এনআইডি সংশোধনে বছর পার

আপডেট : ২৬ আগস্ট ২০২৩, ০২:২৬ এএম

ভোগান্তির আরেক নাম হয়ে উঠেছে জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) ভুল সংশোধন প্রক্রিয়ার। এনআইডি সংশোধন করতে গিয়ে পদে পদে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে অনেককে। নির্বাচন কমিশনের এনআইডি অনুবিভাগ নতুন এনআইডি তৈরি ও ভুল হলে তা সংশোধন করে। সংশোধনের ক্ষেত্রে কর্মকর্তারা একের পর এক নানারকম কাগজ চেয়ে থাকেন। সঠিক কাগজ উপস্থাপনের পরও সংশোধন করতে হয়রানি হতে হয় নাগরিকদের।

রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন কমিশন অফিসের ইলেকটোরাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (ইটিআই) ভবনের নিচে প্রতিদিনই থাকে মানুষের জটলা। তথ্যকেন্দ্রের সামনে থাকে লম্বা সারি। সরেজমিনে এনআইডি সংশোধন, হারিয়ে যাওয়ার পর নতুন করে তুলতে আসা লোকজনের ভিড় লেগে থাকতে দেখা যায়। সপ্তাহখানেক আগে এনআইডি ট্রান্সফার সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে আগারগাঁওয়ে আসেন নুরুল ইসলাম গাজী। এ সময় তার সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। তিনি বলেন, তার বড় ভাই আগে ধানম-ির ভোটার ছিলেন। গত কয়েক বছর ধরে বেশ অসুস্থ। তাই তিনি গ্রামে চলে যাবেন। তার এনআইডি ঢাকা থেকে চাঁদপুরের কচুয়াতে গ্রামের ঠিকানায় ট্রান্সফার করতে এসেছিলেন। তাকে বলা হয়, উপজেলা নির্বাচন কার্যালয়ে যোগাযোগ করতে। সেখানে যাওয়ার পর কিছু কাগজপত্র দিতে বলা হয়। যেমন জন্ম নিবন্ধন, বিদ্যুৎ বিলের কাগজ, প্রত্যয়নপত্র। ইউনিয়ন পরিষদে গেলে বলা হয় জন্ম নিবন্ধন অনলাইন করা নেই। এটা অনলাইন করতে হবে। তারা নানা অজুহাতে ঘুরাতে থাকে। বেশ কয়েক দিন পর জন্ম নিবন্ধন ও প্রত্যয়নপত্র দেওয়া হয়। তার জন্য বাড়তি টাকাও দিতে হয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী সব কাগজ জমা দিয়েছেন। এখন অপেক্ষা করছেন, কবে ট্রান্সফার হবে।

তিনি বলেন, ‘আমাদের পরিবারের প্রায় সবারই এনআইডিতে সমস্যা রয়েছে। এর আগে আমার আইডি কার্ডে মায়ের নামের বানান ভুল ছিল। বানান ঠিক করতে আবেদন করার পর তারা বলেছিল ১৫ দিন সময় লাগবে। কিন্তু সংশোধিত এনআইডি ছয় মাস সময় লেগেছে। আমাকে পাঁচ থেকে সাতবার নির্বাচন কমিশনে যেতে হয়েছে। পরিবারের আরও কয়েকজনের একই অবস্থা। মনে হয় জীবনের বাকি সময় এই ভুল সংশোধন করতে কেটে যাবে।’

জন্মতারিখ সংশোধন করতে এক বছর ধরে নির্বাচন কমিশনের বারান্দায় ঘুরছিলেন নোয়াখালীর আশ্রাফ উদ্দিন। জন্ম নিবন্ধন সনদ অনুযায়ী তার জন্ম ১৯৮২ সালে কিন্তু এনআইডি কার্ডে ১৯৭৭ সাল। স্থানীয় নির্বাচন অফিসে গেলে তাকে ঢাকায় পাঠানো হয়। সেখান থেকে কুমিল্লা আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয়ে যোগাযোগ করতে বলা হয়। সেখানে যাওয়ার পর তারা আবার নিজ জেলায় যোগাযোগ করতে বলে।

আশ্রাফ উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এক বছর আমাকে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে হয়েছে। অনেক কর্মকর্তার হাতে-পায়েও ধরতে হয়েছে। নানা জায়গায় হয়রানি ও টাকা খরচ হয়েছে। শেষ পর্যন্ত সংশোধন হয়েছে।’

জাতীয় পরিচয়পত্র ও সংরক্ষিত তথ্য-উপাত্ত (সংশোধন, যাচাই ও সরবরাহ) প্রবিধানমালা ২০১৪-এর প্রবিধি ২(৫) অনুযায়ী, এনআইডি সংশোধন আবেদনের ক্ষেত্রে ৪টি শ্রেণি (ক্যাটাগরি) করা হয়েছে। ক ক্যাটাগরির আবেদন নিষ্পত্তির জন্য উপজেলা-থানা নির্বাচন কর্মকর্তা, খ ক্যাটাগরির আবেদনের জন্য জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা, গ  ক্যাটাগরির আবেদনের জন্য আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা এবং ঘ ক্যাটাগরির আবেদন নিষ্পত্তির জন্য এনআইডি উইংয়ের মহাপরিচালককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

এর মধ্যে ক, খ, গ ক্যাটাগরিতে এবং সব থেকে বেশি গ ও ঘ ক্যাটাগরিতে হয়রানির শিকার হচ্ছেন নাগরিকরা। মাসের পর মাস আবেদন জমা থাকছে। আবেদন প্রক্রিয়া ডিজিটাল হলেও নাগরিকরা এর সুফল ঠিকমতো পাচ্ছে না।

আগারগাঁওয়ে এনআইডি অফিসে আসা একজন ভুক্তভোগী শাহে আলম বলেন, ‘আমার ভোটার আইডি (এনআইডি) কার্ডে নামের বানান ভুল ছিল। তারা যেসব কাগজপত্র চেয়েছে সবই জমা দিয়েছি। এখন শুনানির জন্য ডেকেছে। গত সপ্তাহে আসার পর তারা বলেছে এ সপ্তাহে আসতে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সিরিয়াল পাইনি।’

নামের বানান ভুল নিয়ে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী জাকিয়া ইসলামকে। তার জন্মস্থান সিলেট। জাকিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। তাই দেশে এসেছি নবায়ন করে ই-পাসপোর্ট করতে। সবকিছু ঠিকঠাক করে পাসপোর্ট নবায়নের জন্য জমা দিলে সেখান থেকে বলা হয় আমার এনআইডি ভুল। জন্মতারিখ মিলছে না। স্থানীয়ভাবে সমস্যা সমাধান করার চেষ্টা করা হলেও তারা কিছুই করতে পারবে না বলে জানায়। তাদের পরামর্শে ঢাকায় নির্বাচন ভবনে এসে কয়েক দিন ঘুরেছি, কাগজপত্র সবই জমা দিয়েছি। এখন অপেক্ষায় আছি কবে নাগাদ ঠিক হয়।’

রাজধানীর বসিলা থেকে আসা মজিবুর হক নামে এক ভুক্তভোগী জানান, তারা জন্মতারিখ এবং নামের বানানে ভুল রয়েছে। নির্বাচন কমিশনে এলে জন্ম নিবন্ধন ও এসএসসির সার্টিফিকেট আনতে বলা হয়। তিনি বলেন, ‘আমি ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়াশোনা করেছি। আমার তো ম্যাট্রিক পাসের সার্টিফিকেট নেই। আমি এই সার্টিফিকেট কোথায় পাব।’

দেশে বর্তমানে ভোটার সংখ্যা ১১ কোটি ৯১ লাখ ৫১ হাজার ৪৪০। এর মধ্যে অনেকেরই এনআইডিতে কোনো না কোনো সমস্যা রয়েছে। এসব সমস্যা সমাধান করতে এসে যাতে নাগরিকের ভোগান্তি না হয়, সেজন্য ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে বিকেন্দ্রীকরণ করা হয় জাতীয় পরিচয়পত্র প্রাপ্তির সেবা কার্যক্রম। এনআইডি সংশোধন, হারানো কার্ড উত্তোলন এবং নতুন কার্ড মুদ্রণে উপজেলা, জেলা ও আঞ্চলিক নির্বাচন অফিস এবং জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন অনুবিভাগের (এনআইডি) কার কী ক্ষমতা তা-ও নির্ধারিত হয় প্রজ্ঞাপনে। এসএসসি সনদধারীরা কিছুটা সেবা পেলেও, যাদের কোনো সনদ নেই তাদের বেশি বেগ পেতে হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত