হিলারি ক্লিনটন পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে তার সঙ্গে যারা ব্যক্তিগত কারণে দেখা করেছেন, তাদের অর্ধেক ব্যক্তি নিজে বা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ক্লিনটন ফাউন্ডেশনে অনুদান দিয়েছিলেন। ওই তালিকায় নাম ছিল বাংলাদেশের নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের। একটি মার্কিন বার্তা সংস্থার প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছিল ২০১৬ সালে। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ ছিল, ওই সময় ‘গ্রামীণ আমেরিকা’ নামে প্রতিষ্ঠান থেকে ক্লিনটন ফাউন্ডেশনে এক লাখ থেকে আড়াই লাখ ডলার অনুদান দিয়েছিলেন। যে সংস্থাটির চেয়ারম্যানের দায়িত্বে রয়েছেন বাংলাদেশের ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এ ছাড়া ‘গ্রামীণ রিসার্চ’ নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠান থেকে ২৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার ডলার অনুদান দেওয়া হয়েছিল ক্লিনটন ফাউন্ডেশনে। যেটির চেয়ারম্যানের দায়িত্বেও ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এ কারণে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে যখন গ্রামীণ ব্যাংকের দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করতে সরকার আইনানুযায়ী চাপ দিচ্ছিল তখন ড. ইউনূস হিলারি ক্লিনটনের সঙ্গে দেখা করে তার সাহায্য চেয়েছিলেন। হিলারিও তখন তার সহকারীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, ড. ইউনূসকে সাহায্য করার পন্থা খুঁজে বের করতে। ওই প্রতিবেদনেই আছে, হিলারি ক্লিনটন পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে ড. মুহাম্মদ ইউনূস তার সঙ্গে তিনবার দেখা করেছেন এবং টেলিফোনেও কয়েকবার কথা বলেছেন। ওই সময় হিলারি ক্লিনটনের সঙ্গে যারা সরাসরি বা ফোনে আলাপ করেছেন তাদের বেশির ভাগই ক্লিনটন ফাউন্ডেশনে অনুদান দিয়েছেন।
এই তথ্য আমাদের কাছে নতুন নয়। পুরনো বিষয়টি মনে পড়ছে কারণ, সম্প্রতি নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. ইউনূসের পাশে দাঁড়াতে বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন। সোশ্যাল মিডিয়া টুইটারে এক বার্তায় ইউনূসকে করা হয়রানি রুখে দিতে বিশ^কে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। টুইটার বার্তায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে পাঠানো ১৬০ জনের বেশি বিশ^নেতার বিবৃতিটি সংযুক্ত করেন হিলারি। এ ছাড়া গত ২৭ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতি সমর্থন জানিয়ে চিঠি লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। তার একদিন পরই ১৬০ জন বিশ্বনেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে খোলা চিঠি দেয়। তবে এটুকু বলতে পারি, ক্লিনটন ফাউন্ডেশনে যারা অনুদান দেন তারা বিশ্বের স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ব। নোবেল লরিয়েট বা সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান, শীর্ষ মানবাধিকর কর্মী এ ধাঁচের মানুষ। যাদের বেশির ভাগকেই বিশে^র মানুষ এক নামে চেনেন। আমরা যাদের ‘বিশ্বনেতা’ বলি। আরও একটি বিষয় হলো, ক্লিনটন ফাউন্ডেশনে যারা অনুদান দেন তাদের প্রতি ফাউন্ডেশনে সমর্থন থাকে। যেটি ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বেলাতেও আছে। এ ছাড়া হিলারি ক্লিনটনের সঙ্গে ড. ইউনূসের বন্ধুত্বের বিষয়টিও রয়েছে। যেটি এই বিবৃতি দিতে সহায়ক হয়েছে। এই বিবৃতি এসেছে এমন সময়, যখন আদালত ড. ইউনূসকে এনবিআরের ১২ কোটি টাকা কর পরিশোধ করতে বলেছেন। শ্রম আদালতে একটি মামলার বিচার শুরু এবং আরও ১৮টি মামলা দায়ের হয়েছে। অর্থাৎ ড. ইউনূস ব্যক্তিগতভাবে নানা সংকট এবং বিপদে আছেন বলে বিদেশ থেকে তার পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান আসছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, আলোচনায় কেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস? একটু ফিরে তাকাই। নোবেল বিজয়ের প্রায় ৫ মাসের মাথায় ২০০৭ সালে রাজনৈতিক দল গঠনের ঘোষণা দিয়েছিলেন ড. ইউনূস। দেশে তখন সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। ২০০৭ সালের শেষ দিকে তিনি ভারত সফরে যান। দিল্লিতে ওই বছরের ৩১ জানুয়ারি এক সংবাদ সম্মেলনে ড. ইউনূস বলেছিলেন দেশের পরিস্থিতি বাধ্য করলে তিনি রাজনীতিতে যোগ দেবেন। ওই সফরে তিনি ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং, কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী এবং প্রণব মুখার্জীর সঙ্গে বৈঠক করেন। পরে বাহারাইন সফর শেষে দেশে ফিরে সাংবাদিকদের কাছে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নেওয়া দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের সমর্থন করেন এবং দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্তরা যাতে নির্বাচনে অংশ নিতে না পারে সে ব্যবস্থা করা উচিত বলে মত দেন। পরে ১১ ফেব্রুয়ারি দেশবাসীর উদ্দেশে খোলা চিঠি দিয়েছিলেন। চিঠিতে নিজের রাজনীতি সম্পর্কে পরামর্শ ও সহযোগিতা কামনা করেন। লিখেছিলেন, ‘আমি জানি, রাজনীতিতে জড়িত হওয়া মানে বিতর্কিত হওয়া। আপনারা যদি মনে করেন, আমার রাজনীতিতে আসাটা দেশে নতুন রাজনৈতিক পরিমণ্ডল রচনায় সহায়ক হবে তবে আমি তার জন্য এ ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত। একটি নতুন রাজনৈতিক দল কীভাবে গঠন করা যায়, কীভাবে সৎ ও যোগ্য প্রার্থীদের নির্বাচনে মনোনীত করা যায়, কীভাবে তৃণমূল থেকে সরাসরি মতামত পাওয়া যায়’ এসব বিষয় নিয়ে তিনি মানুষের মতামত এবং পরামর্শ জানতে চান। ওই চিঠিতে এও বলেছিলেন, প্রয়োজনে তিনি গ্রামীণ ব্যাংকের পদ ছেড়ে দিয়ে রাজনীতিতে নামবেন। ড. ইউনূস তার রাজনৈতিক দলের সম্ভাব্য নাম দিয়েছিলেন ‘নাগরিক শক্তি’। রাজনৈতিক দল গঠনে দেশ-বিদেশে ব্যাপক তৎপরতাও চালিয়েছিলেন। কিন্তু বেশি দূর এগোতে পারেননি। তিন মাসের মধ্যেই তাকে সে অবস্থান থেকে সরে আসতে হয়েছিল। কারণ জনগণের উদ্দেশে লেখা চিঠির জবাব, তার রাজনৈতিক দল গঠনে সহায়ক ছিল না। বরং সমালোচনার পাল্লাই ভারী ছিল। এ কারণে ২০০৭ সালের ৩ মে অধ্যাপক ইউনূস রাজনৈতিক দল গঠনের প্রক্রিয়া থেকে সরে আসার ঘোষণা দিয়ে, জাতির উদ্দেশে আরও একটি চিঠি প্রকাশ করেন। সেখানে উল্লেখ করেছিলেন, ‘যাদের সঙ্গে পেলে দল গঠন করে জনগণের সামনে সবল ও উজ্জ্বল বিকল্প রাখা সম্ভব হতো, তাদের আমি পাচ্ছি না। আর যারা রাজনৈতিক দলে আছেন, তারা দল ছেড়ে আসবেন না। বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে এ পথে অগ্রসর না হওয়াই সঠিক হবে মনে করে এ প্রচেষ্টা থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
অনেকের মতে, ২০০৭ সালের সেনা সমর্থিত সরকার, দেশের প্রধান দুই দলের প্রধানকে রাজনীতি থেকে দূরে সরানোর চেষ্টা করেছিল। আর ড. ইউনূস তাদের অনুপস্থিতিতে সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। বিষয়টি শতভাগ অমূলক নয়। কারণ ড. ইউনূস রাজনীতি করার এবং দেশের জন্য ত্যাগ স্বীকারের মানসিকতা থাকলে, কে আছে কে নেই সেটির হিসাব করতেন না। এগিয়ে যেতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। এক লেখক ও গবেষক একটি লেখায় বলেছিলেন, ১/১১-এর আগে ড. ইউনূসকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হওয়ার জন্য প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি স্বল্প মেয়াদের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হতে রাজি হননি। যদিও পরবর্তী সময় ড. ইউনূস এক বিবৃতিতে তা অস্বীকার করেছিলেন। তৎকালীন পরিস্থিতি বিবেচনায় ওই পদের জন্য ড. ইউনূসের মতো একজন ব্যক্তিত্বকে প্রস্তাব করাটা অস্বাভাবিক ছিল না। কিন্তু কী কারণে সে প্রস্তাবে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন, তা নিয়ে সন্দেহ থেকে যাচ্ছে। কারণ এর পরই তিনি রাজনৈতিক দল গঠনের চেষ্টা করেছিলেন।
রাজনৈতিক দল গঠনে ব্যর্থ হওয়ার পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে দেশ নিয়ে ভাবতে দেখা যায়নি। ২০০৭ সালের পর দেশের কোনো সংকট, দুর্যোগ, মহামারী কোথাও নেই তিনি। দেশের রাজনৈতিক সংকট, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কিংবা সামাজিক সমস্যা, মানবাধিকার বিষয়েও তার কোনো আওয়াজ আমরা পাই না। কিন্তু বিশে^র বিভিন্ন স্থান থেকে ব্যক্তিগত মর্যাদা তিনি বৃদ্ধি করেই চলছেন। শুধু বাংলাদেশেই তার অনুপস্থিতি। এর কারণ কি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ২০০৭ সালের বৈরিতা নাকি ব্যক্তিত্বের অহংকার?
একজন নোবেল বিজয়ীর সঙ্গে বিশ^নেতাদের সখ্যতা থাকতেই পারে। এ কারণে তিনি দেশে বা বিদেশে কোনো সংকটে পড়লে এবং তাদের কাছে কোনো সহযোগিতা চাইলে বিশ^নেতারা তা করবে, এটাই স্বাভাবিক। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশের বিরোধী দলগুলোর নির্বাচনকালীন সরকারের দাবি করছে। এ নিয়ে দেশি-বিদেশি চাপ আছে সরকারের ওপর।
বিভিন্ন বিষয় বিশ্লেষণ করে, একটি প্রশ্ন দেখা দেয় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মতো একজন ব্যক্তিত্বের বাংলাদেশের জন্য কোনো অবদান নেই কেন? পাশাপাশি এটিও প্রশ্ন যে ব্যক্তি ড. ইউনূস নিজের পদপদবি, সম্মান স্বীকৃতি পেতে যা করা দরকার তাই করেন। তবে দেশ কি তার কাছে নিছক স্বীকৃতির হাতিয়ার?
লেখক: সাংবাদিক
[email protected]
