বদিউল আলম মজুমদার একজন অর্থনীতিবিদ, স্থানীয় সরকার ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ এবং উন্নয়নকর্মী। তিনি সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর সম্পাদক। নির্বাচন পদ্ধতি, নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দল ও রাজনীতিকদের সম্পর্কে তিনি কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সম্পাদকীয় বিভাগের সাঈদ জুবেরী
দেশ রূপান্তর : আমাদের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পদ্ধতিগত বিষয় নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী? এর সীমাবদ্ধতাটাই বা কেমন?
বদিউল আলম মজুমদার : আমাদের তো First past the post system। অর্থাৎ নির্বাচনী এলাকায় প্রার্থীদের মধ্যে যিনি সর্বোচ্চ ভোট পাবেন তিনি নির্বাচিত হবেন। এটার সীমাবদ্ধতা এখন সর্বজনবিদিত। প্রথমত সামান্য ভোটের ব্যবধানেই যে কেউ বিরাট সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে যায়। এতে ভোটের সামন্যতম পার্থক্য সত্ত্বেও আসনের ক্ষেত্রে বিরাট পার্থক্য হতে পারে। আরেকটা সমস্যা হলো, যেহেতু আসনভিত্তিক সেহেতু দ্বন্দ্ব, হানাহানি, মারামারি, ভোট জালিয়াতির প্রবণতা বেশি হয়। সহিংসতার সম্ভাবনা থাকে ব্যাপক। এই পদ্ধতিতে যারাই একবার নির্বাচিত হন তাদের অনেকটা চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত হয়ে যায়। তাদের আর সরানো প্রায়শই আর সম্ভবপর হয় না। আরেকটা দুর্বলতা হলো যারা ধনী, অর্থকড়ির মালিক এই পদ্ধতি তাদের জন্য সুবিধাজনক। তারা মনোনয়ন কিনে এবং টাকা-পয়সা খরচ করে নির্বাচন জিততে পারে। এখানে জনপ্রিয়তা অনেক ক্ষেত্রে বিবেচিত হলেও যোগ্যতা গুরুত্ব পায় না। এমন অনেকগুলো দুর্বলতার কথা বলা যায় যেগুলো আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কার্যকারিতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।
দেশ রূপান্তর : রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নির্বাচনী খরচ সংগ্রহ ও ব্যয়ের মধ্যে কোনো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নেই। বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?
বদিউল আলম মজুমদার : স্বচ্ছতা, জবাবদিহি তো কোথাও নেই। পুরো দেশেই এই দুটির অভাব। একটা হলো নিম্নমুখী দায়বদ্ধতা, জবাবদিহি। অর্থাৎ ভোটারের কাছে জবাবদিহি, ভোটারের কাছে দায়বদ্ধতা নেই। কারণ আমাদের ভোটাধিকার হরণ করা হয়েছে। এর সমান্তরাল যে দায়বদ্ধতা সংসদসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের কাছে, সেটাও নেই। কারণ নানাভাবে অনির্বাচিতরা এখানে গিয়ে বসেছে। দায়বদ্ধতাহীনতার আরও বড় কারণ হলো আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর অকার্যকারিতা। নির্বাচন কমিশন একটা স্বাধীন সার্বভৌম সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। যেটার জনগণের কল্যাণে, জনগণের স্বার্থে কাজ করার কথা। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমাদের সাংবিধানিক বিধান পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রতিষ্ঠানটিসহ অন্য সব প্রতিষ্ঠানের ব্যাপক দলীয়করণ হয়েছে।
দেশ রূপান্তর : নির্বাচন কমিশন নিয়ে তো আস্থার সংকট আছে। প্রতিষ্ঠানটিকে সত্যিকার অর্থে শক্তিশালী ও কার্যকর করা কি সম্ভব?
বদিউল আলম মজুমদার : এর আগের দুটি নির্বাচন কমিশনে কৌশল করে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, বর্তমান কমিশন করা হয়েছে আইনের বিধানের ব্যত্যয় ঘটিয়ে। কমিশন গঠনে যে আইন হয়েছে, সেটা একটা প্রহসন। মূলত আগের প্রজ্ঞাপনকে একটি দায়মুক্তির বিধানযুক্ত করে আইন বলে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে। অনুসন্ধান কমিটির স্বচ্ছতার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়ার কথা। এখানে কোনো স্বচ্ছতার চর্চা হয়নি। গতবার অন্তত শেষ দশজনের নাম প্রকাশ করেছিল তারা, এবার সেটাও করেনি। এছাড়া এই নির্বাচন কমিশন অনেকগুলো বিতর্কিত কাজ করেছে, ইভিএম থেকে শুরু করে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন দেওয়া পর্যন্ত। কাজেই এই নির্বাচন কমিশনের ওপর ব্যাপক আস্থাহীনতা রয়েছে, তারা নিজেরাও সেটা বলেছে। গাইবান্ধার উপনির্বাচনে রাঘব-বোয়ালদের দায়বদ্ধ না করেও যেসব চুনোপুঁটিদের দায়ী করেছে, অভিযোগ দিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা কমিশনের আছে, কিন্তু তারা সেটা ব্যবহার করে না। পরিস্থিতি এমন যে কমিশন এখন আর নির্বাচন করে না, নির্বাচন চলে গেছে পুলিশ আর প্রশাসনের হাতে।
দেশ রূপান্তর : সংবিধান মোতাবেক যদি আগামী জাতীয় নির্বাচনগুলো রাজনৈতিক সরকারের অধীনেই হয়, তাহলে কি সংবিধান সংশোধন করে নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কমানো উচিত?
বদিউল আলম মজুমদার : আমি মনে করি পঞ্চদশ সংশোধনী যেটা পাস হয়েছে সেটা অসাংবিধানিক। ২০১১ সালের ১০ মে আদালতের সংক্ষিপ্ত আদেশে বলা হয়েছে যে পরবর্তী দুই টার্ম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হওয়ার পরে এটা প্রসপেক্টিভলি বাতিল হবে। এই নির্দেশনা অমান্য করেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করা হয়েছে। আমার মনে হয় সংবিধান থেকে একচুলও না নড়ার সরকারের যে অবস্থান, সেটা দুর্বল। কারণ এটা অসাংবিধানিক। বরং এর মাধ্যমে নির্বাচনী মাঠকে অসমতল করে ক্ষমতায় থাকার চিরস্থায়ী ব্যবস্থা করা হয়েছে।
দেশ রূপান্তর : সংস্কারের জন্য বিএনপি রূপরেখা দিয়েছে, সেখানে বলেছে যে দুইবারের বেশি কোনো ব্যক্তি ক্ষমতায় থাকতে পারবে না। একে কীভাবে দেখছেন?
বদিউল আলম মজুমদার : সংস্কার প্রস্তাব আমরাও দিয়েছি। বিএনপিও দিয়েছে। এর আগে তিনজোটের রূপরেখার সংস্কার প্রস্তাব আছে, তারপর মহাজোটের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনা ২০০৫ সালে অনেকগুলো সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছেন। হ্যাঁ, সংস্কার করা দরকার, এটা ঠিক আছে। এর কোনো বিকল্প নেই। পদ্ধতি প্রক্রিয়ার পরিবর্তন করতেই হবে। কিন্তু সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দরকার হলো আমাদের রাজনীতিবিদদের আচরণের। তারা কোনো কিছুই মানেন না। ক্ষুদ্র ব্যক্তিস্বার্থে, দলীয় ও কোটারি স্বার্থে যেটা দরকার সেটাই তারা করেন। কোনো সংস্কারই কাজ করবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না আমাদের রাজনীতিবিদদের আচরণ, চিন্তায় পরিবর্তন না আসে। এটাই হলো আমাদের বড় সমস্যা।
দেশ রূপান্তর : কিছুটা কি পরিবর্তন আসেনি? এখন বিরোধীদের আন্দোলনের যে অহিংস রূপ এবং সরকার ও পুলিশের যে আচরণ...
বদিউল আলম মজুমদার : এটা তো বিদেশিদের চাপের কারণে হচ্ছে, সবার ঘাড়ের ওপর খড়গ। ভিসানীতি-টিতিসহ এমন নানা কারণে কিছু কিছু পরিবর্তন মনে হচ্ছে। কিন্তু সত্যিকারের কোনো পরিবর্তন, মৌলিকভাবে তাদের কোনো বদল ঘটেনি।
দেশ রূপান্তর : নির্বাচন পদ্ধতি আলাপ শুরু হয়েছিল, দ্বিতীয় যে ব্যবস্থাটি প্রচলিত তা হলো সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা। কিছু বাম ও ইসলামি দলসহ জাতীয় পার্টিও এ পদ্ধতির পক্ষে প্রস্তাব দিয়েছে। আপনি বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?
বদিউল আলম মজুমদার : এটাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছি। অনেক দেশেই এই পদ্ধতি ব্যবহৃত হচ্ছে। আবার অনেক দেশে এটা আছে মিক্সড পদ্ধতি হিসেবে। কিছু First past the post system আর কিছু সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব। যেমন নেপালে, তারা একটা সমন্বিত পদ্ধতি অবলম্বন করেছে।
দেশ রূপান্তর : সংখ্যানুপাতিক হোক বা সমন্বিত, এতে কী ধরনের পরিবর্তন আসবে? বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই পদ্ধতি কতটুকু প্রয়োগযোগ্য?
বদিউল আলম মজুমদার : পদ্ধতি-প্রক্রিয়ার পরিবর্তন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে কারা এই প্রক্রিয়াটা কাজে লাগাবে? তাদের আচরণ, ন্যায়-নীতিবোধের ওপর সব নির্ভর করছে। আমাদের যে বর্তমান নির্বাচনী আইনকানুন, বিধিবিধান আছে এটা ব্যবহার করেই কিন্তু ২০০৮ সালে সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছে। এর আগেও হয়েছে। কিন্তু এখন আমাদের রাজনীতিতিবিদ এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষতা ও ন্যায়নীতির চেতনাবোধই নেই। তাই আপনার প্রশ্ন অনুযায়ী ওটা কার্যকর হবে যদি আমাদের রাজনীতিবিদরা তাদের আচরণে পরিবর্তন আনেন। সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতেও তারা টাকা-পয়সার বিনিময়ে মনোনয়ন দিতে পারেন।
দেশ রূপান্তর : সংখ্যানুপাতিকে সব দলই তাদের মনোনীতদের তালিকা প্রকাশ করবে, ভোটাররা দেখতে পারব যে কাদের তালিকায় কারা আছেন...। এতে মনোনয়ন বাণিজ্য কি একটু কঠিন হয়ে যাবে না?
বদিউল আলম মজুমদার : হ্যাঁ, সেটা বলতে পারেন। এটা অপেক্ষাকৃত ভালো। কিন্তু আমরা তো পুরো জাতিকে বিভক্ত করে ফেলেছি। বিভাজনটা এত প্রকট ও ব্যাপক এবং এখানে কতগুলো সিম্বল আর সেøাগানের ভিত্তিতেই সব হয়। বলা হয়ে থাকে যে কলাগাছ দাঁড় করালেও মার্কা দেখে লোকে ভোট দেয়। বড় দুই দলের মধ্যে কেনো তফাৎ নেই।
দেশ রূপান্তর : প্রায় তিন দশক ধরে দেশে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধি ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা চললেও আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতাদের মুখ থেকে এর পক্ষে-বিপক্ষে কোনো কথা শোনা যায়নি। এর কারণ কী?
বদিউল আলম মজুমদার : কারণ এটা তাদের উভয়েরই স্বার্থের অনুকূল নয়। ওই পদ্ধতিতে তাদের স্বার্থরক্ষা একটু দুরূহ হবে। তাই সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধি ব্যবস্থা নিয়ে কোনো আলাপে তারা এগোয় না।
দেশ রূপান্তর : নির্বাচন নিয়ে নতুন কোনো পদ্ধতি কার্যকর করা কঠিন কেন?
বদিউল আলম মজুমদার : কারণ আমাদের দলগুলোই গণতান্ত্রিক নয়। তারা জনগণের স্বার্থে কাজ করে না। তারা কিছু কর্মসূচি দেয় কিন্তু সেটা তারা বাস্তবায়ন করে না। তারা যে নির্বাচনী ইশতেহার দেয়, সেটা দেওয়ার জন্যই দেয়। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ যে ইশতেহার দিয়েছিল ‘দিন বদলের সনদ’, তার কি বাস্তবায়ন হয়েছে? সেটা বাস্তবায়ন হলেও তো আমরা অনেক পরিবর্তন দেখতে পেতাম। সেখানে সুস্পষ্ট অঙ্গীকার ছিল যে দুর্নীতি, দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার। তার কী হলো? তারা বলেছে দলীয়করণ বন্ধ হবে, সম্পদের হিসাব দেওয়া হবে। এগুলোর কোনটা বাস্তবায়ন হয়েছে?
দেশ রূপান্তর : নিয়ম অনুযায়ী স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা এলাকার উন্নয়ন করবেন। কিন্তু বাংলাদেশে সংসদ সদস্যরা নির্বাচিত হয়ে মূলত এলাকার উন্নয়নমূলক কাজকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে কি এলাকাগুলোর উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হতে পারে?
বদিউল আলম মজুমদার : এটা সংবিধান পরিপন্থী। বিচারপতি খায়রুল হকের একটা রায় আছে এটা নিয়ে। সাংসদদের এই উন্নয়নমূলক কাজ ওই রায়ের পরিপন্থী। তারা আইন মানেন না, বিধি মানেন না। নিয়মনীতি মানেন না।
দেশ রূপান্তর : জনগণও তো এলাকার উন্নয়নের জন্য সাংসদদের দ্বারস্থ হন।
বদিউল আলম মজুমদার : জনগণের তো বিকল্প নেই বলে সাংসদের কাছেই দাবি নিয়ে যেতে হয়। এটা আমাদের বর্তমান নির্বাচনব্যবস্থা বা পদ্ধতিরই একটি দুর্বলতা। এতে কোনো এলাকার উন্নয়ন হয়, কোনোটির হয় না। কিন্তু সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে গেলে পুরো দেশেরই সুষম উন্নয়ন হবে। সাংসদরা এলাকার চিন্তা বাদ দিয়ে সারা দেশ নিয়ে ভাবতে পারবেন। সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে সুষম উন্নয়নের সম্ভাবনা তৈরি হবে।
দেশ রূপান্তর : সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব নির্বাচন করা হলে সেই তালিকায় সাধারণত কেন্দ্রের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা শুরুর দিকে জায়গা করে নেবেন। সেক্ষেত্রে আঞ্চলিক নেতারা পিছিয়ে যেতে পারেন কিনা কিংবা তখন প্রতিনিধিত্ব রাজধানী-কেন্দ্রিক হয়ে যাবে না?
বদিউল আলম মজুমদার : দুটোই হতে পারে। আমরা যদি ন্যায়-নীতিবোধ প্রদর্শন করি, আমরা যদি মানুষের কথা চিন্তা করি, সত্যিকারভাবে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কথা চিন্তা করি; তখন সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতি হলে যারা কেবল অর্থবিত্তের মালিক নন কিন্তু তারা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারেন, পোড় খাওয়া রাজনীতিবিদ তাদের মনোনয়ন পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে একটি বড় দল যদি অবাঞ্ছিত ব্যক্তিদের মনোনায়ন দেয়, অন্য দলও তাই-ই করবে। এটাই বাস্তবতা। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো তো একে অপরের থেকে ভালো জিনিসগুলো শেখে না, অপকর্মের দিক থেকে তারা একে অন্যকে অনুকরণ করে।
দেশ রূপান্তর : আপাত দৃষ্টিতে এই পদ্ধতিতে ছোট দলগুলো লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যায়। তবে দীর্ঘ মেয়াদে প্রত্যেকটি দলের অঞ্চলভিত্তিক কার্যক্রম দুর্বল হয়ে শুধু কেন্দ্রীয় তৎপরতার মধ্যেই রাজনীতি সীমাবদ্ধ হয়ে পড়তে পারে কিনা?
বদিউল আলম মজুমদার : হতে পারে। কিন্তু এগেইন, আমাদের নেতানেত্রীদের আচরণের প্রশ্ন আসে। তারা যদি গণতান্ত্রিক হন তাহলে আপনি যেটা বললেন সেটা হবে না। কিন্তু তারা যদি স্বৈরতান্ত্রিক হন তাহলে তো তারা যা ইচ্ছা তাই-ই করতে পারেন।
দেশ রূপান্তর : যুক্তরাষ্ট্র, ভারতসহ বিশ্বের অনেক দেশে দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভায় তুলনামূলক ইতিবাচক ফল বয়ে আনছে। আপনি কী মনে করেন?
বদিউল আলম মজুমদার : দেখেন উচ্চকক্ষের উদ্দেশ্য হলো যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ও সম্মানিত ব্যক্তিদের নিয়ে আসা, যারা তাদের বুদ্ধি-বিবেচনা খরচ করে আইন প্রণয়নে ভূমিকা রাখতে পারেন। কিন্তু ভারতের দিকে তাকান। দুর্ভাগ্যবশত সেখানে উচ্চকক্ষে যাদের নিয়ে আসা হয় তারাও সব দলীয় লোকজন। রাজনীতিবিদরা রাজনীতি দ্বারা পারিচালিত হবেন, রাজনীতির স্বার্থে কাজ করবেন এটা স্বাভাবিক। উচ্চকক্ষের ধারণা ছিল যে এখানের সদস্যরা জাতির বৃহত্তর স্বার্থে রাজনীতিবিদদের দুর্বলতার কাউন্টার হিসেবে কাজ করবেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে সেটা কাজ করছে না। অবশ্য এখন অনেকে অন্য কথা বলছে। সেই প্রাচীন গ্রিসে যেমন, তারা তো নির্বাচন করে প্রতিনিধি করেনি। তারা নাগরিকদের থেকে প্রতিনিধি বেছে নিয়েছে। এখন এমনও কথা হচ্ছে যে, এইরকম দল ও দলীয় মনোনয়ন বাদ দিয়ে নাগরিকদের মধ্য থেকে লটারি করে প্রতিনিধি করলে বেটার মানুষজন সংসদে যাবেন। মানে তাহলে বেটার পিপল উইল রান দি গভার্নমেন্ট। ইনফ্যাক্ট, আমি মনে করি যে এটাও হতে পারে আপনার তিন পদ্ধতির সমন্বয়ও হতে পারে। একটা অংশ হলো যে সংখ্যানুপাতিক, একটা অংশ হলো প্রার্থীদের মধ্যে যিনি সর্বোচ্চ ভোট পাবেন সেভাবে এবং আরেকটা অংশ হলো মিনিমাম কিছু যোগ্যতার ভিত্তিতে প্যানেল তৈরি করে লটারির মাধ্যমে প্রতিনিধি হবেন। মানে এক-তৃতীয়াংশ সংখ্যানুপাতিক, এক-তৃতীয়াংশ কনস্টিটিউয়েন্সি ভিত্তিক এবং এক-তৃতীয়াংশ লটারির মাধ্যমে। এখন রাজনীতি যেমন পুরোপুরি দুর্বৃত্তায়িত, এর কাউন্টার ব্যালেন্স করতে হলে তেমন ব্যক্তিদের যুক্ত করতে হবে যারা সংসদে ওই দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতি ও অনুগত্যের ঊর্ধ্বে উঠে ভূমিকা রাখতে পারবে।
