গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যেই সরকারের পদত্যাগের এক দফার দাবি আদায়ে গতকাল শুক্রবার রাজধানী ঢাকায় কালো পতাকা গণমিছিল করেছে বিএনপি। এ কর্মসূচিতে দলটির নেতারা ব্রিকসের সদস্য পদ না পাওয়া, দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়ে নৌকায় ভোট চাওয়াসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকারের সমালোচনা করেছেন। বিএনপি নেতারা বলেছেন, বহির্বিশ্ব আজ দেশের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করছে।
রাজধানীর শ্যামলীতে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির উদ্যোগে কালো পতাকা গণমিছিল-পূর্ব সংক্ষিপ্ত সমাবেশ হয়। অন্যদিকে দক্ষিণের মিছিল-পূর্ব সমাবেশ হয় নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে।
ঢাকা উত্তর বিএনপি : মিছিলের আগের সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির আহ্বায়ক আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ‘ঢাকঢোল পিটিয়ে জনগণের টাকা খরচ করে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেখানে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনে ব্রিকসের সদস্য হতে না পেরে তার ক্ষোভ ঝেড়েছেন বিএনপিকে গালিগালাজ করে ও প্রবাসীদের কাছে নৌকায় ভোট চেয়ে।’
এদিকে দিক ঘুরে কোনো লাভ হবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তৃতীয় কোনো দেশে গিয়ে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয় না।’
সাবেক এ মন্ত্রী বলেন, ‘এক দফার আন্দোলন সামনে রেখে সরকার বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিচ্ছে। নেতাকর্মীদের খালি হাতে তুলে নিয়ে অস্ত্র ধরিয়ে গ্রেপ্তার দেখানো হচ্ছে। এরপর আবার নতুন করে জঙ্গি খেলা খেলছে। আওয়ামী লীগের চেয়ে বড় জঙ্গি কোনো দল নেই।’
প্রশাসনকে ঘিরে সরকারের পরিকল্পনা নিয়ে আমীর খসরু বলেন, ‘আগামীতে ক্ষমতায় টিকে থাকতে সরকার প্রশাসন এবং বিচারকদের দিয়ে শাসনব্যবস্থা তৈরি করেছে। বিচারকদের দিয়ে বিরোধীদলীয় নেতাদের সাজা দিচ্ছে, পুলিশ দিয়ে গ্রেপ্তার করে মিথ্যা মামলা দিচ্ছে। এসব করে কোনো লাভ হবে না।’
ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমানউল্লাহ আমানের সভাপতিত্বে সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা জয়নুল আবদীন ফারুক, যুগ্ম মহাসচিব হাবিবুন নবী খান সোহেল প্রমুখ।
ঢাকা দক্ষিণ বিএনপি : বেলা ৩টায় রাজধানীর নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির উদ্যোগে গণমিছিল হওয়ার কথা থাকলেও বৃষ্টির কারণে মিছিল শুরু হয় বিকেল সাড়ে ৪টায়। মিছিল-পূর্ব সংক্ষিপ্ত সমাবেশের জন্য কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ট্রাকের ওপর অস্থায়ী মঞ্চ তৈরি করা হয়।
অস্থায়ী মঞ্চে দেওয়া সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস ভারতকে উদ্দেশ্যে করে বলেন, ‘বহির্বিশ্ব আজ দেশের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করছে। একটি দেশ বলছে এ সরকারকে আবার লাগবে। আমি বলতে চাই, সরকার নয়, দেশের জনগণের সঙ্গে বন্ধুত্ব করুন। আজ এ সরকারের অধীনে নির্বাচন দেশের জনগণ মানে না। বিনা ভোটের নির্বাচনের স্বপ্ন আর বাস্তবায়ন করতে দেওয়া হবে না।’
তিনি বলেন, ‘দেশে তিনটি শিক্ষাব্যবস্থা রয়েছে। সেগুলো হলো অশিক্ষা, কুশিক্ষা আর সুশিক্ষা। আজকে জনগণের টাকায় বেতন নিয়ে কুশিক্ষিতরা বিরোধী নেতাকর্মীদের ওপর গুলি চালাচ্ছে। এই কুশিক্ষিতরা বিচারের নামে প্রহসন করছে। তারা জেলখানায় বিরোধী নেতাকর্মীদের পিটিয়ে হত্যা করছে। এই কুশিক্ষিত লোকগুলো দেশকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তারা দেশকে ভালোবাসে না, টাকাকে ভালোবাসে।’
মির্জা আব্বাস বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে দ্রব্যমূল্য, তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদ জানিয়ে আসছি। সরকার কানে শোনে না। আজকে প্রতিটি ডিমের দাম ১৫ টাকা। এদের দুর্নীতির কারণে টাকার মান কমে গেছে। যারা ব্যাংকে টাকা রেখেছেন, তারা লাভের পরিবর্তে ১৪ শতাংশ টাকা কম পাবেন। আজকে বিদ্যুতের কার্ড থেকেও হাজার হাজার কোটি টাকা লুট হচ্ছে। আজকে বর্তমান সরকার ব্রিটিশ ও পাকিস্তানিদের চেয়ে বেশি লুট করেছে। কারণ তাদের মধ্যে দেশপ্রেম নেই।’
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক আবদুস সালামের সভাপতিত্বে ও যুগ্ম আহ্বায়ক লিটন মাহমুদ ও আ ন ম সাইফুল ইসলামের পরিচালনায় সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ভাইস চেয়ারম্যান বরকতউল্লা বুলু, মোহাম্মদ শাহজাহান, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী প্রমুখ।
বিএনপির কালো পতাকা মিছিলের অগ্রভাগে অংশ নেন মহিলা দল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। এরপর পর্যায়ক্রমে স্বেচ্ছাসেবক দল, যুবদল, কৃষক দল, মুক্তিযোদ্ধা দল, তাঁতী দল ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির নেতাকর্মীরা ছিলেন। নয়াপল্টন থেকে শুরু হয়ে কালো পতাকা গণমিছিল মতিঝিল, ইত্তেফাক মোড়, টিকাটুলী, দয়াগঞ্জ মোড় ঘুরে নারিন্দায় গিয়ে শেষ হয়।
অন্যান্য দলের কর্মসূচি : বিএনপির পাশাপাশি সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোও কালো পতাকা গণমিছিল কর্মসূচি পালন করেছে। গণতন্ত্র মঞ্চ শাহবাগ মোড়ে, ১২ দলীয় জোট বিজয়নগর পানির ট্যাংকির সামনে, জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট পুরানা পল্টন মোড়সংলগ্ন আলরাজী কমপ্লেক্সে সামনে, গণফোরাম ও বাংলাদেশ পিপলস পার্টি (বিপিপি) যৌথভাবে আরামবাগে, এলডিপি পূর্ব পান্থপথ দলীয় কার্যালয়ের সামনে, লেবার পার্টি জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে, একই স্থানে গণ অধিকার পরিষদ (রেজা কিবরিয়া) ও সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ, গণ অধিকার পরিষদ (নুর) পুরানা পল্টনে দলীয় কার্যালয়ের সামনে কর্মসূচি পালন করে। এ ছাড়া এনডিএম মালিবাগ মোড়ে দলীয় কার্যালয়ের সামনে, গণতান্ত্রিক বাম ঐক্য সেগুনবাগিচা হাই স্কুলের সামনে, এবি পার্টি বিজয়নগর শ্রমভবনের সামনে, এনডিপি পুরানা পল্টনে আলরাজী কমপ্লেক্সের সামনে, জনতার অধিকার পার্টি বিজয়নগর পানির ট্যাংকির সামনে এবং সমমনা পেশাজীবী গণতান্ত্রিক জোট জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে থেকে ‘কালো পতাকা গণমিছিল’ করে।
গত ১২ জুলাই এক দফা আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণার পর এ পর্যন্ত ঢাকায় পদযাত্রা, মহাসমাবেশ, ঢাকার প্রবেশমুখে অবস্থান কর্মসূচি, ঢাকায় গণমিছিল, মহানগরে গণমিছিলের কর্মসূচি করে। সর্বশেষ গত ১৮ আগস্ট ঢাকাসহ সারা দেশের মহানগরে গণমিছিল করে বিএনপিসহ সমমনা রাজনৈতিক দলগুলো।
