পরামর্শ চেয়েছে প্রতিনিধিদল।’

তিনি বলেন, এ সফর ঋণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়। তারা অন্যান্য দেশও সফর করবে। সবাইকে নিয়ে একটি প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম শিডিউল তৈরি করবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা সেখানে অংশ নেবেন। 

তবে আইএমএফ প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেওয়া কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রশিক্ষণ প্রোগ্রামটি মূলত আর্থিক কাঠামো সংস্কারকে কেন্দ্র করে। তারল্য পরিস্থিতি, ফরেক্স মার্কেটসহ বিভিন্ন বিষয় পরীক্ষা করে দেখার পর তারা পর্যালোচনা করে দেখছে কোন কোন বিষয়ে ঘাটতি রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দক্ষতা উন্নয়নের ক্ষেত্রগুলো যাচাই করে দেখেছে আইএমএফের কারিগরি টিম।

প্রসঙ্গত, সংস্থাটি থেকে নেওয়া ঋণের শর্ত হিসেবে বেশ কিছু কাঠামোগত সংস্কারে সম্মত হয় বাংলাদেশ। যদিও একে আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণের প্রতিশ্রুতি হিসেবে ব্যাখ্যা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অর্থাৎ অর্থনৈতিক মৌলিক কাঠামোগত যেসব বিষয় আন্তর্জাতিক মানদ-ের বাইরে রয়েছে সেসব বিষয়ে সংস্কারের শর্তে আইএমএফ থেকে ঋণ নিয়েছে বাংলাদেশ। ইতিমধ্যে বেশ কিছু সংস্কার শুরু হয়েছে। আর এসব সংস্কারের অগ্রগতি খতিয়ে দেখতে দফায় দফায় বাংলাদেশ সফর করছে আইএমএফ প্রতিনিধিদল। 

সংস্কারের অংশ হিসেবে চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে ব্যাংকের ঋণে বেঁধে দেওয়া ৯ শতাংশ সুদহার তুলে দিয়ে ইন্টারেস্ট রেট করিডরের মাধ্যমে স্মার্ট সুদের হার নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংকে। ব্যাংকগুলো এই ইন্টারেস্ট রেট করিডর কীভাবে বাস্তবায়ন করছে তার অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চেয়েছে আইএমএফ। এছাড়া চলমান মুদ্রানীতি বাস্তবায়ন, নীতি সুদহারের করিডর প্রথা ও ডলারের একক দাম বাস্তবায়নের বিষয়ে জানতে চেয়েছেন সংস্থাটির কর্মকর্তারা। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের হিসাবায়ন ও এর পর্যাপ্ততা, তারল্য পরিস্থিতির সম্ভাব্য পূর্বাভাস ঠিক করা ও ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি প্রণয়ন করতে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি। এছাড়া আমদানি এলসি ও ফরেক্স মার্কেট ব্যবস্থাপনা পরীক্ষা করে এর ত্রুটি চিহ্নিত করেছে আইএমএফ প্রতিনিধিরা।  

বৈঠকের বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, এটি আইএমএফের নিয়মিত সফরের অংশ। তারা মুদ্রানীতির বাস্তবায়নের বিষয়ে জানতে চেয়েছে। আমরা নতুন করে ইন্টারেস্ট রেট করিডরে গিয়েছি। এটা কী পদ্ধতিতে বাস্তবায়ন করব বা এর প্রভাব কী হবে তার বিষয়ে আলোচনা করেছে। এছাড়া তারল্য ব্যবস্থাপনার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন এই শীর্ষ কর্তা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি সূত্র জানিয়েছে, আইএমফের ঋণের দ্বিতীয় কিস্তি ছাড়ের ক্ষেত্রে চলতি বছরের জুলাইয়ে বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ ২৪ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হওয়ার শর্ত ছিল। কিন্তু বর্তমানে বিপিএম-৬ অনুযায়ী রিজার্ভ রয়েছে ২৩ বিলিয়নের সামান্য বেশি। তবে নিট রিজার্ভের পরিমাণ আরও কম হলেও তা প্রকাশ করেনি বাংলাদেশ ব্যাংক। তাই ঋণের দ্বিতীয় কিস্তি ছাড়ের বিষয়ে দরকষাকষি করতে পারে সংস্থাটি। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে ছাড় দেওয়ার জন্য জোরালো আবেদন করা হবে বলে জানা গেছে।

গত ১৮ জুন নতুন অর্থবছরের জন্য মুদ্রানীতি ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে নীতি সুদহারের করিডর প্রথা, সুদহারের সীমা প্রত্যাহার, ডলারের একক দাম, আইএমএফ স্বীকৃত বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে রিজার্ভের হিসাবায়নসহ নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের শর্তের মধ্যে ছিল। ফলে পুরো মুদ্রানীতিটি হয়েছে আইএমএফের ছক অনুযায়ী। পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি রোধে মুদ্রা সরবরাহনির্ভর নীতি থেকে সরে এসে সুদহার লক্ষ্য করে মুদ্রানীতি প্রণয়ন শুরুর ঘোষণা দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক।

এর আগে ২০২০ সালের এপ্রিলে ব্যাংকঋণের সুদহার সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ নির্ধারণ করে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এরপর আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সুদহার সর্বোচ্চ ১১ শতাংশ নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়। কিন্তু চলতি অর্থবছর থেকে সুদহারের সীমা তুলে দেওয়া হয়। এ বিষয়ে জানানো হয়, ১৮২ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের গড় হারের সঙ্গে ব্যাংকগুলো ৩ শতাংশ ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ৫ শতাংশ সুদ যুক্ত করতে পারবে। এটাই হবে সুদের সর্বোচ্চ হার। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় মাসে ১৮২ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলে গড় সুদ ছিল ৭ দশমিক ১০ শতাংশ। সে হিসেবে আগস্টে ব্যাংক ঋণের সুদের হার ১০ দশমিক ১০ শতাংশ আর আর্থিক প্রতিষ্ঠানে তা ১২ দশমিক ১০ শতাংশ নির্ধারিত রয়েছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে (এসএমই) ও ভোক্তা ঋণের তদারকি খরচের জন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো আরও ১ শতাংশ বেশি সুদ আরোপ করতে পারবে। ক্রেডিট কার্ডের সুদহার আগের মতোই ২০ শতাংশ থাকবে। এছাড়া আইএমএফের শর্ত অনুযায়ী বিদ্যুৎ, গ্যাস, সারসহ বিভিন্ন খাতে ভর্তুকি কমিয়েছে সরকার। এনবিআরের রাজস্ব নীতি পরিবর্তনেরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

গত ৬ আগস্ট আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে আসে। তারা বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে একাধিক বৈঠক করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরসহ বিভিন্ন বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে প্রতিনিধিদলটি। এছাড়া বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সঙ্গেও বৈঠক করেছে সংস্থাটি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত