মানহীন ও নকল কসমেটিকসের বাজারজাত ঠেকাতে সংসদে বিল পাস হয়েছে। বিদ্যমান ওষুধ আইনে কসমেটিকস শব্দটি যুক্ত করে ‘ঔষধ ও কসমেটিকস’ বিলে ওষুধের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি ও বেশি মুনাফার লোভে মজুদ করলে ১৪ বছর জেল ও ১০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। কসমেটিকসের ব্যবসা করতে হলে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর থেকে লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার সংসদে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী জাহিদ মালেক বিলটি পাসের প্রস্তাব করলে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়। বিলের ওপর জনমত যাচাই ও বাছাই কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাব করেন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা (এমপি)। তারা বাজারে ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ এবং লাগামহীনভাবে ওষুধের মূল্যবৃদ্ধিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সরকার জনস্বার্থে এসব বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেবে বলে আশা প্রকাশ করেন।
বিলটি পাসের প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়ে বিরোধী দল জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য রুস্তম আলী ফরাজী বলেন, ওষুধের যে আন্তর্জাতিক মান রয়েছে, সেই লেভেলটা আমাদের ঠিক রাখতে হবে। নিবিড় নজরদারি থাকতে হবে। স্যালাইনের দাম ১০০ টাকা নির্ধারিত থাকলে বিক্রি হয় ২০০ বা ৩০০ বা ৪০০ টাকায়। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এগুলো করা হয়। এসবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
একই দলের পীর ফজলুর রহমান বলেন, ওষুধের মান নিয়ন্ত্রণই ঠিকমতো করতে পারছি না, এর সঙ্গে আবার কসমেটিকস কেন আনা হলো। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব যে কাজ সেটা ঠিকমতো করতে আমরা পারছি না। ওষুধের দাম বৃদ্ধি করা হয়েছে, কোনো ব্যবস্থা নেই। ওষুধ ও কসমেটিস দুটো এক জায়গায় আনা হলো কেন?
গণফোরামের মোকাব্বির খান বলেন, ওষুধ জীবন রক্ষার উপাদান। এ বিলটি এমনভাবে আনা হয়েছে যাতে জনস্বার্থের পরিপন্থী হতে পারে। ওষুধ ও কসমেটিকস বিভিন্ন জিনিস, কাজও ভিন্ন। কিছু মানুষের স্বার্থরক্ষার জন্য এটা করা হয়েছে। এতে ওষুধ উৎপাদন ও মান নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে না। এর মধ্যে অসৎ উদ্দেশ্য আছে।
জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, কারও ব্যবসা ক্ষতি করার জন্য কসমেটিকস বিষয়টি আমরা এখানে নিয়ে আসিনি। বহু দেশে আমেরিকা, ভারত, সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডসহ বহু দেশে এ আইনটি একসঙ্গে আছে। আমাদের উদ্দেশ্য কারও ক্ষতি করা নয়, প্রস্তুতকারীদের অবৈধ সুবিধা দেওয়া নয়, আমাদের মানুষের স্বাস্থ্য যাতে ঠিক থাকে, মানুষের যাতে ক্ষতি না হয়। অনেক ধরনের ভেজাল কসমেটিকস ও ওষুধ তৈরি হচ্ছে, যেগুলো মুখে লাগানো হয় এবং বিভিন্নভাবে ব্যবহার করা হয়। এই কসমেটিকস ব্যবহারের কারণে মানুষের স্কিন ক্যানসার হচ্ছে, লিভার, কিডনি ফেইলর হচ্ছে, অনেক ধরনের সমস্যা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, দোকানে আমরা যাব না, তাদের ম্যানুফ্যাকচারিং প্রসেসটা আমরা দেখব, ইমপোর্ট, এক্সপোর্ট প্রসেসটা দেখব। কিন্তু কোন দোকানে দেবে এ বিষয়গুলো আমরা দেখব না। সর্বোপরি আমরা কসমেটিকসে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করব।
পাস হওয়া বিলে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের দায়িত্ব ও কর্মপরিধি সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, কসমেটিকস বিক্রি, আমদানি ও উৎপাদন করতে হলে লাইসেন্স নিতে হবে। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর লাইসেন্স অথরিটি হিসেবে কাজ করবে। এখন যারা কসমেটিকসের ব্যবসা বা উৎপাদন করছেন তাদের লাইসেন্স নিতে হবে। এজন্য ঔষধ প্রশাসন বিধি প্রণয়ন করবে।
১৯৪০ সালের ড্রাগস আইন ও ১৯৮২ সালের দ্য ড্রাগস কন্ট্রোল অ্যাক্টে দুটোকে এক করে যুগোপযোগী করে এ বিল আনা হয়েছে। বিলে চিকিৎসকের প্রেসক্রাইব ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি করলে ২০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের মাধ্যমে ওষুধের নিরাপত্তা, কার্যকারিতা, নতুন ওষুধ ও ভ্যাকসিন মেডিকেল ডেভেলপ করার বিষয়টি সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে বিলে। বলা হয়েছে, রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া কোনো ওষুধ বিক্রি ও ব্যবহার বন্ধ থাকবে। এমনটা করা হলে এটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। মেডিকেল ডিভাইস ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত আইনে ধারা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মেডিকেল ডিভাইসকে ওষুধ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। কিছু ওষুধের দাম সরকার নির্ধারণ করে দেবে বলে বিলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিলের তফসিলে ৩০ ধরনের অপরাধ চিহ্নিত করে সেগুলোর ক্ষেত্রে কী সাজা হবে তা উল্লেখ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে অপরাধের ধরন অনুযায়ী সর্বনিম্ন ১০ হাজার টাকা জরিমানা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১৪ বছরের জেল ও ১০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (সংশোধন) বিল উত্থাপন : ভিসি ও প্রো-ভিসিদের নিয়োগের মেয়াদ তিন বছরের স্থলে চার বছরে উন্নীত করে জাতীয় সংসদে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (সংশোধন) বিল-২০২৩’ উত্থাপন করা হয়েছে।
গতকাল স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক সংসদে বিলটি উত্থাপন করেন। বিলটি অধিকতর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সাত দিনের মধ্যে রিপোর্ট প্রদানের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়েছে।
বিলটি উত্থাপনকালে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ১৯৯৮ প্রণয়নের মাধ্যমে প্রাক্তন ইনস্টিটিউট অব পোস্টগ্র্যাজুয়েট মেডিসিন অ্যান্ড রিসার্চকে (আইপিজিএমআর) দেশের প্রথম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে রূপান্তর করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। ২০১২ সালে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ১৯৯৮’ প্রথম সংশোধন করা হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃক এ আইনের কতিপয় ধারা পুনরায় সংশোধনের লক্ষ্যে দ্বিতীয় সংশোধনী প্রস্তাব প্রেরণ করা হয়।’
তিনি জানান, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ১৯৯৮’-এর বিভিন্ন ধারায় উল্লিখিত ‘চ্যান্সেলর’, ‘ভাইস চ্যান্সেলর’ ও ‘প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর’ অভিব্যক্তির পরিবর্তে যথাক্রমে ‘আচার্য’, ‘উপাচার্য’ ও ‘উপ-উপাচার্য’ অভিব্যক্তি প্রতিস্থাপনসহ অন্যান্য মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ পদে নিয়োগের মেয়াদ তিন থেকে চার বছরে উন্নীতকরণ, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী চিকিৎসা শিক্ষার মানোন্নয়নে বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ইনস্টিটিউশনাল কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স সেল (আইকিউএসি)’ নামে নতুন একটি সেল গঠন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট ও অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল পুনর্গঠন এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের মনোনীত ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট অব বাংলাদেশ (আইসিএবি) নিবন্ধিত চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ফার্ম ও মহা-হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক দ্বারা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরীক্ষা কার্যক্রম সম্পাদনের সুযোগ রেখে প্রস্তাবিত আইনের খসড়াটি প্রণয়ন করা হয়েছে।
সংরক্ষিত মহিলা আসনে নির্বাচন ও অর্থনৈতিক অঞ্চলের সংশোধিত বিল যাচ্ছে সংসদে : সংরক্ষিত মহিলা আসন নির্বাচন ও অর্থনৈতিক অঞ্চলের সংশোধিত বিল যাচাই-বাছাই শেষে রিপোর্ট দিয়েছে সংসদীয় কমিটি। বিল দুটি চলতি সংসদ অধিবেশনেই অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে বলে জানা গেছে।
গতকাল সংসদ ভবনে একাদশ জাতীয় সংসদের আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বিষয়টি জানানো হয়। সভায় মো. শহীদুজ্জামান সরকার সভাপতিত্ব করেন। বৈঠকে কমিটির সদস্য ও আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হক, মোস্তাফিজুর রহমান, মো. আব্দুল মজিদ খান, শামীম হায়দার পাটোয়ারী, গ্লোরিয়া ঝর্ণা সরকার এবং খোদেজা নাসরিন আক্তার হোসেন অংশগ্রহণ করেন।
বৈঠকে ‘বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল (সংশোধন) বিল, ২০২৩’-এর ওপর আলোচনা ও রিপোর্ট প্রদানপূর্বক চলতি সংসদ অধিবেশনে উত্থাপনের জন্য কমিটি কর্র্তৃক সুপারিশ এবং ‘জাতীয় সংসদ (সংরক্ষিত মহিলা আসন) নির্বাচন (সংশোধন) বিল, ২০২৩’-এর ওপর বিস্তারিত আলোচনা ও অধিকতর সংশোধনপূর্বক কমিটি কর্র্তৃক রিপোর্ট প্রদান করা হয়। বৈঠকে আইন ও বিচার বিভাগের সচিব এবং লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের সচিব, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্র্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানসহ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
