১
ছাত্র বয়সে বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি শুরু, স্কুলে থাকতেই তিনি উপনিবেশবিরোধী রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের শুরু ১৯৪৮ সালে, জিন্নাহর উর্দুর পক্ষে সাফাইয়ের প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে। তাতেও ছাত্ররাই নেতৃত্ব দেন। কিন্তু তারপরও বুয়েট কর্র্তৃপক্ষ ওই ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যে দেশের মুক্তিযুদ্ধে ছাত্ররাজনীতির গৌরবময় ইতিহাস রয়েছে, সেখানে ছাত্ররাজনীতির নেতিবাচক প্রভাব ঠেকাতে নিষিদ্ধ করাই কি সমাধান? এমনিতেই বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ হয়ে আছে, নতুন করে রাজনীতি নিষিদ্ধ করাটা ‘একটা মুরগি দ্বিতীয়বার জবাই করার’ মতো। বুয়েট কর্র্তৃপক্ষ বাংলাদেশে ছাত্ররাজনীতির সোনালি ইতিহাস ভুলে, আপাত সমস্যা সমাধানের পথেই হেঁটেছে। নিজেদের ব্যর্থতার দায় ছাত্ররাজনীতির ওপর চাপিয়েছে। এটি সমস্যার সমাধান হতে পারে না। ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করা হলে দুদিন পর একই কারণে শ্রমিকদের রাজনীতিও বন্ধ করা হতে পারে।
ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার ঘোষণা শুধু নাগরিক অধিকারবিরোধী নয়, নির্বুদ্ধিতাও। ইতিহাসের পাঠ থেকে জানি, রাজনৈতিক কার্যকলাপ বন্ধের ভেতর দিয়েই শুরু হয় ফ্যাসিবাদ। ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করে বুয়েট প্রশাসন এক ধরনের প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিকেই সুযোগ করে দিল, যারা গোপনে রাজনীতি করে।
ছাত্রদের ক্ষেত্রে সমস্যা ‘রাজনীতি’ নয়। সমস্যার কেন্দ্রে ক্যাম্পাসে ছাত্রসংগঠনের নামে জাতীয় রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলগুলোর অবাধ অনুপ্রবেশ। নামে ছাত্রসংগঠন হলেও বাংলাদেশে কোনো ছাত্রসংগঠন প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো থেকে আলাদা নয়। মূলত তারা প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর লেজুড়মাত্র। ১৮ বছর বয়সীরাই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন। তারা ভোট দিতে পারবেন, কিন্তু রাজনীতি করতে পারবেন না, এ কেমন বৈপরীত্য! এর চেয়ে বেশি মর্মান্তিক উদাহরণ আর হতে পারে না।
২
সুস্থ রাজনৈতিক চেতনা ও গণতান্ত্রিক অনুশীলনের অভাবে তাদের মধ্যে আদর্শগত দ্বন্দ্ব প্রায়ই প্রত্যক্ষ সংঘর্ষে রূপ নেয়। যার পরিণতি অত্যন্ত বেদনাদায়ক। যখন যে রাজনৈতিক দল রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পায় কিংবা নেয়, তখন সেই দল অঘোষিতভাবে এই সিদ্ধান্ত নেয় যে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তাদের অনুগত শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে গিয়ে যে বলপ্রয়োগ ও নিষ্ঠুরতার চর্চা চলে এসেছে, তারই ভয়ঙ্কর রূপ দেখা যাচ্ছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। ২০১৯ সালে আবরার হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে বুয়েটে সেই নৃশংসতার ঘটনা উন্মোচিত হলো।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র, শিক্ষক, কর্মচারীদের দলভিত্তিক রাজনৈতিক আনুগত্য বা সমর্থন লাভের আকাক্সক্ষা পরিত্যাগ না করা পর্যন্ত কোনো কিছুতেই কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আশা করা যায় না। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো কি এই আকাক্সক্ষা ত্যাগ করবে? মনে হয় না। কেননা রাজনৈতিক দলগুলোর নীতিনির্ধারকদের ভাবনায় বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষা, জ্ঞান, সংস্কৃতির গুরুত্ব আছে বলে মনে হয় না। বরং দলীয় স্বার্থে, উপদলীয় স্বার্থে, এমনকি ব্যক্তিগত স্বার্থেও তারা সন্তানতুল্য তরুণ-তরুণীদের পরস্পরের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী সহিংসতায় লিপ্ত হতে মদদ জোগান, অপরাধবৃত্তিতে জড়িয়ে পড়তে উৎসাহ দেন। রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যাপারে আরও বেশি হতাশ লাগে এ জন্য যে, তাদের কাছে অসৎ, অপরাধপ্রবণ ও নিষ্ঠুর প্রকৃতির লোকদের সমাদর বেড়েছে; দলগুলোতে অপেক্ষাকৃত সৎ, ত্যাগী ও নিবেদিতপ্রাণ নেতাকর্মীদের স্থান অনেক সংকুচিত হয়ে এসেছে।
৩
‘ছাত্ররাজনীতি’র আদৌ কোনো প্রয়োজন আছে কি? তার প্রকৃত স্বরূপই বা তাহলে কী? ছাত্ররা সমাজেরই একটি অংশ। ছাত্রসমাজের আছে অনেক আশা-আকাক্সক্ষা, চাওয়া-পাওয়ার বিষয়। এসব বিষয়কে অবলম্বন করেই ছাত্রদের নিজস্ব আন্দোলন ও সংগঠন পরিচালিত হওয়া স্বাভাবিক। ক্লাসরুমের ভাঙা বেঞ্চ-ব্ল্যাকবোর্ড মেরামত, বই-কাগজ-কলমের দাম কমানো, পর্যাপ্ত সংখ্যক শিক্ষকের ব্যবস্থা ইত্যাদি খুঁটিনাটি বিষয়সহ গণমুখী প্রগতিশীল শিক্ষানীতি, শিক্ষা খাতে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি মুক্তচিন্তা ও বাক্স্বাধীনতার জন্য কাজ করা প্রভৃতি ছাত্রসমাজের প্রত্যক্ষ স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোকে ভিত্তি করে ছাত্রসমাজের একতা ও ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম গড়ে উঠবে এটিই স্বাভাবিক ও প্রত্যাশিত।
এসব ছাড়াও ছাত্রসমাজের পরোক্ষ (অথবা প্রচ্ছন্নভাবে প্রত্যক্ষ) নানা স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ও আছে। যেমন সমাজকে দারিদ্র্য ও বৈষম্য থেকে মুক্ত করা, জ্ঞান অন্বেষণের জন্য মুক্তচিন্তার পরিবেশ নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রব্যবস্থায় গণতন্ত্র ও অসাম্প্রদায়িকতা নিশ্চিত করা ইত্যাদি বিষয়। তা ছাড়া শুধু বইয়ের পোকা হয়ে থাকাই নয় প্রকৃত দেশপ্রেম, মানবিক মূল্যবোধ, মননশীলতা ও সৃজনশীল প্রতিভার জাগরণ ঘটিয়ে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে দেশ ও মানবসভ্যতা নির্মাণের কারিগররূপে গড়ে তোলাই যে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য, সে কথাও মনে রাখা দরকার। তাই গণতন্ত্র, অসাম্প্রদায়িকতা, শোষণমুক্তি, সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যের অবসান, দেশপ্রেম, উদার মানবিকতা, প্রগতিমুখীনতা, বিজ্ঞানমনস্কতা ছাত্রসমাজের সাধারণ স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়। এসব বিষয়ের সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক-সামাজিক নীতি, রাষ্ট্রব্যবস্থা, সরকারি নীতি ইত্যাদি জড়িত। ছাত্রসমাজের শিক্ষাজীবনের নানাবিধ মৌলিক চাহিদাই এসব বিষয়ের সঙ্গে ছাত্রসমাজকে সরাসরি সম্পৃক্ত করে তোলে। এসবই ছাত্রসমাজের নিজস্ব আশা-আকাক্সক্ষা ও চাওয়া-পাওয়ার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ও স্বাভাবিকভাবে উত্থিত ‘রাজনীতির’ বিষয়।
যারা ‘ছাত্ররাজনীতি’ বন্ধ করার কথা বলছেন, তাদের কাছে জিজ্ঞাসা ছাত্রসমাজের কি দেশপ্রেমিক হওয়া জরুরি নয়? এবং দেশপ্রেম কি রাজনীতি নয়? তাহলে ছাত্রসমাজকে ‘রাজনীতিমুক্ত’ করার চেষ্টা করা হলে তা কি তাদের দেশপ্রেমের ক্ষেত্রে শূন্যতা সৃষ্টির প্রবণতার জন্ম দেবে না?
৪
রাজনীতি করার অধিকার যেকোনো নাগরিকেরই রয়েছে। সমাজের সচেতন নাগরিক হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর তো বটেই। সেই কাজটি তিনি ক্যাম্পাসের বাইরেও করতে পারেন। ক্যাম্পাসে রাজনীতির নামে যে দুর্বৃত্তায়ন ফুলে ফেঁপে উঠেছে, তা থেকে শিক্ষার্থীরাও মুক্তি চান। রাজনীতি না করলেই যে শিক্ষার্থীরা রাজনীতি-সচেতন হবেন না, তা নয়। রাজনীতি-সচেতনতা আর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড আলাদা জিনিস। যদি রাজনৈতিক দলগুলো ছাত্রদের প্রতিপক্ষ দমনের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার বন্ধ না করে, যদি ছাত্রদের মধ্যে ভোগবাদ প্রবল হতে থাকে, যদি মেধাবীদের রাজনীতিতে আসার মতো পরিবেশ তৈরি না হয়, তবে ক্যাম্পাসে দলীয় রাজনীতি বন্ধের দাবি আরও প্রবল হবে।
রাজনীতি ছাড়া দেশ চলে না। কিন্তু ক্যাম্পাসে কতটুকু রাজনীতি থাকবে, কোন প্রক্রিয়ায় থাকবে, সেটি মূল দলের লেজুড়বৃত্তি করবে কি না, ক্যাম্পাসে তারা প্রতিপক্ষ দমনে পেটোয়া বাহিনী হিসেবে কাজ করবে কি না এসব প্রশ্নের সুরাহা করতে হবে আগে।
কাজেই ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ নয়, দুর্বৃত্তায়িত শক্তিকে অপসারণ করে এবং ছাত্ররাজনীতি স্বাধীনভাবে করতে দিতে হবে। তা উন্মুক্ত করে দেওয়াই হবে সমাধান। ছাত্ররাজনীতি দুই দিক থেকে ‘হামলার শিকার হচ্ছে’। একটা হলো ফ্যাসিস্ট-দখলদারিত্বের শক্তি, আরেকটি নতুন আক্রমণ বিরাজনীতিকরণের সুশীল সমাজীয় ফর্মুলা ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করার চেষ্টা। ছাত্ররাজনীতি বন্ধের চেষ্টা আসলে বিরাজনীতিকরণেরই চেষ্টা। ছাত্ররা রাজনীতি না করলে, ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের জন্য তৈরি না হয়, কারা দেশের নেতৃত্ব দেবে? ছাত্ররাজনীতিকে দোষ না দিয়ে, সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে, তার চিকিৎসা দিতে হবে। ছাত্ররাজনীতি নয়, বিরাজনীতিকরণ বন্ধ হোক চিরতরে। আর সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরে আসুক শিক্ষা এবং ছাত্ররাজনীতির সুষ্ঠু পরিবেশ। বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ নয়, দুর্বৃত্তায়িত শক্তিকে অপসারণ করে এবং ছাত্ররাজনীতি স্বাধীনভাবে করতে দিতে হবে। প্রদোষের এ অন্ধকারে সেই আস্থা অন্তত আমাদের মধ্যে বেঁচে থাক।
লেখক: রাজনৈতিক সংগঠক
