জামিন পেয়ে ব্যান্ডপার্টি নিয়ে বাদীর বাড়িতে নাচ-গান

আপডেট : ২৮ আগস্ট ২০২৩, ০৫:৪৮ এএম

টাঙ্গাইলের গোপালপুরের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে শিশুটি (১০)। স্কুলপর্যায়ে ক্রিকেট আর ফুটবল খেলে সবার প্রশংসা কুড়িয়েছে। এবার বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টে স্ট্রাইকার হিসেবে ইউনিয়ন পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ পুরস্কারও পেয়েছে। কিন্তু ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়ে মুষড়ে পড়েছে শিশুটি।

এরই মধ্যে তাকে ধর্ষণচেষ্টার ঘটনায় হওয়া মামলার একমাত্র আসামি আলেপ শেখ (৬০) গত বৃহস্পতিবার আদালত থেকে জামিন পেয়েছেন। আর জামিনে কারামুক্ত হয়েই গলায় মালা ঝুলিয়ে ব্যান্ডপার্টি বাজিয়ে পুরো গ্রামে উল্লাস করেছেন। এতেই শেষ নয়, ধর্ষণচেষ্টার শিকার শিশুটির মা এবং মামলার বাদীর বাড়ির আঙিনায় গিয়েও আসামি ও তার লোকজন নেচে-গেয়ে আনন্দ প্রকাশ করে। এ ঘটনার পর শিশুটিকে নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগার কথা জানিয়ে তার মা গত শনিবার থানায় লিখিত অভিযোগ করেন। অন্যদিকে এমন ঘটনার নিন্দা জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিয়েছেন এলাকার অনেকেই। তারা ধর্ষণচেষ্টা মামলার আসামি আলেপ শেখের কঠিন শাস্তি দাবি করেন।

ধর্ষণচেষ্টার ঘটনায় হওয়া মামলার এজাহার অনুযায়ী, চতুর্থ শ্রেণির ওই শিশুছাত্রীকে গত ২৪ জুলাই দুপুরে কাঁঠাল খাওয়ার লোভ দেখিয়ে নির্জন বাড়িতে নিয়ে ধর্ষণের চেষ্টা চালান গ্রামের মুদিদোকানি আলেপ শেখ। তখন শিশুটির কান্নাকাটির শব্দে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এলে আলেপ শেখ পালিয়ে যান। এ ঘটনায় ওই দিন বিকেলে থানায় মামলা হলে পুলিশ আলেপ শেখকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠায়।

শিশুটির মা শনিবার থানায় করা লিখিত অভিযোগে জানান, গত বৃহস্পতিবার আদালত থেকে জামিন নিয়ে রাত ৯টায় আলেপ শেখ গলায় মালা পরা অবস্থায় ব্যান্ডপার্টি নিয়ে গ্রামে প্রবেশ করেন। ব্যান্ডপার্টির সঙ্গে তার আত্মীয়সহ বেশ কয়েকজন উৎসুক মানুষ যোগ দেয়। তারা নেচে-গেয়ে পুরো গ্রামে উল্লাস করে। একপর্যায়ে আলেপ শেখ দলবল নিয়ে বাদীর বাড়ির আঙিনায় প্রবেশ করে নাচানাচি শুরু করে। পাশাপশি গালিগালাজ ও মারধরের হুমকি দেয়।

হেমনগর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য (মেম্বার) আলীম হোসেন বলেন, ‘বৃহস্পতিবার রাত ১০টায় ব্যান্ডপার্টি এবং কিছু মানুষের কোলাহলের শব্দে ঘুম ভেঙে যায়। শিশুটির পরিবার খুবই নিরীহ। তারা এখন আতঙ্কে আছে। আসামি খারাপ প্রকৃতির লোক।’

একই গ্রামের বাসিন্দা সাহার আলী, ইব্রাহীম খলিল ও মকবুল হোসেন বলেন, শিশু নির্যাতনের মামলায় আদালত থেকে জামিন পেয়ে গলায় মালা জড়িয়ে ব্যান্ডপার্টির বাদ্যের তালে নেচে-গেয়ে এমনভাবে আনন্দ প্রকাশ কোনো সভ্যতার পর্যায়ে পড়ে না। তবে প্রভাবশালী হওয়ায় কেউ আলেপ শেখের অপকর্মের প্রতিবাদ করার সাহস পায় না।

উড়িয়াবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আছিয়া বেগম বলেন, ‘শিশুটি (ধর্ষণচেষ্টার শিকার) খেলাধুলা এবং সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বেশ ভালো। এমন ঘটনায় সে চুপসে গেছে। কয়েক দিন স্কুলে আসেনি। ব্যান্ডপার্টির ঘটনায় ওই শিশু আর তার অসহায় পরিবার নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। আমরা এর কঠিন শাস্তি চাই। যাতে ভবিষ্যতে এমন অপরাধ করার সাহস কেউ না পায়।’

আলেপ শেখের সঙ্গে যাওয়া ব্যান্ডপার্টির প্রধান কালিহাতী উপজেলার নারান্দিয়া গ্রামের বাসিন্দা অনিক মিয়া বলেন, ‘অ্যাডভোকেট রবিউল হাসান রতন আমাদের ব্যান্ডপার্টিকে ৩ হাজার ৪০০ টাকায় ভাড়া করেন। রাত ৯টায় আমরা ওই গ্রামে যাই। রাত ১২টা পর্যন্ত সারা গ্রাম ঘুরে বাদ্য-বাজনা বাজিয়ে সবাইকে আনন্দ দিই। জেলখানা থেকে আসামি বের হলে যে বাজনা বাজায়, এ কাজ প্রথম করলাম।’

হেমনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আনিসুর রহমান তালুকদার ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, ‘ধর্ষণচেষ্টা মামলায় জামিন পেয়ে কোনো আসামি এভাবে আনন্দ উৎসব করে বলে আমার জানা নেই। এতে ভুক্তভোগী শিশুটি আরও নিরাপত্তাহীনতা এবং সম্মানহানির অবস্থায় আছে। আমরা অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’

মুক্তিযোদ্ধা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আঞ্জুয়ারা ময়না বলেন, ‘তালিকাভুক্ত শিশু ফুটবলার ও ক্রিকেটার এই শিশু মানসিকভাবে শকড হওয়ায় (আঘাত পাওয়ায়) আমরা তাকে হয়তো হারাতে বসেছি। এ ঘটনার তদন্ত এবং শাস্তি দাবি করছি।’

শিশুটির মামা বলেন, ‘আমার বোনটি অসহায়। আসামিরা অত্যন্ত প্রভাবশালী। জামিনে বের হয়ে যে কাণ্ড করেছে, এটা কেউ করে না। আমরা যথাযথ বিচার চাই।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে আসামি আলেপ শেখের ছেলে জীবন মিয়া বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে তাদের (শিশুটির পরিবার) বাপ-দাদার আমল থেকে বিরোধ। মামলাটি মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক। আমার বাবা এক মাস জেল খাটার পর অ্যাডভোকেট রবিউল হাসান রতনের উদ্যোগে ব্যান্ডপার্টি বাজানো হয়েছে।’

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও হেমনগর পুলিশ তদন্তকেন্দ্রের এসআই বশির আহমেদ বলেন, ‘জামিন পাওয়ার পর বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে গ্রামে আনন্দ-উৎসব করার ঘটনা সত্য। ধর্ষণচেষ্টায় হওয়া মামলার অভিযোগের সত্যতা মিলেছে। দ্রুতই আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দেওয়া হবে।’

গোপালপুর থানার ওসি মোশারফ হোসেন জানান, বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে আসামি দলবল নিয়ে বাদী ও ভুক্তভোগীর বাড়িতে গিয়ে গালিগালাজ ও হুমকির অভিযোগে থানায় জিডি করা হয়েছে। পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত