আবহাওয়া অধিদপ্তর থেকে ভারী বর্ষণের কোনো সতর্কতা ছিল না। কিন্তু তারপরও গত শনিবার মধ্যরাতের পর থেকে শুরু হয় একটানা বর্ষণ। গতকাল বিকাল ৩টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় নগরীতে (আমবাগান কেন্দ্র) ২১৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে অধিদপ্তর। এই বৃষ্টির প্রায় সবটাই হয়েছে শনিবার মধ্যরাতের পর থেকে গতকাল সকাল পর্যন্ত। আর এই বৃষ্টিতে নগরী ডুবেছে। পাহাড় ধসে মারা গেছে বাবা-মেয়ে। দুর্যোগের কারণে পিছিয়ে দেওয়া চট্টগ্রাম বোর্ডের এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হয়েছে এক ঘণ্টা দেরিতে।
এ ছাড়া পাহাড়ি ঢল নামায় বন্ধ হয়ে যায় চট্টগ্রামের সঙ্গে রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ির সড়ক যোগাযোগ।
এর আগে গত ৪ থেকে ৭ আগস্ট পর্যন্ত নগরী প্রায় জলমগ্ন ছিল। সেই দুর্ভোগের ২০ দিন অতিবাহিত না হতেই আবারও সেই জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ। বৃষ্টি হলেই নগরীতে পানি জমে। এই দুর্ভোগের যেন শেষ নেই।
বৃষ্টিপাত বিষয়ে কথা হয় আবহাওয়া অধিদপ্তর পতেঙ্গা কার্যালয়ের সহকারী আবহাওয়াবিদ সুমন সাহার সঙ্গে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পতেঙ্গার তুলনায় শহরের ভেতরে বৃষ্টিপাত বেশি রেকর্ড হয়েছে। গতকাল বিকাল ৩টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় পতেঙ্গা কেন্দ্রে ১৬২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হলেও শহরের ভেতরের আমবাগান কেন্দ্রে রেকর্ড হয়েছে ২১৭ মিলিমিটার।’
ভারী বর্ষণের কোনো সতর্কতা না থাকার পরও এত বেশি বৃষ্টিপাত হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বর্ষাকালে আচমকা এমন ভারী বর্ষণ হয়ে থাকে। কাল সোমবার (আজ) আবার বৃষ্টিপাতের কোনো পূর্বাভাস নেই। শনিবার মধ্যরাতের পর থেকে সকাল পর্যন্ত বৃষ্টি হওয়ার পর সারা দিন কিন্তু বৃষ্টিপাত খুবই কম হয়েছে।’
বৃষ্টি হলেই নগরীতে পাহাড় ধসের ঝুঁকি দেখা দেয়। তবে প্রথম দিকের বর্ষণে এমন ধস হয় না। বর্ষাজুড়ে বৃষ্টিতে পাহাড়ের মাটি নরম হয়। আর মাটি নরম হয়ে যাওয়ার পর বৃষ্টি হলেই পাহাড় ধসের ঝুঁকি বেড়ে যায় বহুগুণ।
গতকাল সকাল ৭টার দিকে নগরীর ষোলশহর রেলওয়ে স্টেশনের পেছনে আইডব্লিউ কলোনির পাশের একটি পাহাড় ধসে পড়ে। আর সেই ধসে সাত মাস বয়সী শিশু জান্নাত এবং তার বাবা মোহাম্মদ সোহেলের (৩৫) মৃত্যু হয়। সোহেলের স্ত্রী শরিফা ও ১২ বছর বয়সী আরেক মেয়েও একই বিছানায় ছিল।
শরীফা বেগম বলছিলেন, ‘হঠাৎ বিকট শব্দে ওপর থেকে মাটি ও পাথরের ঢেলা এসে আমাদের টিনের ঘরে পড়ে। এ সময় আমি বড় মেয়েকে নিয়ে বের হয়ে আসি। কিন্তু বাবা আর ছোট মেয়ে একসঙ্গে ঘুমাচ্ছিল। তাদের আর ডেকে বের করার সময় পাইনি। তার আগেই সব শেষ। পরে ফায়ার সার্ভিসের লোকজন এসে তাদের উদ্ধার করে।’
এই এলাকার উঁচু পাহাড় কেটে ধাপে ধাপে ঘর তৈরি করে বসবাস করে আসছিল লোকজন। নগরীর প্রায় সব পাহাড়েই এমন ধাপে ধাপে ঘর তৈরি করে। দিনের পর দিন ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করলেও তারা এখান থেকে সরে আসে না। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বারবার উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়, মাইকিং করা হয় কিন্তু তারা শুনে না।
গতকালের বৃষ্টিতে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। সকাল ১০টা থেকে এইচএসসি পরীক্ষার প্রথম দিনে (চট্টগ্রাম বোর্ডে) তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ের পরীক্ষা ছিল। নির্দেশনা অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের ৩০ মিনিট আগে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে হবে, কিন্তু তখনো ছিল নগরী জলমগ্ন।
চাক্তাই থেকে নিহাল আহমেদকে পাহাড়তলী কলেজ কেন্দ্রে আসার সময় বাকলিয়া সড়কের পানি ডিঙিয়ে আসতে হয়েছে বলে জানান। একই কথা জানান, নগরীর লালখান বাজার বাঘঘোনা থেকে জান্নাত ফাতেমা নামের আরেক পরীক্ষার্থী। তিনি কাপাসগোলা সিটি করপোরেশন মহিলা কলেজ কেন্দ্রে যেতে জলাবদ্ধতায় আটকা পড়েছিলেন চকবাজার এলাকায়। আর রাস্তায় পানি থাকায় অটোরিকশা না পাওয়ায় এক স্থান থেকে আরেক স্থানে যেতে শিক্ষার্থীদের দুর্দশা ছিল অবর্ণনীয়।
শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে পরীক্ষার সময় এক ঘণ্টা পিছিয়ে দেয় শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষ। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক নারায়ণ চন্দ্র নাথ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নগরী ও আশপাশের এলাকায় প্রবল বৃষ্টিতে পরীক্ষার্থীরা সঠিক সময়ে কেন্দ্রে আসতে পারবে না বুঝতে পেরে আমরা পরীক্ষা শুরুর সময় এক ঘণ্টা পিছিয়ে দিয়েছি। এর সুুফলও পাওয়া গেছে। এতে প্রায় সব পরীক্ষার্থী কেন্দ্রে পৌঁছতে পেরেছে। তবে দিন শেষে ৪৪৫ জন পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিল।’
কোনো কেন্দ্রে সমস্যা হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, শুধুমাত্র নগরীর কাপাসগোলা সিটি করপোরেশন গার্লস কলেজ কেন্দ্রের নিচতলায় পানি উঠেছিল। যদিও পরীক্ষার সিট ছিল দ্বিতীয় তলায়। তবে কলেজ কর্তৃপক্ষ নিচতলায় বেঞ্চ বসিয়ে ছেলে ও মেয়েদের পৃথক পৃথক সারিতে পরীক্ষার হলে প্রবেশ করিয়েছে।
আগ্রাবাদে কেন পানি উঠল : নগরীর নিচু এলাকাগুলোতে বৃষ্টি হলেই পানি জমবে। কিন্তু আগ্রাবাদ সিডিএ আবাসিক এলাকা, ছোটোপুল, শান্তিবাগ, হালিশহর কে ব্লক, এল ব্লক প্রভৃতি এলাকায় তো মহেশখালে রেগুলেটর (স্লুইস গেট) বসানোর পর পানি ওঠার কথা নয়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে জলাবদ্ধতা প্রকল্পের পরিচালক সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট কর্নেল শাহ আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রেগুলেটরের দায়িত্বে আমরা যে দুজনকে নিয়োগ দিয়েছিলাম। তারা রাতের বেলা রেগুলেটর বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়ে। এতে শহরের দিকের পানিগুলো আর নদীতে যেতে পারেনি। এতেই পানি আটকে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। পরবর্তী সময়ে রেগুলেটর খুলে দিলে পানি নেমে যায়।’ তিনি আরও বলেন, এছাড়া নগরীর অন্যান্য এলাকায় সকালে পানি ওঠার পর ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই নেমে যায়।
