ঢাকা কাস্টম হাউজের নিজস্ব গুদাম থেকে ‘সোনা চুরির’ ঘটনা রহস্যের জন্ম দিয়েছে। কাস্টমস কর্তৃপক্ষ চুরি দাবি করে থানায় মামলা করেছে। মামলায় যে তারিখে চুরির কথা বলা হচ্ছে তারও অন্তত ১৪ দিন আগে সোনা গায়েবের বিষয়টি জানতে পারেন কাস্টমসের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা। বিষয়টি দেশ রূপান্তরের কাছে স্বীকারও করেছেন শীর্ষপর্যায়ের এক কর্মকর্তা। তাহলে মামলা এত পরে কেন আর কেনইবা চুরির নাটক। গুদামের ‘সোনা চুরির’ আগে আশপাশের ক্লোজ সার্কিট (সিসি) টিভি ক্যামেরাগুলো নষ্ট ছিল। টাকার অভাবে এক বছর ধরে সিসি টিভি লাগাতে পারেনি কাস্টমস। তবে ‘সোনা চুরির’ পর গত বুধবার নতুন করে ১০টি সিসি টিভি ক্যামেরা স্থাপন করেছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঢাকা কাস্টম হাউজের নিজস্ব গুদাম থেকে ৫৫ দশমিক ৫১ কেজি সোনা গায়েবের ঘটনায় বিমানবন্দর থানায় মামলা হয়েছে গত ৩ সেপ্টেম্বর। কিন্তু সোনা গায়েবের বিষয়টি কাস্টমসের শীর্ষ কর্তারা প্রথম জানতে পারেন গত ২১ আগস্ট। পরদিন ২২ আগস্ট সোনার পরিমাণ জানার উদ্যোগ নেয় কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। তবে এ ঘটনায় বিমানবন্দর থানায় কাস্টমসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মোহাম্মদ সোহরাব হোসেন বাদী হয়ে করা চুরির মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে, ‘গত ২ সেপ্টেম্বর রাত সোয়া ১২টা থেকে পরদিন সকাল সাড়ে ৮টার মধ্যে যেকোনো সময় কে বা কারা স্বর্ণের বার ও স্বর্ণালংকার গুদামের স্টিলের আলমারির লকার ভেঙে চুরি করেছে।’ মামলায় অজ্ঞাত পরিচয়ের ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে।
এদিকে ঘটনা প্রকাশ পাওয়া থেকে মামলা হওয়ার মাঝের এই ১৪ দিন গুদামে থাকা সোনা যাচাই-বাছাই করা হয়েছে বলে দাবি ঢাকা কাস্টম হাউজের শীর্ষ কর্তাদের। নাম প্রকাশ না করে কাস্টম হাউজের শীর্ষপর্যায়ের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত ২১ আগস্ট আমরা প্রথম জানতে পারি গুদাম থেকে আট কেজি সোনা গায়েব হয়েছে। প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনে তাৎক্ষণিক উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে গণনা করে জানা গেছে ৫৫ দশমিক ৫১ কেজি সোনা কম আছে আলমারিতে।’
সোনা চুরির মামলাটি বিমানবন্দর থানা থেকে গত মঙ্গলবার ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। কিন্তু ডিবি এখনো কোনো কূলকিনারা করতে পারেনি। কাস্টমসের আট কর্মকর্তা-কর্মচারীকে হেফাজতে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করলেও কোনো ক্লু মিলছে না বলে দাবি তদন্ত তদারকি কর্মকর্তাদের। গতকাল পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তারও দেখায়নি ডিবি।
জানতে চাইলে ডিবি উত্তরা বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার বদরুজ্জামান জিল্লু গতকাল বৃহস্পতিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের হেফাজতে যে আটজন আছে তারা কোনো কিছুই বলতে পারছে না। তারা দাবি করছে, ঘটনাটি চুরি এবং তাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।’
তাদের গ্রেপ্তার করা হবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কাস্টমস কর্তৃপক্ষ তাদের আমাদের কাছে দিয়েছে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া আমরা তো তাদের গ্রেপ্তার দেখাতে পারব না।’
গতকাল ডিএমপির ডিবিপ্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেছি। সোনা চুরির ঘটনায় যত বড় কর্মকর্তাই জড়িত থাকুক না কেন তাকে আইনের আওতায় আনা হবে।’ তিনি বলেন, বিমানবন্দরের মতো একটা জায়গা যেখানে কঠোর নিরাপত্তা, সেখানে এত বড় একটা চুরির ঘটনা, এটা আমরা গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছি। পাশাপাশি গত চার-পাঁচ মাস গুদামে কারা গেছে সেটিও তদন্তে আনা হবে। সিসি ক্যামেরা পর্যবেক্ষণ, দায়িত্ব পালন ও জিজ্ঞাসাবাদের পর বলা যাবে আসলে ঘটনাটি কীভাবে হয়েছে এবং কারা ঘটিয়েছে।’
ডিবিপ্রধান বলেন, এক কর্তৃপক্ষ সোনাগুলো আরেক কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করল। কিন্তু তারা কীভাবে বুঝিয়ে দিল আর যারা বুঝে নিল তারাইবা কীভাবে বুঝে নিয়েছে সব বিষয় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত চলছে। স্বল্প সময়ের মধ্যেই তদন্ত শেষ করা হবে।
কাস্টমস সূত্র বলছে, গত ২১ আগস্ট সোনা গায়েবের প্রাথমিক তথ্য কাস্টমস কমিশনার একেএম নুরুল হুদা জানার পরদিন সোনা গণনা ও পরীক্ষার উদ্যোগ নেন। কাস্টমসের সহকারী কমিশনার (বিচার) মো. আতিকুজ্জামান চৌধুরী দুজন বিশেষজ্ঞ চেয়ে বাংলা গোল্ড (প্রা.) লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে চিঠি দেন। এই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে গোল্ড এনালিস্ট অমিত ধর ও ইলেকট্রিক ইঞ্জিনিয়ার রনি সোনা গণনা ও পরীক্ষা করেন। এ সময় ধরা পড়ে ৫৫ দশমিক ৫১ কেজি সোনা আলমারিতে কম আছে।
এ ঘটনা তদন্তে দুই দফা কমিটি গঠন করে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। সর্বশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে ১১ সদস্যের, যার সভাপতি করা হয়েছে কাস্টমসের অতিরিক্ত কমিশনার কাজী ফরিদ উদ্দীন আর সদস্য সচিব করা হয়েছে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা (প্রিভেন্টিভ) মোহাম্মদ সোহরাব হোসেনকে। এ ছাড়া দুজন যুগ্ম কমিশনার, দুজন ডেপুটি কমিশনার, একজন রাজস্ব কর্মকর্তা ও চারজন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তাকে কমিটির সদস্য করা হয়েছে। কমিটিকে ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
এদিকে মামলা তদন্তে নেমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানতে পারে গুদামের আশপাশে কাস্টমসের সবগুলো সিসি টিভি ক্যামেরা নষ্ট। ফলে কোনো ফুটেজ বা আলামত পাওয়া যাচ্ছে না। এমন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিসি টিভি নষ্টের বিষয়টি নিয়ে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা কাস্টম হাউজের কমিশনার একেএম নুরুল হুদা আজাদ গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সোনা চুরির বিষয়টির প্রাথমিক তথ্য আমার কাছে আসে গত ২১ তারিখে (২১ আগস্ট)। এরপর আমি তাৎক্ষণিক গুদামে থাকা স্বর্ণের বার ও স্বর্ণালংকার গণনার উদ্যোগ নিয়েছি। এরপর যখন চুরির বিষয়টি প্রমাণ হয় আমিই পুলিশের কাছে অভিযোগ করেছি এমন ঘটনা ভবিষ্যতে যেন না ঘটে সেজন্য।’
সিসি টিভি নষ্টের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘২০১৩ সালে লাগানো সিসি টিভি নষ্ট হয়ে গেছে। আমি গত বছর থেকে নতুন সিসি টিভি লাগানোর চেষ্টা করেও পারিনি। কারণ বাজেট থাকলেও টাকা খরচে অর্থ মন্ত্রণালয়ের নিষেধাজ্ঞা ছিল।’
