বিক্রম ঘুরে বেড়াচ্ছে চাঁদে, কিংবা বলা যায় চাঁদের বুকে হাঁটছে ভারত! গত বুধবার সন্ধ্যায় ভারতের চন্দ্রযান-৩ নভোযানের ল্যান্ডার বিক্রম সফলভাবে চাঁদের মাটিতে নেমেছে। স্বপ্নপূরণ হয়েছে ভারতের ১৪০ কোটি মানুষের। দেশটিও পৌঁছে গেছে অভিজাত ‘মহাকাশ ক্লাবে’। কেউ কেউ বলছেন, চাঁদের বুকে বিক্রমের অবতরণের মধ্য দিয়ে ভারত আসলে ‘প্রথম বিশ্বের’ দেশ হয়ে উঠেছে! গতকাল মর্তে যখন এমন আলোচনা তখন চন্দ্রযান-৩ এর ল্যান্ডার বিক্রম ও রোভার প্রজ্ঞান চন্দ্রের মাটিতে শুরু করেছে ব্যস্ত দিন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় আগে পৃথিবীর একমাত্র উপগ্রহটিতে যেখানে মানুষ পৌঁছে গেছে, মঙ্গলগ্রহে হয়েছে একাধিক সফল অভিযান সেখানে চাঁদে নতুন করে অভিযানে ভারত ও মহাকাশ বিজ্ঞানের লাভ কোথায়? হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে এসব অভিযানের রাজনৈতিক অর্থনীতিই বা কী?
এই আলোচনার শুরুতেই আসন্ন আরেকটি চন্দ্র অভিযানের কথা বলা যেতে পারে। আগামী দুই বছরের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা
সংস্থা নাসা ফের মানুষ পাঠাতে চায় চাঁদে। ইতিমধ্যে আসন্ন ওই মিশনের একটি নামও ঠিক করা হয়েছে। গেল এক দশকে আর্টেমিস মিশন নামের ওই প্রকল্পের পেছনে চার হাজার কোটি ডলার খরচও হয়েছে। পাঠানোর আগে সব মিলিয়ে এ খরচ হয়তো আরও কয়েকগুণ। কিন্তু ৫০ বছরের বেশি সময় পরে উপগ্রহটিতে ফের মানুষ পাঠাতে যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল ব্যয়ের পেছনের রাজনীতি কী?
এ প্রশ্নের জবাবের আগে আরও একটি তথ্য জানা দরকার যে, চন্দ্রযান-৩ এর সফল অবতরণের তিনদিন আগেই চাঁদের বুকে আছড়ে পড়েছে রাশিয়ার পাঠানো চন্দ্রযান লুনা-২৫। রাশিয়াও সাতচল্লিশ বছর পরে কোনো মহাকাশযান চাঁদে পাঠিয়েছিল। গেল কয়েক দশকে চীনের একাধিক যান চাঁদে অবতরণও করেছে। চীনের যান চাঁদ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে তা পৃথিবীতেও পাঠিয়েছে। ইসরায়েলও চাঁদে তাদের অভিযান চালিয়েছিল। খুব শিগগিরই হয়তো সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতও যুক্ত হবে এই ‘প্রতিযোগিতায়’।
এখানে একটি বিষয় তাৎপর্যপূর্ণ, চাঁদে অভিযান না বলে প্রতিযোগিতা বলা! আসলে খোদ নাসার বিজ্ঞানীদের বক্তব্যই অনেকটা এই অর্থ দাঁড় করায়। আর্টেমিস মিশনের বিষয়ে নাসার বিজ্ঞানীদের ভাষ্য, চাঁদকে ঘিরে চীনের পরিকল্পনার কারণেই পাল্টা উদ্যোগ যুক্তরাষ্ট্রের। চীন চায় ২০৩০ সালের মধ্যে সেখানে একটা ঘাঁটি গড়ে তুলতে। আর যুক্তরাষ্ট্রও চায়, আর্টেমিস মিশনে গিয়ে সেখানে ঘাঁটি গাড়তে।
নাসার মহাকাশ বিজ্ঞানী ড. অমিতাভ ঘোষ এ বিষয়ে কয়েকদিন আগে বিবিসিকে বলেছিলেন, গত ৫০ বছর ধরে চাঁদে নাসার মানুষ না পাঠানোর পেছনে বৈজ্ঞানিক কোনো কারণ নেই। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিবেচনাতেই তা করা হয়নি। তবে অমিতাভ ঘোষের ভাষ্য, এই প্রচেষ্টাগুলোই আসলে মানুষকে প্রযুক্তিগতভাবে এগিয়ে দেয়। অভিযান সফল বা ব্যর্থ হোক, প্রযুক্তিগত যে উন্নয়ন প্রচেষ্টা প্রতিটি অভিযানে জড়িত থাকে তা পৃথিবীর অনেক কাজকেই অদূর ভবিষ্যতে সহজ করে দেয়।
১৯৬৯ সালে সারা বিশ্বকে অবাক করে দিয়ে যখন নাসার পাঠানো অ্যাপোলো-১১ মিশন থেকে চাঁদের মাটিতে নিল আর্মস্ট্রং পা রেখেছিলেন, তখন তিনি বলেছিলেন, মানুষের জন্য এটি ছোট একটি পদক্ষেপ, কিন্তু মানবজাতির জন্য এক বিরাট ঘটনা। এরপর প্রায় তিন বছর ধরে চাঁদে অবতরণ করেছে মনুষ্যবাহী ছয়টি মিশন। চাঁদের পিঠে হেঁটেছেন ১২ জন নভোচারী। এ সময় তারা ছবি তুলেছেন, পতাকা গেড়েছেন, পরীক্ষা চালিয়েছেন এবং চাঁদের বিভিন্ন স্থান থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পৃথিবীতে নিয়ে এসেছেন। চাঁদে মানুষবাহী সবশেষ মিশনটি পাঠানো হয় ১৯৭২ সালের ডিসেম্বর মাসে। তখন ভাবা হয়েছিল ভবিষ্যতে মানুষ ঘন ঘন চাঁদে যাবে এবং উপগ্রহটি মহাকাশ গবেষণায় নিয়মিত এক গন্তব্যে পরিণত হবে। কিন্তু সে রকম হয়নি। ১৯৭২ সালের ওই মনুষ্য-মিশনই ছিল শেষ অভিযান। তবে সে সময় এইটি বিতর্ক ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বে। ওই সময়টাতে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের তীব স্নায়ুযুদ্ধ চলছিল। তার প্রভাব পড়ে চাঁদে অভিযানেও। সোভিয়েতে ইউনিয়নই মহাকাশ যাত্রায় এগিয়েছিল তখন। কিন্তু হঠাৎ করেই চাঁদে মানুষ পাঠানোর ঘোষণা ও বাস্তবায়ন স্নায়ুযুদ্ধে নতুন মাত্রা দেয়। অনেকে অ্যাপোলো-১১ সহ অন্যান্য মানুষবাহী অভিযানকে সাজানো নাটক বলতে থাকেন। বলা হতে থাকে, নাসা তাদের অভিযান যে সফল হবে না, সেটা বুঝে ফেলেছিল। কাজেই তারা সোভিয়েত ইউনিয়নকে মহাকাশ অভিযানে টেক্কা দেওয়ার জন্য হয়তো চাঁদে সফল অভিযান চালানোর নাটক সাজিয়েছে।
তবে বাস্তবতা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের চাঁদে যাওয়ার ঘটনা যদি সত্যিই নাটক হতো তবে সোভিয়েত ইউনিয়ন সেটি ফাঁস করে দিতে পারত। কারণ সেটা ফাঁস করে দেওয়ার সক্ষমতা এবং ইচ্ছে দুটিই ছিল তাদের। কিন্তু এ বিষয়ে তারা কোনো কথাই বলেনি। তার মানে চাঁদে মানুষ যাওয়া বা অভিযান আসলে কোনো সাজানো নাটক নয়।
অবশ্য অ্যাপোলো-১১ যে যুক্তরাষ্ট্রের একটি রাজনৈতিক মিশন ছিল তাতে সন্দেহ নেই কারোরই। তাদের উদ্দেশ্য ছিল চাঁদে মানুষ পাঠিয়ে মহাকাশেও যে তারা শক্তিশালী সারা পৃথিবীর কাছে এরকম একটি বার্তা পৌঁছে দেওয়া।
তবে বাস্তবতা হলো চাঁদের উদ্দেশ্যে প্রতিটি অভিযানই মানুষকে নতুন কিছু দিয়েছে। যেমন ভারতের অভিযানে পাবে পৃথিবী। উপগ্রহটির দক্ষিণ মেরুতে বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে মহাকাশযান পাঠিয়েছে ভারত। এর আগে চাঁদের ওই অংশে কেউ যেতে পারেনি। বিজ্ঞানীদের ধারণা, চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে হিমায়িত পানি থাকতে পারে। এটি পানি, অক্সিজেন ও জ্বালানির উৎস হতে পারে। চাঁদে প্রাণের অস্তিত্ব খুঁজতেও নতুন নতুন গবেষণার সুযোগ তৈরি হতে পারে এই অভিযান থেকে।
তবে সবচেয়ে বড় কথা হলো, চন্দ্রযানের জন্য উদ্ভাবিত নানা প্রযুক্তি গেল ৫০ বছর ধরেই পৃথিবীর মানুষের জীবনকে সহজ থেকে সহজতর করে চলেছে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আর অর্থনৈতিক চমকের এমন প্রতিযোগিতাগুলো শেষ পর্যন্ত মানবজাতির কল্যাণই বয়ে আনবে।
