চুরির হোতা দুই কর্মকর্তা এক সিপাহি

আপডেট : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ০২:৫১ এএম

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কাস্টম হাউজের নিজস্ব গুদাম থেকে ৫৫ দশমিক ৫১ কেজি সোনা চুরির হোতা কাস্টমস হাউজেরই দুই সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ও এক সিপাহি। তারা দীর্ঘদিন ধরে ধাপে ধাপে এ সোনা সরান। চুরি করা সোনা বিক্রি করে ইতিমধ্যে টাকা ভাগাভাগি করেও নিয়েছেন। আর বিষয়টি ভিন্ন খাতে নিতে সাজানো হয় নাটক। তারা গুদামের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের পাশে টিনের ছাউনির একটি অংশ এবং আলমারির একটি দরজার লক ভেঙে রাখেন। এসব কাজ করার সময় কৌশলে বন্ধ করে রাখেন গুদামের দরজার সামনের সিসিটিভি ক্যামেরা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিপুল পরিমাণ এ সোনা চুরির ঘটনার তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে এসব তথ্য জানান।

তিনি বলেন, ‘ঘটনার পর থেকে আটজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তি ও জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য বলছে, তাদের মধ্যে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা সাইদুল ইসলাম শাহেদ, শহিদুল ইসলাম এবং সিপাহি নিয়ামত হাওলাদার সোনা চুরির সঙ্গে সরাসরি জাড়িত। তারা লকার থেকে দীর্ঘদিন ধরে সোনা সরিয়ে ফেলেন।’

এ তদন্ত কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘বিষয়টি বেশ কিছুদিন আগেই বুঝতে পারেন কাস্টম হাউজের শীর্ষ কর্মকর্তারা। ফলে চুরির নাটক সাজাতে গত শনিবার রাতে ভাঙা হয় গুদামের একটি আলমারির লক ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের পাশে টিনের ছাউনির একটি অংশ। কিন্তু সেখান দিয়ে কোনোভাবেই গুদামের ভেতর ঢোকা সম্ভব নয়।’

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ মোর্শেদ আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা শাহেদ, শহিদুল এবং সিপাই নিয়ামত হাওলাদার এ ঘটনায় জড়িত বলে আমরা ধারণা করছি। শাহেদ ও শহিদুল দীর্ঘদিন ধরে গুদামের দায়িত্বে ছিলেন। তাদের বক্তব্যও অসংলগ্ন। ঘটনার আগে-পরে অফিস টাইমের বাইরে তারা বিমানবন্দরের বিভিন্ন স্থানে একত্রিত হয়েছেন। তবে তারা কোনো স্বীকারোক্তিমূলক বক্তব্য এখনো দেননি।’

এদিকে সোনা চুরির এ ঘটনায় হওয়া মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব বিমানবন্দর থানা থেকে ডিএমপির গোয়েন্দা উত্তরা বিভাগে (ডিবি) দেওয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ডিবি উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মো. আকরামুল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা লিখিতভাবে এখনো মামলার তদন্তভার পায়নি। তবে মৌখিকভাবে পেয়েছি।’

গত রবিবার অফিস খোলার পর সোনা চুরির বিষয়টি কর্মকর্তাদের নজরে আসে। পরে রাতেই কাস্টম হাউজের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা (এয়ারপোর্ট প্রিভেন্টিভ টিম) মোহাম্মদ সোহরাব হোসেন বাদী হয়ে বিমানবন্দর থানায় মামলা করেন। এতে অজ্ঞাতপরিচয়ের ব্যক্তিদের আসামি করা হয়। এ ঘটনায় কাস্টমসের একজন যুগ্ম কমিশনারের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

সোনা চুরির বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর থেকে কাস্টম হাউজের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা রয়েছেন আতঙ্কে। গতকাল দুপুর দেড়টার দিকে কাস্টম হাউজে গিয়ে দেখা যায় সবার মধ্যে চাপা আতঙ্ক। সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ায় কেউ কোনো তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। ভবনের তৃতীয় তলায় ঢাকা কাস্টম হাউজের কমিশনার এ কে এম নুরুল হুদা আজাদের কক্ষ। সেখানে গিয়ে তার সঙ্গে কথা বলতে চাইলে ব্যক্তিগত সহকারীকে দিয়ে জানান তিনি কোনো কথা বলবেন না। জানা গেছে, নুরুল হুদা আজাদ গতকাল দিনভর তিন থেকে চার কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠক করেছেন।

চুরির ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর কাস্টমসের ওই গুদামে যাওয়া পুলিশের তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, ‘সোনা রাখার আলমারিটি খুবই দুর্বল আর শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের পাশে যে অংশ কাটা সেখানে জং ধরেছে। বোঝা যাচ্ছে বেশ কিছুদিন আগে কাটা হয়েছে। গুদামে একটি কাটার (ধাতব পাত কাটার যন্ত্র) পাওয়া গেছে। বাইরে থেকে চোর গুদামে ঢুকেছে, এমনটা দেখাতে এটা করা হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘যে আলমারির দরজার লক ভাঙা হয়েছে সেখানে হীরা ও রেমিট্যান্সও ছিল। সেগুলোতে হাত দেয়নি। শুধু অবৈধভাবে আসা সোনা যেগুলো কাস্টমস কর্মকর্তারা আটক করেছেন, বিভিন্ন সময়ে সেগুলোই সরানো হয়েছে। চোর ঢুকলে তো সবই নিয়ে যাবে।’

এ ঘটনায় করা মামলার তদন্ত তদারকি কর্মকর্তা উত্তরা বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার তৌহিদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা তিনজনকে শনাক্ত করেছি। তাদেরসহ অন্যদেরও ডিবিতে হস্তান্তর করা হবে। মামলাটি কমিশনার স্যারের নির্দেশে এখন থেকে ডিবি তদন্ত করবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত