সড়কে চলা অ্যাম্বুলেন্সের আলাদা করে কোনো নীতিমালা নেই। এতে অনেকটা লাগামহীনভাবেই চলছে জরুরি চিকিৎসার কাজে নিয়োজিত এই বাহন। অনেক ফিটনেসবিহীন মাইক্রোবাসও অ্যাম্বুলেন্সের রূপান্তরিত হচ্ছে। ফলে সড়কে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। রোগীর জীবন বাঁচানোর জন্য যে পরিবহন মানুষের ভরসা হিসেবে কাজ করে, সেই বাহনই এখন মৃত্যুর দিকে নিয়ে যাচ্ছে। তাই এবার অ্যাম্বুলেন্সকে নীতিমালায় আনতে যাচ্ছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্র্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)।
বিআরটিএর একটি সূত্র থেকে জানা যায়, ভাড়া নির্ধারণ, অ্যাম্বুলেন্সের প্রকৃত গঠন, মালিকানা এবং রোগীবান্ধব অ্যাম্বুলেন্সসহ বেশ কয়েকটি শর্ত দিয়ে নতুন নীতিমালা করা হচ্ছে। মন্ত্রণালয়ে এ বিষয়ে খুব দ্রুত একটি প্রস্তাবনা পাঠানোর জন্য বিআরটিএ থেকে একটি কমিটি করা হয়েছে। কমিটি কাজ শেষ করে মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন পেলেই অ্যাম্বুলেন্সের নীতিমালা প্রকাশ করবে বিআরটিএ।
সরেজমিন পুরান ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বেশ কয়েকটি জায়গা ঘুরে দেখা যায়, বেশিরভাগ অ্যাম্বুলেন্স মাইক্রোবাস থেকে রূপান্তর করা। বিআরটিএ থেকে নির্ধারিত কোনো ভাড়া ঠিক না থাকায় একেক জনকে একেক রকম ভাড়া আদায় করতে দেখা যায়। অনেক অ্যাম্বুলেন্সে অক্সিজেন, নেবুলাইজার ঠিকমতো দেখা যায় না। অনেকগুলো দায়সারাভাবেই চলছে।
পুরান ঢাকার মিটফোর্ড এলাকায় ‘মা বাবার দোয়া’ নামের এক অ্যাম্বুলেন্সের চালক মো. শরীফুল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি শুধু অ্যাম্বুলেন্সের চালক। এর ভালো-খারাপ বিষয়ে কিছু বলতে পারব না। মালিক নতুন গাড়ি নামালে নতুনটা চালাব। এখন এই গাড়ি আছে, এটা দিয়ে রোগী বহন করি।’
শাওন নামের এক শিক্ষার্থী বারডেম হাসপাতাল থেকে তার বাবাকে হবিগঞ্জ সদর এলাকায় নিয়ে যাওয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্স খুঁজছেন। তিনি বলেন, দেশে রোগীবান্ধব অ্যাম্বুলেন্স থাকার কথা। কিন্তু অনেক অ্যাম্বুলেন্সে অক্সিজেন নেই। আর যেগুলোতে আছে, সেগুলোর ভাড়া বেশি চাওয়া হচ্ছে। এখন বাধ্য হয়ে বেশি টাকা দিয়ে যেতে হচ্ছে বাবাকে নিয়ে।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, জীবন রক্ষার এই অ্যাম্বুলেন্স অনেক সময় জীবন কেড়ে নেয়। ব্যক্তিগত গাড়ির দুর্ঘটনায় অ্যাম্বুলেন্সের সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে। অ্যাম্বুলেন্সের জন্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে নতুন নীতিমালা করার দাবি জানান তিনি।
বাংলাদেশ অ্যাম্বুলেন্স মালিক কল্যাণ সমিতির সভাপতি মো. গোলাম মোস্তফা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরাও চাই অ্যাম্বুলেন্সের জন্য একটি নীতিমালা হোক। কিন্তু সেই নীতিমালা করার সময় আমাদের রাখলে ভালো হয়। এখন সারা দেশে নিবন্ধিত অ্যাম্বুলেন্স আছে প্রায় ৮ হাজার ২৮৭টির মতো। অ্যাম্বুলেন্স নিবন্ধনের এই সংখ্যা প্রতিদিন বাড়ছে। আর বিআরটিএর নিবন্ধন ছাড়াও অনেক অ্যাম্বুলেন্স সড়কে চলছে। তাই নীতিমালা হলো অনেকটাই শৃঙ্খলায় ফিরবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিআরটিএর এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সড়কে রোগীবান্ধব অ্যাম্বুলেন্স দেখতে চায় বিআরটিএ। তাই নীতিমালা হলে অ্যাম্বুলেন্সের যেসব বিশৃঙ্খলা আছে, সেটি আর থাকবে না। ২১ আগস্ট নীতিমালার কমিটির একটি বৈঠক হয়েছে। সেই কমিটি সব কাজ শেষ করে মন্ত্রণালয়ে পাঠাবে। সেখান থেকে অনুমোদন হলে সেটি প্রকাশ করা হবে।
বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্রের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, রোগীদের জিম্মি করে ভাড়া নৈরাজ্য চলে অ্যাম্বুলেন্সে। বর্তমানে যেসব অ্যাম্বুলেন্স সড়কে আছে, সেগুলোর নীতিমালা হচ্ছে অ্যাম্বুলেন্সেরবেশিরভাগের প্রকৃত গঠন কাঠামো ঠিক নেই। মূলত মাইক্রোবাসগুলোই অ্যাম্বুলেন্সে রূপান্তরিত হচ্ছে। একটি অ্যাম্বুলেন্সে রোগীর জরুরি অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার জন্য যেসব প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম থাকা প্রয়োজন, সেগুলো অনেক সময় থাকে না। তাই নতুন করে নীতিমালা হলে সবকিছুরই পরিবর্তন আসবে। তা ছাড়া, অনেক আগেই অ্যাম্বুলেন্সের নীতিমালা আনার দরকার ছিল।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্র্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মজুমদারকে দেশ রূপান্তর থেকে একাধিকবার ফোন করে তাকে পাওয়া যায়নি।
