কয়েকজন প্রকৌশলী ও ঠিকাদার মিলে রাতের আঁধারে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ১০ কোটি টাকার স্ল্যাব বিক্রি করে দিয়েছেন। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) প্রাথমিকভাবে ঘটনার সত্যতা পেয়েছে। স্ল্যাবগুলো বিক্রি করে পাওয়া টাকা নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে নিয়েছেন অভিযুক্তরা। ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে বেবিচক তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। মন্ত্রণালয় ঘটনাটিকে প্রকৌশলী ও ঠিকাদার মিলে ডাকাতি বলে অভিহিত করেছে।
বেবিচকের প্রাথমিক তদন্তে অভিযুক্তদের মধ্যে কয়েকজনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের নজরদারির মধ্যে রাখার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানো হয়েছে বলে বেবিচকের একটি সূত্র দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করেছে।
জানতে চাইলে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল এম মফিদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কাউকে না জানিয়ে বিমানবন্দরের স্ল্যাব বিক্রি করার বিষয়ে অভিযোগ পেয়েছি। এজন্য তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
বেবিচক সূত্র জানায়, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনাল ভবন ও রানওয়ে এলাকাকে দুটি অংশে ভাগ করে উন্নয়ন ও মেরামত এবং রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করে থাকে সিভিল ডিভিশন-১। ১৫ বছর ধরে রাডার ভবন ও রানওয়ের পাশে পুরনো স্ল্যাব জমিয়ে রাখা হয়েছিল। সম্প্রতি এক্সপোর্ট কার্গো ভবন নির্মাণ করার জন্য জায়গা খালি করতে বলা হয়। এ নিয়ে বেবিচক কর্মকর্তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনাও করেন। কিন্তু সংস্থার কয়েকজন প্রকৌশলী ও ঠিকাদার স্ল্যাবগুলো গোপনে বিক্রি করে দিয়েছেন। এ সংক্রান্ত একটি অভিযোগ ১৭ জুলাই বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নজরে আসে। ওই অভিযোগে বলা হয়, তৃতীয় টার্মিনালের প্রকল্প পরিচালক এম মাকসুদুল ইসলামের নির্দেশে বেবিচকের সিনিয়র উপসহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) তারেক আহম্মেদ, সহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইসমাইলের যোগসাজশে ঠিকাদার অশ্রু ও মোমিনসহ অন্তত ১০-১২ জন মিলে স্ল্যাবগুলো বিক্রি করে দিয়েছেন। অথচ এসব সামগ্রী বিক্রি করতে হলে বেবিচকের অনুমোদন নেওয়ার পাশাপাশি টেন্ডার করতে হয়। কিন্তু তা না করে গোপনে এক হাজারটি স্ল্যাব বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। সø্যাবগুলোর বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১০ কোটি টাকা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেবিচকের এক কর্মকর্তা গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে তারা দীর্ঘদিন ধরে টেন্ডার বাণিজ্যসহ নানা অপরাধ করছেন বলে তথ্য পেয়েছে বেবিচক। স্ল্যাব বিক্রি করে দেওয়ার ঘটনায় মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে ৩১ আগস্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির প্রধান করা হয়েছে বেবিচকের উপপরিচালক (অর্থ) আনোয়ার হোসেনকে। কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন সহকারী পরিচালক (এটিএম) মশিউর রহমান ও সিনিয়র অফিসার (প্রশাসন) অমিত কুমার ঘোষ। আগামী ২০ কর্মদিবসে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, প্রাথমিক তদন্তে স্ল্যাব বিক্রি করার সত্যতা পাওয়া গেছে। বিক্রি করে দেওয়া প্রতিটি স্ল্যাব ২৫ ফুট বাই ২৫ ফুট আকারের। পুরুত্ব ২৬ ইঞ্চি। এ ধরনের একটি স্ল্যাব বানাতে ১৩৬৫ সিএফটি কংক্রিট ও ডাওয়েল বার ব্যবহৃত হয়। ঢাকা শহরসহ সারা দেশে পুরনো স্ল্যাব ক্রাশিং মেশিনে ভেঙে স্টোন চিপস তৈরি করে ব্যবহার করা হয়। পুরনো এসব স্ল্যাব নিয়ম অনুযায়ী টেন্ডার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিক্রি করলে সরকার রাজস্ব পেত। কিন্তু চক্রের কারসাজির কারণে তা হয়নি।
অন্য এক প্রশ্নের জবাবে ওই কর্মকর্তা বলেন, বিমানবন্দরের রানওয়ে এলাকাটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর। ইচ্ছা করলে যে কেউ ঢুকতে পারে না। ট্রাক বা ভারী যানবাহন রানওয়েসংলগ্ন এলাকায় প্রবেশ করতে হলে কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হয়। অথচ চক্রটি সবাইকে বোকা বানিয়ে স্ল্যাবগুলো বের করে নিয়ে গেছে। রাতের বেলায় ওইসব স্ল্যাব বের করে নেওয়া হয়েছে বলে তারা নিশ্চিত হয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তৃতীয় টার্মিনালের প্রকল্প পরিচালক এম মাকসুদুল ইসলাম কথা বলতে রাজি হননি।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বেবিচকের প্রকৌশল বিভাগ নানা অনিয়মে জড়িত। কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী ঠিকাদারদের সঙ্গে আঁতাত করে টেন্ডারবাণিজ্য করছেন। আর এসব কারণে দুর্নীতি দমন কমিশন ইতিমধ্যে বেবিচকের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী হাবিবুর রহমানসহ ৯ কর্মকর্তার দুর্নীতি অনুসন্ধানে সাতটি প্রকল্প কাজের সব নথিপত্র তলব করেছে।
