২৩১২ একর ভূমি নিয়ে দেশের সবচেয়ে বড় ক্যাম্পাস চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। পাহাড়ি উঁচু-নিচু ও আঁকাবাঁকা পথ আর সবুজ সমারোহে ঘেরা প্রাকৃতিক দৃষ্টিনন্দনে ভরপুর এমন ক্যাম্পাস মুগ্ধ করবে যে কাউকে। রয়েছে বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলও। তবে বিপত্তি ঘটেছে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে। এমন অসচেতনতা ও পরিবেশের মারাত্মক বিপর্যয় দেখে বিষয়টি ভাবিয়ে তোলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থীকে। তারা সিদ্ধান্ত নেন সবার মাঝে পরিচ্ছন্ন ক্যাম্পাসের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার। গঠন করেন ‘ক্লিন ক্যাম্পাস’ নামের সংগঠন। লিখেছেন অহিদুল ইসলাম অন্তর
শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বসবাস করে প্রায় ত্রিশ হাজারের মতো মানুষ। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশাল এই পরিবারের ব্যবহার করা বর্জ্য পদার্থ ফেলা হচ্ছে যত্রতত্র। এ বিষয়ে বিশ^বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নেই সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা কিংবা সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার অভাবে যত্রতত্র পড়ে থাকে পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর প্লাস্টিক পদার্থ, পলিথিনসহ নানারকম ময়লা-আবর্জনা। যা সৃষ্টি করছে দুর্গন্ধ, নষ্ট করছে মাটির উর্বরতা এবং ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে পরিচ্ছন্ন পরিবেশের। উপরন্তু পরিবেশের মারাত্মক বিপর্যয় ও হুমকির মুখে পড়েছে বিদ্যালয় ক্যাম্পাস।
যেভাবে শুরু
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার সময় সারাদেশ থেকে ক্যাম্পাসে আসেন ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবক। ক্যাম্পাসে যথাযথ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না থাকায় অভিভাবকদের সমালোচনা শুনে চারুকলার শিক্ষার্থী আকলিমা আকতার এ বিষয়ে উদ্যোগী হন। তিনি আলোচনা করেন সহপাঠীদের সঙ্গে। তার আহ্বানে সাড়া দেন বেশ কিছু সচেতন শিক্ষার্থী। স্বেচ্ছায় শুরু করেন পরিচ্ছন্নতা অভিযান। নিজেদের টাকায় কেনা- হাতে সাধারণ গ্লাভস আর মাস্ক পরেই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পয়েন্টে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম শুরু করেন তারা। ধীরে ধীরে তাদের কার্যক্রমে এগিয়ে আসতে থাকেন অন্য শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। প্রায় ছয় মাস কোনো সংগঠন ছাড়াই কাজ করার পর উদ্যোক্তারা সিদ্ধান্ত নেন একে সাংগঠনিক রূপ দেওয়ার। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোরশেদুল আলম এবং সহযোগী অধ্যাপক মোজাম্মেল হকের সহায়তা ও পরামর্শে গঠন করেন ‘ক্লিন ক্যাম্পাস’। ২০১৯ সালের এপ্রিলে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু হয় ‘ক্লিন ক্যাম্পাস-চবি’ নামে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম পরিবেশবাদী সংগঠন। সংগঠনটি কাজ করে ক্যাম্পাসে পরিচ্ছন্ন পরিবেশ বজায় রাখতে। তাদের কাজের ধরন দুটি। এক. ক্যাম্পাস পরিষ্কার-পরিচ্ছন রাখতে পরিচ্ছন্নতা অভিযান, দুই. শিক্ষার্থীদের মাঝে পরিবেশবিষয়ক সচেতনতা তৈরি।
ক্লিন ক্যাম্পাসের কর্মসূচি
ক্লিন ক্যাম্পাসের সভাপতি লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী তাহলিল সাকিব জানান, শুরু থেকেই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং ক্যাম্পাসের পরিচ্ছন্নতায় যথাসাধ্য পরিষ্কার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। তাদের কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে ডাস্টবিন স্থাপন, বিভিন্ন সময়ে পরিষ্কার অভিযান, পরিচ্ছন্নতায় শিক্ষার্থীদের সচেতনতা তৈরি, শিক্ষার্থীদের বৃক্ষরোপণে উদ্বুদ্ধ করা ইত্যাদি। এ ছাড়াও ক্যাম্পাসের কোথাও যাতে বৃক্ষনিধন না হয় সেদিকেও সজাগ দৃষ্টি রাখেন ক্লিন ক্যাম্পাসের সদস্যরা।
ডাস্টবিন স্থাপন
নিজেদের অর্থায়নে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে (লেডিস ঝুপড়ি, শহীদ মিনার, সমাজবিজ্ঞান ঝুপড়ি, বঙ্গবন্ধু উদ্যান) দশটি বিন স্থাপন করেছে ক্লিন ক্যাম্পাস। এ ছাড়াও বিভিন্ন জেলা অ্যাসোসিয়েশন এবং ক্লিন ক্যাম্পাসের যৌথ দাবিতে আরও বিশটি বিন স্থাপন করেছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। যা ক্যাম্পাসের আয়তনের তুলনায় খুবই নগণ্য। তবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি রয়েই গেছে।
পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও সচেতনতা বৃদ্ধি
শুরু থেকেই পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে ‘ক্লিন ক্যাম্পাস’। কখনো মাসব্যাপী কিংবা কখনো নির্ধারিত কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্থানে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানোসহ শিক্ষার্থীদের সচেতন করতে কাজ করে যাচ্ছেন তারা। ক্লিন ক্যাম্পাস শিক্ষার্থীদের নির্দিষ্ট জায়গায় ময়লা ফেলার আহ্বান জানান। এ ছাড়াও ক্যাম্পাসের খোলা জায়গায় বৃক্ষরোপণ করে যাচ্ছেন তারা। ক্লিন ক্যাম্পাসের ছাত্র উপদেষ্টা মারুফ ইসলাম বলেন, ক্যাম্পাসের বাসিন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তারা যদি যত্রতত্র ময়লা আবর্জনা ফেলা বন্ধ করে এবং নির্দিষ্ট বিনে ময়লা ফেলে তবে ক্যাম্পাসের চেহারা পাল্টে যাবে অনেকাংশে। তা ছাড়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়লে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও এ বিষয়ে আরও সচেতন হবে। সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়নে জোর দেবে।
চাইলে হওয়া যাবে স্বেচ্ছাসেবক
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যেকোনো শিক্ষার্থী চাইলেই যুক্ত হতে পারবেন ক্লিন ক্যাম্পাসের সঙ্গে। প্রক্রিয়াও খুব সহজ। যেকোনো পরিচ্ছন্নতা অভিযানে সরাসরি অংশ নেওয়ার মাধ্যমেই যুক্ত হওয়া যায় ক্লিন ক্যাম্পাসের সঙ্গে। বর্তমানে সংগঠনের সক্রিয় সদস্য সংখ্যা ৭০ জন। কিন্তু এত বড় ক্যাম্পাসের তুলনায় সংখ্যাটি খুব বেশি নয়। কাজের পরিধি বৃদ্ধি করতে দরকার পর্যাপ্ত স্বেচ্ছাসেবক।
সংগঠনের আয়-ব্যয়
সম্পূর্ণ স্বঅর্থায়নে পরিচালিত হয় ক্লিন ক্যাম্পাস। পরিচ্ছন্নতা অভিযানের সময় সদস্য ও স্বেচ্ছাসেবকরা যে মাস্ক ও গ্লাভস ব্যবহার করেন তা সংগঠনের সদস্যদের চাঁদার টাকায় কেনা হয়। নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী চাঁদা দিয়ে দশটি বিন কিনে কয়েকটি জায়গায় স্থাপন করেছেন তারা। কিন্তু অর্থের অভাবে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালানোর প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহ করতে পারছেন তারা। ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে গ্লাভস পরে হাত দিলে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালিয়ে নিতে হচ্ছে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা সম্পর্কে ক্লিন ক্যাম্পাসের ছাত্র উপদেষ্টা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থী মারুফ ইসলাম জানান, পুরো ক্যাম্পাসে ডাস্টবিন স্থাপন এবং সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে একটি সুন্দর ক্যাম্পাসের দাবিতে কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে তাদের। তবে স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষার্থীদের পক্ষে সম্ভব নয় এই কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার। উদ্যোক্তাদের আশা, একটি সুন্দর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস গঠনে এগিয়ে আসবেন চবি প্রশাসন।
