কক্সবাজারের তিনটি উন্নয়ন প্রকল্পের কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির মামলায় জড়িতদের সম্পদের অনুসন্ধান নথিতেই সীমাবদ্ধ। মামলার দুই বছর পার হয়ে গেছে। জড়িতদের মধ্যে প্রভাবশালী রাজনীতিক, আইনজীবী, সাংবাদিক ও জনপ্রতিনিধিরা রয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে; তাদের সংখ্যা প্রায় ৫০। ভূমি অধিগ্রহণ শাখাকে ঘিরে গড়ে ওঠা এ চক্রের সম্পদের অনুসন্ধানে চলছে ইঁদুর-বিড়াল খেলা।
২০২০ সালে তিনটি প্রকল্প নিয়ে দুদকের সাবেক এক কর্মকর্তার তদন্তে লুটপাটের বিস্ফোরক তথ্য উঠে এলেও জড়িত ৪৮ জনের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি দুদক। বরং তদন্ত প্রতিবেদন নাকচ করে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আরেক কর্মকর্তাকে পুনঃতদন্তের ভার দেওয়া হয়। কিন্তু দেড় বছরেও লুটপাটে জড়িতদের সম্পদের অনুসন্ধানের জন্য নোটিস জারি করেনি দুদক। প্রকল্পগুলো হলো, কক্সবাজারের পিবিআই অফিসসংক্রান্ত প্রকল্প, এসপিএম প্রকল্প ও পানি শোধনাগার প্রকল্প।
মামলার বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা দুর্নীতি দমন কমিশনের কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. রিয়াজ উদ্দীন আলোচ্য তিন প্রকল্পের দুর্নীতি তদন্তের বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি। এ ব্যাপারে তিনি দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ কর্মকর্তা) মুহাম্মদ আরিফ সাদেকের সঙ্গে কথা বলতে বলেন। ২৪ আগস্ট বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে মোবাইল ফোনে জানতে চাইলে এ বিষয়ে কথা বলার সুযোগ নেই বলে জানান মুহাম্মদ আরিফ সাদেক।
২০২০ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি কক্সবাজার শহরের একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের সার্ভেয়ার মোহাম্মদ ওয়াসিম খানকে ৯৩ লাখ ৬০ হাজার টাকাসহ গ্রেপ্তার করে র্যাব। পরে আরও দুই দালালকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে সাত বস্তা নথি উদ্ধার করা হয়। এতে ছিল জমি অধিগ্রহণের জন্য দেওয়া ক্ষতিপূরণের চেক, জমির মালিকদের করা আবেদন ও ভূমিসংক্রান্ত নথি। তিন প্রকল্পে দুর্নীতির জন্য পৃথক তিনটি মামলা করে দুদক। ২০২০ সালেই মামলাগুলোর তদন্ত শুরু করেন দুদকের তৎকালীন সহকারী পরিচালক মো. শরীফ উদ্দিন। ২০২১ সালের ৩০ জুন দুদকের চট্টগ্রাম কার্যালয়ের তৎকালীন উপপরিচালক মাহবুবুল আলমের কাছে প্রতিবেদন জমা দেন তিনি।
গ্রেপ্তার হওয়া তিন সার্ভেয়ার ফেরদৌস খান, মো. ওয়াসিম খান ও মো. ফরিদ উদ্দিনের আদালতে দেওয়া জবানবন্দি ও দুদকের তদন্তে বেরিয়ে আসে ওই চক্রের সঙ্গে থাকা কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের ২৩ কর্মকর্তাসহ ৪৮ প্রভাবশালী রাজনীতিক, আইনজীবী, সাংবাদিক, পুলিশ ও জনপ্রতিনিধির নাম। তাদের মধ্যে আছেন কক্সবাজারের সাবেক জেলা প্রশাসক, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব), অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (উন্নয়ন ও মানবসম্পদ), অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক শিক্ষা ও আইটি, ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সহকারী কমিশনার (ভূমি) কক্সবাজার সদর, পিবিআইর পুলিশ সুপার ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার। তাদের সম্পদবিবরণী অনুসন্ধানের প্রস্তাবও দিয়েছিলেন শরীফ। তিন প্রকল্পে ভূমি অধিগ্রহণে ৭৮ কোটি টাকার দুর্নীতির কথা বলা হয়।
যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণ, নথি ও আসামিদের ১৬৪ ধারায় জবানবন্দির পরও দাখিলকৃত চার্জশিটগুলোর অনুমোদন না নিয়ে ফের তদন্তের কথা বলেন উপপরিচালক মাহবুবুল আলম। ২০২২ সালে নতুন করে তদন্ত শুরু করেন কক্সবাজার জেলা সমন্বিত কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক রিয়াজ উদ্দিন।
দুদকের শীর্ষ এক কর্মকর্তা বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হলে কমিশন সেটি পর্যালোচনা করে এবং আইনগত দিক খতিয়ে দেখে। কোথাও ঘাটতি থাকলে অধিকতর তদন্ত হতে পারে। কয়েকটি বিষয়ে শরীফ উদ্দিন এখতিয়ারের বাইরে গিয়ে চাকরিবিধি লঙ্ঘন করেছেন।
শরীফ উদ্দিনের প্রতিবেদনে উল্লিখিত বিষয়গুলো হচ্ছে ক্ষতিপূরণের টাকা পরিশোধের ক্ষেত্রে কমিশন আদায় করা, একজনের জমি অন্যজনের নামে দেখানো, বেশি দামে জমি কেনা, সরকারি সংস্থার অধিগ্রহণ করা জমি নতুন করে অধিগ্রহণ করা।
কক্সবাজার সদরের মো. আল আমীন, ইমতিয়াজ হোসেন, আবদুর শুক্কুর প্রমুখ ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দা বলেন জেলা প্রশাসনের প্রভাবশালী আমলা, রাজনীতিক ও জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে এত বড় দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে তারা দেখছেন না।
ভূমি অধিগ্রহণের দুর্নীতির প্রসঙ্গে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের কেউ মন্তব্য করতে রাজি হননি। যখন এসব দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল, তখনকার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এখন সেখানে নেই। কারও কারও পদোন্নতি হয়েছে। তারা রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় কর্মরত আছেন।
শরীফের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে জালিয়াতি করে পানি শোধনাগার প্রকল্পে প্রস্তাবিত বাঁকখালী নদীর উত্তর পাড়ের জমি অধিগ্রহণ না করে নদীর দক্ষিণ পাড়ে দশগুণ বেশি দামের জায়গা প্রকল্পের জন্য নির্ধারণ করা হয়। স্থাবর সম্পত্তি হুকুম দখল আইন ২০১৭ লঙ্ঘন করা হয়। কক্সবাজার পৌরসভাপ্রত্যাশী সংস্থা না হওয়া সত্ত্বেও সাবেক মেয়র মুজিবুর রহমানকে প্রত্যাশী সংস্থা সাজিয়ে বেশ কিছু তারিখবিহীন প্রত্যয়নপত্র ওই জমির ওপর গ্রহণ করা হয়। ভূমি বরাদ্দ কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক ২০১৯ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর আলোচ্য ভূমি অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন।
ওই প্রকল্পে পরে সাবেক মেয়র মুজিবুর রহমানের স্ত্রী ফারহানা আকতার ও শ্যালক মিজানুর রহমানকে অধিগ্রহণকৃত জমিতে কক্সবাজার সদর উপজেলার তৎকালীন দুজন এসিল্যান্ডের যোগসাজশে দখল দেখিয়ে ছয়টি নামজারি খতিয়ান করা হয়। আগের নামজারির মূলনথিও গায়েব করে দেওয়া হয়।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রত্যাশী সংস্থার প্রতিনিধি না হয়েও সরেজমিনে পরিদর্শন ছাড়াই ফিল্ড বুকে স্বাক্ষর করা, অধিগ্রহণ নথির নোটশিটে মামলার কথা রয়েছে জেনেও তা নিষ্পত্তি না করা, প্রত্যাশী সংস্থা ঠিক না করেই সাবেক মেয়র মুজিবুর রহমানের সঙ্গে যোগসাজশে ২০১৯ সালের ১৭ ডিসেম্বর প্রাক্কলন প্রত্যাশী সংস্থার কাছে পাঠানো হয়। একটি রিট পিটিশনের ওপর হাইকোর্টের আদেশকে মিসগাইড করে, রিটের যথাযথ নিষ্পত্তি না করেই ২০২০ সালের ৯ জুলাই ক্ষতিপূরণ বাবদ ৭ কোটি ১৬ লাখ ৮৯ হাজার ৭৯৪ টাকা অবৈধভাবে সাবেক মেয়রকে পরিশোধ করা হয়।
অভিযুক্ত সাবেক জেলা প্রশাসকের প্রতিনিধি হয়ে এক সার্ভেয়ার (যিনি আসামি) ঘুষ দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জন করা ৬৬ লাখ ৭৫ হাজার ৫৫০ টাকা গচ্ছিত রেখে মানি লন্ডারিং আইন ও দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন বলে তদন্ত প্রতিবেনে বলা হয়েছে। ওই ৪৮ আসামির বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট-২ দাখিলের অনুমোদন দেওয়ার সুপারিশও করেন দুদক কর্মকর্তা শরীফ উদ্দিন।
এ ছাড়া আসামি সেলিম উল্যার ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে উল্লিখিত এবং তদন্তে জ্ঞাত ৯০ জন মধ্যস্বত্বভোগীর সম্পদের প্রাথমিক অনুসন্ধানের অনুমতি দেওয়ার সুপারিশও করেন শরীফ উদ্দিন। র্যাবের জব্দ করা চারটি এলএ মামলার নথির বিষয়ে (এসব মামলায় ক্ষতিপূরণ পরিশোধ করা হয়েছে) নতুন অনুসন্ধানের সুপারিশও করা হয়।
