চট্টগ্রাম বন্দরের পতেঙ্গায় মার্সকের টার্মিনাল নির্মাণের নতুন স্থান হিসেবে লালদিয়ার চরের ১৪ ও ১৫ নম্বর খালের মধ্যবর্তী অংশে আসতে পারে। বিমান উড্ডয়নের ফানেলের জায়গা এবং কর্ণফুলী নদীর ওই অংশে বাঁক থাকায় নদীটি সরু। তাই কর্ণফুলীর চ্যানেলের স্বার্থে ও টার্মিনাল নির্মাণের উপযোগী নাও হতে পারে লালদিয়ার চর। এজন্যই আলোচনায় আসছে লালদিয়ার চরের ১৪ ও ১৫ নম্বর খালের মধ্যবর্তী অংশটি।
গতকাল সোমবার বিকেলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (হারবার)-এর সভাপতিত্বে একটি পর্যালোচনা সভাও হয়েছে মার্সকের টার্মিনাল নির্মাণের স্থান নিয়ে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সদস্য (হারবার) কমোডর এম ফজলার রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মার্সকের পক্ষ থেকে লালদিয়ার চর (১২ ও ১৩ নম্বর খালের মধ্যবর্তী) চাওয়া হয়েছিল। তবে এ স্থানে কর্ণফুলীর বাঁক রয়েছে এবং বিমান চলাচলের রুট রয়েছে। এ ছাড়া লালদিয়ার চরের দক্ষিণ (১৪ ও ১৫ নম্বর খালের মধ্যবর্তী) অংশের জায়গাটিও আলোচনায় এসেছে। এখন এই দুই জায়গার মধ্যে যে স্থানটি উপযোগী হয় সেখানে টার্মিনাল নির্মাণ হতে পারে।’
লালদিয়ার চরে তিনটি ব্লক রয়েছে। ১৯৩৫ সালে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এই তিনটি ব্লক অধিগ্রহণ করেছিল। এর মধ্যে একটি ব্লক (১৩ ও ১৪ নম্বর খালের মধ্যবর্তী জায়গা) ২০০৫ সালের জুলাই মাসে উচ্ছেদ করেছিলেন তৎকালীন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ম্যাজিস্ট্রেট মুনীর চৌধুরী। সেই উচ্ছেদকৃত জায়গায় পরে গড়ে তোলা হয়েছে ইনকনট্রেন্ড টার্মিনাল। ১২ ও ১৩ নম্বর খালের মধ্যবর্তী এবং ১৪ ও ১৫ নম্বর খালের মধ্যবর্তী দুটি জায়গার অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করা হয়েছিল ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে। আর এই উচ্ছেদ জায়গা দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। এখন এই জায়গায় টার্মিনাল নির্মাণের জন্য প্রস্তাবনা দিয়েছে মার্সক গ্রুপ। নৌ-বাণিজ্যে বিশে^র দ্বিতীয় শীর্ষ কোম্পানি ডেনমার্কের এপি-মুলার মার্সক গ্রুপ চট্টগ্রাম বন্দরে বিনিয়োগের জন্য দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করে এলেও এত দিন সুযোগ পায়নি। গত এপ্রিলে তারা নৌ-মন্ত্রণালয়ে আবেদনের পর সেই চিঠি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে আসে মে মাসে। আর এরপরই ডেনমার্কের এই কোম্পানিটির বিনিয়োগের বিষয়টি সামনে চলে আসে।
গত ২৮ আগস্ট মার্সক গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) রবার্ট মায়ের্স্ক উগলা এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত ডেনিশ চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড্রেস বি কার্লসেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সেই সাক্ষাতে চট্টগ্রামের লালদিয়ায় একটি নতুন কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য ডেনিশ শিপিং এবং লজিস্টিক জায়ান্ট মার্সক গ্রুপের প্রস্তাব বিবেচনার কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এতেই গতি পায় নতুন এই টার্মিনাল বরাদ্দের বিষয়টি।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ সোহায়েল বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দরে মার্সকের বিনিয়োগ এটা দেশের শিপিং বাণিজ্যে বিশাল একটি বিষয়। এতে প্রায় ৪০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ হতে পারে।’
এদিকে প্রথমে যে জায়গাটি আলোচনায় এসেছিল সেই জায়গার ড্রাফট (পানির গভীরতা) প্রায় ১০ মিটার হলেও পরবর্তী জায়গায় (১৪ ও ১৫ নম্বর খালের মধ্যবর্তী) ড্রাফট কিছুটা কম। আর এই জায়গায় নদীর প্রশস্ততাও বেশি। এই পয়েন্টে উচ্চতা নিয়ে কোনো ব্যারিয়ার না থাকায় কি গ্যান্ট্রিক্রেনসহ আধুনিক ইকুইপমেন্ট স্থাপনেও কোনো সমস্যা হবে না। আর এই উচ্চতাসংক্রান্ত সমস্যার কারণে ২০১২ সালে লালদিয়ায় বাল্ক টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প নেওয়া হলেও তা বেশিদূর এগোয়নি। এ ছাড়া তখন লালদিয়াবাসীকে পুনর্বাসনের বিষয়টি সামনে চলে এসেছিল। পরে ২০১৪ সালে লালদিয়ায় পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে মাল্টিপারপাস টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা নিভে যায় একসময়। আর এখন এই স্থানে আসছে বিশে^র দ্বিতীয় শীর্ষ কোম্পানি মার্সক।
সাইফ মেরিটাইম চিফ অপারেটিং অফিসার আবদুল্লাহ জহির বলেন, ‘মার্সক কোম্পানি চট্টগ্রাম বন্দরে টার্মিনাল নির্মাণে এগিয়ে আসা দেশের অর্থনীতির জন্য বিশাল এক সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হওয়া। যেহেতু মার্সকের নিজস্ব জাহাজ ও কনটেইনার রয়েছে, এখন টার্মিনালও যদি অপারেট করতে পারে তাহলে নৌ-বাণিজ্যে গতি আসবে। এমনিতেই চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে সবচেয়ে বেশি কনটেইনার পরিবহন করে মার্সক।’ তিনি আরও বলেন, পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল চালু হচ্ছে আগামী মাসে। এখন যদি মার্সক লালদিয়ায় টার্মিনাল নির্মাণ করে তাহলে বন্দরের দুটি টার্মিনাল বাড়বে। এতে বে-টার্মিনাল নির্মাণ কার্যক্রম বিলম্ব হলেও দেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হবে না।
জানা যায়, বর্তমানে কনটেইনার ও জাহাজ পরিচালনায় বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে মার্সক। বাংলাদেশে শিপিং ও লজিস্টিকস খাতে ব্যবসা থাকলেও টার্মিনাল পরিচালনার ব্যবসা নেই তাদের। বিশ্বের ৩৭টি দেশে ৬৫টি টার্মিনাল ও বন্দর পরিচালনা করছে মার্সক।
মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্র বন্দরের নির্মাণ কাজের উদ্বোধন হবে আগামী মাসে। একইসঙ্গে বে-টার্মিনালের মাস্টারপ্ল্যানের মোড়ক উন্মোচনও হবে একই সময়ে এবং পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালের উদ্বোধন হবে। মাতারবাড়ী ২০২৬ সালে পুরোদমে চালুর লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে এগোচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে নিউমুড়িং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি), চিটাগাং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) ও জেনারেল কার্গো বার্থ টার্মিনাল দিয়ে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম করে চট্টগ্রাম বন্দর। আগামী মাস থেকে এর সঙ্গে যুক্ত হবে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল।
