দেশের অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মতো জাতীয় পার্টিকেও (জাপা) আগামী জাতীয় নির্বাচনে দেখতে চায় ভারত। দেশটি চায়, নির্বাচন কেন্দ্র করে বাংলাদেশে নির্বাচনের আগে ও পরে কোনো নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির তৈরি না হোক। একটি সুন্দর পরিবেশের মধ্যে দিয়ে নির্বাচন হোক ও সেই নির্বাচনে সব রাজনৈতিক দল অংশ নিক।
ভারতের এমন বার্তা নিয়েই চার দিনের সফর শেষ করে গত বুধবার সন্ধ্যায় দেশে ফিরেছেন জাপা চেয়ারম্যান ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা জিএম কাদের। ভারত সরকারের আমন্ত্রণে যাওয়া এ সফরকালে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি।
সফরে নির্বাচন ঘিরে নিজেদের অবস্থানও তুলে ধরেছেন জিএম কাদের। তিনি বলেছেন, জাপা নির্বাচন কেন্দ্র করে কোনো ধরনের ভাঙচুর বা নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি চায় না। তারা নির্বাচনে যাবে, তবে সেটি হতে হবে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন। এ ব্যাপারে ভারতও তাদের সম্মতি জানিয়েছে।
জিএম কাদেরের সফরসঙ্গী এক নেতা ও জাপার কয়েকজন শীর্ষ নেতার সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। তবে এসব নেতা কেউই সফরের সময় জিএম কাদেরের সঙ্গে ভারতীয় কর্মকর্তাদের একান্ত বৈঠকে আর কী ধরনের আলোচনা হয়েছে এবং নির্বাচনে সরকারের সঙ্গে জাপার থাকার বিষয়ে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে কি না, সে ব্যাপারে মুখ খোলেননি। এ ব্যাপারে দেশে ফিরে জিএম কাদেরও মুখ খোলেননি।
গত ২০ আগস্ট ভারত সফরে যান জাপার চেয়ারম্যান ও সংসদ বিরোধীদলীয় উপনেতা জিএম কাদের। স্ত্রী শেরিফা কাদের ও চেয়ারম্যানের আন্তর্জাতিকবিষয়ক উপদেষ্টা মশরুর মাওলা এ সফরে তার সঙ্গে ছিলেন।
এ ব্যাপারে গত বুধবার ঢাকার বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের জিএম কাদের জানান, ভারতে বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে তার খোলামেলা আলোচনা হয়েছে। কিন্তু কার কার সঙ্গে সে আলাপ-আলোচনা হয়েছে এবং কী বিষয়ে হয়েছে, সে সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত কিছু বলতে পারবেন না।
জিএম কাদের বলেন, ‘কেননা, ওই আলাপগুলো ওইভাবেই করা হয়েছে। ওনারা যদি প্রকাশ করতে চান, করবেন। আমার পক্ষ থেকে ওনাদের পারমিশন (অনুমতি) ছাড়া কোনো কথা বলতে পারব না। এ ছাড়া আমি নিজের নৈতিক অবস্থান থেকেও কোনো বৈঠকের বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বাইরে বলি না।’ নিজেদের নির্বাচনী পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন বলে জাপা চেয়ারম্যান জানান।
নির্বাচনে অংশগ্রহণের ব্যাপারে জাপার প্রতি ভারতের আলাদা কোনো নির্দেশনা বা পরামর্শ আছে কি না, জানতে চাইলে মশরুর মাওলা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সব দলের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চাওয়া মানেই জাপাকেও নির্বাচনে চাওয়া। এটার জন্য আলাদা কিছু বলার নেই। ভারত নির্দিষ্ট কোনো দলকে সমর্থন দিচ্ছে না। তারা চাইছে সব দল নির্বাচনে আসুক। জাপাও নির্বাচন করবে। বিএনপিসহ সব নিবন্ধিত দলও যাতে নির্বাচনে আসে, সেটাই তাদের মূল বার্তা। এ নেতা বলেন, ভারত প্রত্যাশা করে সরকার সুষ্ঠু নির্বাচন দেবে। জাপাও সেটাই চায়।
এ বিষয়টি আরেকটু পরিষ্কার করে জাপার এক শীর্ষ নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সফরের সময় জিএম কাদেরের সঙ্গে ভারতের কর্মকর্তাদের একান্ত গোপন বৈঠকও হয়েছে। তবে সেখানে কী আলোচনা হয়েছে, সে ব্যাপারে এখন পর্যন্ত পার্টির কাউকে জানাননি তিনি।
জাপার প্রতি ভারতের এ চাওয়া কতটুকু গুরুত্ব পাবে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জাপার আরেক শীর্ষ নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভারতের সঙ্গে জাপার সম্পর্ক ভালো। জাপার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে এবং প্রয়াত চেয়ারম্যান এরশাদ ও বর্তমান চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের পাশে থাকার সুবাদে বুঝতে পেরেছি জাপা ভারতের ব্লকের। সুতরাং জাপার কাছে ভারতের ও ভারতের কাছে জাপার গুরুত্ব আছে।’
এমনটা ইঙ্গিত দিলেন জাপা চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মশরুর মাওলাও। তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের আগে ভারত সফরে যাওয়ার ইতিহাস অন্যান্য দলেরও আছে। আওয়ামী লীগও গেছে। জাতীয় পার্টি গেছে। যাবে স্বাভাবিক। কারণ ভারত আমাদের পাশের দেশ, বন্ধু দেশ। তাদের বাদ দিয়ে তো আমরা কিছু করতে পারব না। আমাদের দেশে কিছু নৈরাজকতা হলে ভারতের জন্য ক্ষতি হবে। সেটাও ভারত ভালো করে বোঝে। ভারত কখনই বাংলাদেশের অমঙ্গল চায় না, মঙ্গলই চায়।’
সফরে জাপা কতটুকু গুরুত্ব পেল জানতে চাইলে মশরুর মাওলা বলেন, ‘ভারতের এ সফরের মধ্য দিয়ে এটি প্রমাণ হয়েছে যে বাংলাদেশের রাজনীতিতে জাপার অবস্থান শক্ত ও গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় পার্টি একটি নিবন্ধিত দল। সংসদের বিরোধী দল হিসেবে আছে। শক্তিশালী দল।’
এ ব্যাপারে জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য আলমগীর সিকদার লোটন দেশ রূপান্তরকে বলেন, জিএম কাদেরের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টিকে উদীয়মান রাজনৈতিক দল হিসেবে বিবেচনা করেছে ভারত। বলেছে, জাপার ভবিষ্যৎ ভালো। দেশটি জাতীয় পার্টিকে সহযোগিতা করতে চায়।
পাশাপাশি এ সফরকে ইতিবাচক বলে মনে করছেন জাপার এই নেতা। তিনি বলেন, যখনই কোনো সফর হয়, তখন ইতিবাচকই হয়, নেতিবাচক হয় না। এতে উভয়ের স্বার্থ সংরক্ষিত থাকে। অনেক ধরনের আলোচনা হয়। তারপর একটা অবস্থানে পৌঁছে সিদ্ধান্ত হয়। উভয় উভয়ের অবস্থান ধরে রাখে।
সামনে নির্বাচন কেন্দ্র করে এ সফরে নির্বাচনই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে বলে জানান এই নেতা। তিনি বলেন, ‘কারণ আওয়ামী লীগের অবস্থান তেমন ভালো নয়। আগে স্যারকে (প্রয়াত চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ) ডেকে নিতেন, কথা বলতেন। এখন যেহেতু কাদের সাহেবের নেতৃত্বে জাপা চলছে, তাই সফরে তিনি গেছেন। এ সফরের মধ্য দিয়ে আমরা একটা বিষয় বলতে পারি যে, আগামী নির্বাচনে জাপা জিএম কাদেরের নেতৃত্বে নির্বাচনে অংশ নেবে এবং সেটা হতে হবে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন।’
